মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত এক মাল্টি-বিলিয়নেয়ার
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০১৮, ১৮:৪৮
মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত এক মাল্টি-বিলিয়নেয়ার
ড খালিদ এম. বাতারফি
প্রিন্ট অ-অ+

ক্বাসিম এলাকায় এটাই আমার প্রথম সফর; এর আগে কখনো যাইনি। সাংবাদিকদের জন্য এ সফরটির আয়োজন করেছিল সউদি কমিশন ফর ট্যুরিজম অ্যান্ড ন্যাশনাল হেরিটেজ। প্রোগ্রাম হাইলাইটসে দেখি, দুনিয়ার সবচাইতে বড় খেজুর বাগান পরিদর্শনের কর্মসূচি। এর একটির মালিক হলেন মরহুম যুবরাজ প্রিন্স সুলতান বিন আবদুলআজিজ এবং অন্যটির মালিক সুলাইমান বিন আবদুলআজিজ আল-রাজি। দু'জনেই এখানে উৎপাদিত সব পণ্য জনকল্যাণে দান করে দিয়েছেন।


আমরা যখন আল-ওয়াতানিয়া পোল্ট্রি ফার্ম অ্যান্ড ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে যাই, তখন শেখ সুলাইমানের ছেলে ড. মোহাম্মদও আমাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং সেখানে কর্মরত উচ্চ প্রশিক্ষিত সউদি নারী-পুরুষদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।


শেখ আমাদের দেখান কীভাবে তাঁর ল্যাব পোল্ট্রি ফার্মের দুর্গন্ধ দূর করার উপায় উদ্ভাবন করেছে। কীভাবে উপকারি কীটপতঙ্গ লালনপালনের মাধ্যমে গাছপালাকে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের উপদ্রবমুক্ত করা হয়েছে।


জানালেন নিজের কর্মজীবনের কিছু স্মৃতি - কীভাবে সাদামাটা সূচনা করে অর্জন করলেন আজকের সাফল্য। বললেন, এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, আজ যারা আমার এখানে এসাছেন তাঁরা, আমার সন্তান এবং তাদের সন্তানেরা যেন জীবনের এ শিক্ষাটি পেতে পারেন যে, সাফল্য অর্জনের পথটি কিন্তু গোলাপের পাপড়িবিছানো নয়।


এসব কথা বলার সময় হয়তো তিনি নিজেকেও যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন আল্লাহ তাঁকে যে রাহমত করেছেন তার কিছু অংশ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরও দিতে হবে।


দুপুরে খেতে বসে আল-রাজি তাঁর জীবনকাহিনী শোনালেন। এলিমেন্টরি স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষ শেষে তিনি লেখাপড়ায় ইতি টানেন এবং কুলির কাজ শুরু করেন। বেতন প্রতিদিন আধা হালালা। এটা হচ্ছে সেসময়ের কথা, যখন ২২ হালালায় এক রিয়াল হতো। এরপর একটি ক্যাটারিং কম্পানিতে পাচকের কাজ নেন তিনি। সেখানে অনেক দিন কাজ করলেও বেতন আর বাড়ে না। তাদের সাফ জবাব, থাকলে এ বেতনেই থাকতে হবে, না পোষায় তো নিজের পথ দেখো।


অনন্যোপায় আল-রাজি তা-ই করলেন। ৪০০ রিয়াল মাত্র সম্বল করে একটি মুদি দোকান দিয়ে বসলেন। পাঁচ বছরের মাথায় মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার মধ্য দিয়ে শুরু করলেন ব্যাংকিং ক্যারিয়ার। এরপর ভাইদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুললেন আল রাজি ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন। এটিই পরে আল রাজি ব্যাঙ্কে পরিণত হয়। এর ধারাবাহিকতায় শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, আবাসন এবং অন্য আরো বহু ক্ষেত্রে আল রাজিদের ব্যবসার দিগন্ত সম্প্রসারিত হয়।


ড. মোহাম্মদ বলছিলেন যে তাঁর পিতা শেখ সুলাইমান তাঁর মোট সম্পদের অর্ধেক নিজ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিলিবণ্টন করে গেছেন, বাকি অর্ধেক রেখেছেন জনকল্যাণের জন্য, যার পরিমাণ এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার। তিনি এর ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন এভাবে যে, আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল আমার পরিবারের শৃঙ্খলা রক্ষা করা। আমার ভয় ছিল, আমার মৃত্যুর পর ওয়ারিশরা সম্পত্তি নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে। আমি সেদিনের জন্য অপেক্ষা করবো কেন? আমি বেঁচে থাকতেই তারা সম্পত্তি ভোগ করুক।


শেখ সুলাইমান আরো বলেছিলেন, আমার দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে একটি অলাভজনক সংস্থা গড়ে তোলা, যা পরিচালিত হবে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে। এর আয় দিয়ে চলবে দেশে ও বিদেশে আমাদের সব জনকল্যাণমূলক সংস্থা, মসজিদ, কলেজ, হাসপাতাল ও রিলিফ প্রজেক্ট।


গভীর মনোবেদনা নিয়ে তিনি বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠাতার ইন্তেকালের পর পারিবারিক কম্পানিগুলো যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, আমি তা বলেছিলাম। বলেছিলাম, এটা একটা ক্রনিক প্রবলেম। অনেক বড় বড় কম্পানিকে দেখেছি, ওয়ারিশদের কামড়াকামড়িতে, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আমাদের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য এটা মোটেও ভালো নয়। একারণে আমি শরীয়া, প্রশাসন, অ্যাকাউন্টিং, ইনভেস্টমেন্ট ইত্যাদি সব বিষয়ে সাহায্য পেতে একদল বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি ভালো টিম গঠন করি। তারা কয়েক বছর স্টাডি করে কম্পানিগুলো কীভাবে চলবে তার একটি ব্যাপক ও সমন্বিত পরিকল্পনা দেন।


দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে চলবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ তার ওয়ারিশদের জন্য অনেক কিছু রেখে গেলেন এবং তারা সেসব সুখে-শান্তিতে ভোগ করছে - এটা দেখএ পারাটা খুবই ভালো কথা। সেই সাথে এটাও দরকার যে, একজন ব্যক্তি তাঁর সম্পদের একটা অংশ দেশ ও সমাজের জন্য রেখে গেলেন। কারণ, আমাদের সাফল্যের জন্য আমরা দেশের কাছেও ঋণী। ঋণী সেসব মানুষের কাছেও, যারা আমাদের বিশ্বাস করেছে, আমাদের পণ্য কিনেছে। এছাড়া আপনি আপনার নিজের এবং পরিবারের কাছেও ঋণী। একদিন জীবন যখন শেষ হয়ে যাবে তখন কেবল সেই বিনিয়োগই আপনার কাজে লাগবে, যা আপনি আপনার পরজনমের জন্য সঞ্চয় করেছেন। কাজেই আপনি আপনার সম্পদের অর্ধেক পরিবারের জন্য রেখে যান, বাকিটা রাখুন জনকল্যাণের জন্য।


জিজ্ঞেস করি, তাহলে নিজের জন্য আপনি কী রাখলেন? বাড়ি, খামার নাকি মাসিক বেতন?


প্রসন্ন হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ করে তিনি বলেন, সত্যি বলতে কী, কিছুই না। শুনুন, আমার বয়স এখন আশির কোটায়। আমার আর কী দরকার? আমার থাকা,খাওয়া, চিকিৎসা, যাতায়াত - সব কিছুরই তো ব্যবস্থা আছে। আমার কোনো অভাব নেই।


''আপনি একজন মাল্টি-বিলিয়নেয়ার, অথচ আপনার হাতে একটি টাকাও নেই। কেমন না ব্যাপারটা?'' আমার এ কথায় আবারও মৃদু হাসেন তিনি। তাঁর চোখ-দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে। বলেন, খুব হাল্কা লাগে। স্বাধীন লাগে। পাখির মতো মুক্ত মনে হয়।...যখন আল্লাহ আমাকে ডেকে পাঠাবেন, তখন কোনো পিছুটান ছাড়াই আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিতে পারবো। এটা যে কী শান্তি!!


সউদি গেজেট থেকে ভাষান্তর : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com