সততা ও দারিদ্র্য
প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৮, ২০:০৩
সততা ও দারিদ্র্য
মূল : ফাহদ আল-আহমারি// অনুসৃতি : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
প্রিন্ট অ-অ+

মাঝে-মাঝেই মনে প্রশ্ন জাগে, সততা ও দারিদ্র্যের মাঝে কি কোনো সম্পর্ক আছে?


এ বিষয়ে আজ আমি দু'টি দেশে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলবো। এ দু'টি দেশই আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে ''দরিদ্র দেশ'' বলে গণ্য।


প্রথমে বলছি আজারবাইজানের কথা। এ দেশটির একটি মজার দিক আছে - দেশটি একই সাথে ধনী ও গরীব। ধনী, কারণ দেশটি তেল ও গ্যাসসহ অনেক প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা। আবার গরীব এ কারণে যে, সে-দেশের মোট জনসংখ্যার বিরাট অংশ দারিদ্র্যসীমার একটা বিশেষ স্তরের নিচে বসবাস করে। এমনও জনশ্রুতি আছে যে, আজারবাইজানের চার ভাগের এক ভাগ লোক বিদেশে অভিবাসী হয়েছে এবং এ অভিবাসীদের বেশিরভাগ বাস করে রাশিয়ায়।


যা হোক, আমি যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি সেটি ঘটেছিল আজারবাইজানের রাজধানী থেকে বহু দূরের এক এলাকায়। চলতি পথে আমি ও আমার সফরসঙ্গীরা সেখানে থেমেছিলাম কিছু খানাপিনা কেনা এবং নামাজের জন্য।


নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরুনোর পর আমি বুঝতে পারি, আমার সেলফোনটি নেই। ওটি হয়তো নামাজের সময় মসজিদে পড়ে গেছে ভেবে আমি বন্ধুদের নিয়ে আবার সেই মসজিদে যাই এবং ফোনটি খুঁজতে থাকি। মসজিদের উঠানে দাঁড়িয়েছিল তিনটি গরীব শিশু। আমরা কিছু খুঁজছি বুঝতে পেরে ওরা আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। বললো, ''মোবাইল! মোবাইল!!'' ওদের ভাষা বলতে পারি না, তাই শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে জানালাম, ''হ্যাঁ''। শিশুরা এবার আমাদের মসজিদের ভেতরে নিয়ে গেল। সেখানে একটি বালিশের ভেতর মোবাইলটি লুকিয়ে রাখা ছিল। ছেলেরা সেখান থেকে মোবাইলটি বের করে আমাদের হাতে দিল।


মোবাইল ফোনটি ফিরে পেয়ে আমার কী যে ভালো লেগেছিল, বলে বোঝাতে পারবো না। কারণ, এতে আমার প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য ও ডক্যুমেন্টস ছিল, যা মোবাইল ফোনের চাইতেও অনেক দামী। এ শিশুরা আমার যে-উপকার করলো, তা আমি কখনো ভুলবো না।


আমাদের আরব সংস্কৃতিতে নিয়ম হলো, কেউ এ ধরনের ভালো কাজ করলে তাকে পুরস্কৃত করা। সে অনুযায়ী আমরা ওদের হাতে কিছু টাকা দিতে গেলাম। কিন্তু ওরা নেবে না। একটু জোরাজুরি করতেই ওরা দৌড়ে পালাতে থাকলো, আমরাও ওদের পিছু নিলাম। আমার এক বন্ধু ছেলেদের একজনের প্যান্টের পকেটে জোর করে কিছু টাকা গুঁজে দিল। ছেলেটি তার চাইতেও দ্রুতবেগে টাকাগুলো বের করে আমার বন্ধুর ব্যাকপকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেদের ভাষায় কিছু বলতে-বলতে দৌড়ে পালালো। পরে একজনের কাছে জেনেছিলাম, ছেলেটি বলছিল যে সে এর পুরস্কার আল্লাহর কাছ থেকে চায়, আমার বন্ধুর কাছ থেকে নয়।


শিশুটির কথায় আমি শুধু উদ্দীপ্তই হলাম না, সে যেন আমাকে শিক্ষা দিয়ে গেল সততা কাকে বলে।


অপর ঘটনাটি ঘটে ইন্দোনেশিয়ায়। সেখানে ট্যাক্সি থেকে নামতে গিয়ে আমি আমার ব্যাগটি ফেলে আসি। ব্যাগে ছিল আমার মোবাইল ফোন, কার্ড ও জরুরী কাগজপত্র। ট্যাক্সি আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় আর হোটেলে ঢুকেই বুঝতে পারি, আমি ট্যাক্সিতে ব্যাগ ফেলে এসেছি। আমি আমার বন্ধুকে হোটেলে চেক ইন করতে বলে সোজা চলে যাই বিমানবন্দরে, যেখানকার এক কম্পানি থেকে আমি ট্যাক্সিটি ভাড়া করেছিলাম। কম্পানি ট্যাক্সির চালককে সনাক্ত করতে পারে এবং তার সাথে যোগাযোগ করে। সে জানায়, আরেকজন যাত্রী ট্যাক্সির পেছনের সিটে ব্যাগটি পেয়ে তাকে (চালক) জানিয়েছে। আমি সেই চালকের জন্য বিমানবন্দরে দু'ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। পরে চালক এলো এবং আমার ব্যাগ আমার হাতে তুলে দিল। ব্যাগের একটি জিনিসও খোয়া যায়নি। এ সৎ মানুষটিকে আমি কিছু পুরস্কার দিয়েছিলাম।


এ দু'টি ঘটনার মধ্য দিয়ে নৈতিক মূল্যবোধ ও সততার নীতি কী - তা ফুটে ওঠে, বিশেষ করে সেলফোন পেয়েও তা মালিককে ফেরত দেয়ার মধ্যে। কেননা, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের জন্য এটা অতি লোভনীয় বস্তু। কিন্তু আমরা এখানে দেখলাম, দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যেও তারা সুখী। জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলো তারা হাসিমুখে মোকাবিলা করে। যারা তাদের মুখের দিকে তাকাবেন তারা বুঝতে পারবেন সত্যিকার সুখ আসলে কী। বুঝবেন, সুখের সম্পর্ক আসলে সম্পদের সাথে নয়, অন্তর্গত মূল্যবোধের সাথে। তাই তারা দরিদ্র হয়েও সুখী।


অবশ্য আমি এ কথাটা ঢালাওভাবে বলছি না। এও বলছি না যে, সব গরীব মানুষই সৎ। তবে যে-দু'টো ঘটনা বললাম তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিস্থিতি আসলে কেমন। ধনীদের মধ্যে এ রকম ঘটনা ঘটতে আমরা দেখি না। কারণ, তারা অর্থসম্পদে ধনী বটে, কিন্তু সততার বিচারে দরিদ্র। এসব লোক সামনে বলে যে তারা আল্লাহকে ভয় করে, কিন্তু আবার পেছন দিকে আপনার সম্পদ চুরি করে। এরা যদি আপনার আস্ত বাড়িটাই চুরি করার সুযোগ পায়, তাহলে তাও নিজেদের সন্দেহজনক সম্পদের ভেতর ঢুকিয়ে নেবে। সউদি গেজেট থেকে


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com