ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক
প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৮, ১৮:৪১
ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক
মিশায়েল ক্নিগে
প্রিন্ট অ-অ+

ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কতটা ঘৃণা কাজ করে, সোমবার রাতে হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা সহকারী সেবাস্টিয়ান গর্কা-র এক মন্তব্যে তার পরিচয় পাওয়া গেল। ফক্স নিউজ চ্যানেলে তিনি বলেন, ‘‘ইরান চুক্তির মাথায় গুলি করা উচিত। সেটি আমেরিকার জন্য খারাপ, বিশ্বের জন্য খারাপ, আমাদের বন্ধুদের জন্য খারাপ।''


পরদিন মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে গিয়ে ট্রাম্পও প্রায় একইরকম মারমুখো ভঙ্গিতে কথা বলেন। আরেকটু হলে বোধহয় সহিংসতারও উল্লেখ করে ফেলতেন। তবে চিরকাল যা বলে আসছেন, সেই ধারণা আঁকড়ে ধরে বললেন, ইরান চুক্তি আমেরিকা ও বিশ্বের জন্য ভালো নয় এবং ওয়াশিংটনের সহযোগীরাও নাকি সেই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।


ইরান চুক্তি বিশ্বকে আরও নিরাপদ করে তুলেছিল


ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি অবশ্যই নিখুঁত ছিল না – যে কোনো আপস-মীমাংসার ক্ষেত্রেই যেমনটা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার পর যে বোঝাপড়া সম্ভব হয়েছিল, তা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে স্বল্প ও মাঝারি মেয়াদের জন্য কড়া সীমার মধ্যে বেঁধে ফেলেছিল এবং সেই অবস্থা যাচাই করার কাঠামো গড়ে তুলেছিল।


ইরান এ পর্যন্ত চুক্তির শর্ত মেনে এসেছে। নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পরিদর্শক ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বার বার সে দেশকে এই সার্টিফিকেট দিয়েছেন। গোটা বিশ্ব সামগ্রিকভাবে এই মূল্যায়ন গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে বিপরীত মূল্যায়ন করেছেন, ট্রাম্প মঙ্গলবার তাঁর বক্তব্যে শুধু সেটারই উল্লেখ করেন।


যে চুক্তির আওতায় নিশ্চিত করা হয়েছিল যে ইরান কমপক্ষে এক দশকের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, সেটিকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা উচিত। এই চুক্তি গোটা অঞ্চল, বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ করে তুলেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ই-থ্রি – বা জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে ইউরোপের মধ্যে অত্যন্ত কঠিন অথচ নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে এই চুক্তি সম্ভব হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা জরুরি যে চীন, রাশিয়া তথা আন্তর্জাতিক সমাজও তার প্রতি সমর্থন দেখিয়েছিল। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই যে, এই পরমাণু চুক্তি এক অভিনব কাঠামো সৃষ্টি করেছিল। কোনো দেশ পরমাণু অস্ত্র তৈরির বাসনা করলে কীভাবে সফল ও শান্তিপূর্ণ পথে তা খর্ব করা সম্ভব, তার একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছিল।


ইউরোপীয় সহযোগীরা একমত নয়


ওয়াশিংটনের সহযোগীরাও ইরান চুক্তি সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের মনোভাবের সঙ্গে একমত, এমন ভুল দাবি অত্যন্ত ধৃষ্টতার পরিচয় – বিশেষ করে জার্মানির চ্যান্সেলর ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে গিয়ে ইরান চুক্তি মেনে চলার জন্য ট্রাম্পকে বোঝানোর শেষ চেষ্টা চালানোর পর এমন দাবি ধোপে টেকে না। বাস্তবে এই পদক্ষেপ ইউরোপীয়দের গালে চড় মারার মতো ঘটনা, যারা সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এই চুক্তির পক্ষে সওয়াল করে আসছিল। এমনকি ইসরায়েলেও সামরিক কর্মকর্তারা বার বার বলেছেন, তাঁরা চান যে অ্যামেরিকা এই চুক্তি মেনে চলুক।


অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যখন পররাষ্ট্র নীতির উপর প্রভাব ফেলে


এক্ষেত্রে ভুলের কোনো অবকাশ নেই। ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে ইরান চুক্তির বাইরে আনার পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার সঙ্গে সুচিন্তিত আন্তর্জাতিক কৌশলের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পদক্ষেপ বিশ্বকে আরও নিরাপদ করে তুলবে না অথবা ওয়াশিংটন ও তার সহযোগীদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। বেসামাল আবেগ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই এর মূল ভিত্তি।


ট্রাম্প ও তাঁর অনেক অনুগামী ও সহকারী পূর্বসূরী বারাক ওবামার যাবতীয় পদক্ষেপকে ঘৃণার চোখে দেখেন। তাঁর উত্তরাধিকারের সব চিহ্ন সরিয়ে ফেলতে তাঁরা সবকিছু করতে প্রস্তুত। তাই ওবামার পররাষ্ট্রনীতির এমন সাফল্য নষ্ট করার পদক্ষেপ বিস্ময়ের কোনো কারণ হতে পারে না। বিশেষ করে ট্রাম্প যেভাবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে এইচ আর ম্যাকমাস্টার ও রেক্স টিলারসনকে সরিয়ে ফেলে যথাক্রমে জন বোল্টন ও মাইক পম্পেও-কে এই দুই পদে বহাল করেন, তার ফলেও এই মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ ম্যাকমাস্টার ও টিলারসন ইরান চুক্তি মেনে চলার পক্ষে ছিলেন। বোল্টন ও পম্পেও এই চুক্তির ঘোর বিরোধী হিসেবে পরিচিত।


নির্বাচনি প্রচারের সময়েও ট্রাম্প ইরান চুক্তিকে সর্বকালের সবচেয়ে নিকৃষ্ট চুক্তি হিসেবে তুলে ধরে সেটি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবার সেই প্রতিশ্রুতি পালন করে তিনি আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে নিজের সাফল্য তুলে ধরতে পারেন।


নতুন চুক্তি – কোনোরকমে, কোনো এক সময়ে


ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর কী ঘটবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প প্রকাশ্যে তুলে ধরা হয়নি। প্রেসিডেন্ট শুধু জানিয়েছিলেন যে তিনি দরকষাকষি করে কোনোভাবে, কোনো এক সময়ে আরও ভালো চুক্তি আদায় করবেন।


কিন্তু ইউরোপ, ইরান তথা আন্তর্জাতিক সমাজে নতুন করে এ বিষয়ে আলোচনার কোনো সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। তাই ট্রাম্প আদৌ এমন প্রচেষ্টা চালানো পর্যন্ত ইরান কার্যত পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে তার উপর চাপানো শর্তের বাইরে থাকবে। ফলে গোটা অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়বে বই কমবে না।


উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের বাড়তি গুরুত্ব


ট্রাম্প ইরান সংক্রান্ত যে বেপরোয়া পদক্ষেপ নিলেন, তার প্রেক্ষিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন-এর সঙ্গে আসন্ন বৈঠকে তাঁর উপর চাপ আরও বেড়ে যাবে।


ট্রাম্প যা-ই বলুন না কেন, এর ফলে কিমের উপর চাপ মোটেই বাড়বে না, প্রেসিডেন্ট নিজে সেই চাপ অনুভব করবেন। কারণ যাচাই করা যায়, এমন এক আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে তাঁকে আরও বিস্তারিত এক চুক্তি পেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, উত্তর কোরিয়ার মতো ইরানের হাতে কিন্তু পরমাণু অস্ত্র ছিল না।


ট্রাম্প নতুন এক পরমাণু সংকট সৃষ্টি করেছেন এবং চলমান এক সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছেন। ইউরোপ ও এশিয়ায় ঘনিষ্ঠ মার্কিন সহযোগীদের অবজ্ঞা করার পর শান্তিপূর্ণভাবে দুটি সংকটের সমাধান করা ‘গ্যাম্বলার-ইন-চিফ'-এর জন্য মোটেই সহজ হবে না। বিশ্বের জন্যও এই পরিস্থিতি অশনি সংকেত বয়ে আনছে। সূত্র : ডয়চে ভেলে


মিশায়েল ক্নিগে : ডয়চে ভেলের ওয়াশিংটন প্রতিনিধি


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com