র‌্যাগিং আর কত জীবন শেষ করবে
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০১৮, ১৬:৪৭
র‌্যাগিং আর কত জীবন শেষ করবে
মো. সেলিম রেজা
প্রিন্ট অ-অ+

শিক্ষাঙ্গনে র‌্যাগিং নামের এক অসভ্য আচরণের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে। এ বছর রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংয়ের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া যায়। র‍্যাগিং নামের ঘৃণ্য আচরণের শিকার হয়ে একজন শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছে আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাসায় ফেরত গেছে।


এবার একটু আমার র‍্যাগিংয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। ২০০০ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মৌখিক পরীক্ষায় ডাক পাই। পরীক্ষার আগের রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খান জাহান আলী হলে এলাকার এক পরিচিত ভাইয়ের কক্ষে উঠি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার এলাকার সেই বড় ভাইয়ের সহায়তায় সেই রাতে আমার ওপর দিয়ে মানসিক অত্যাচারের ঝড় বয়ে যায়। আমি শুধু আমার এলাকার বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি একটু সাহায্যের আশায়। কিন্তু দেখলাম সেও অনেক আনন্দ পাচ্ছে আমাকে নির্যাতন করে। সে সময় ওরা আমাকে নারায়ণগঞ্জের পতিতালয় নিয়ে যে কথাগুলো বলেছিল এবং ওদের আচরণ যেরকম ছিল, তাতে আমার মনে হয়েছে এ ধরনের কোনো এক জায়গাতেই ওদের জন্ম হয়েছে। ওরা কোনোভাবেই ভালো পরিবারের সন্তান হতে পারে না।


পরদিন যে ভবনে মৌখিক পরীক্ষা ছিল, সেই ভবনের পরিস্থিতি আরো ভয়ানক। যারা বাসা থেকে সরাসরি মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসেছিল, ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে তাদের র‍্যাগিং দিচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যায়ের কোনো ছাত্র-ছাত্রী এত বিকৃতরুচির হতে পারে, তা কল্পনাও করিনি কোনোদিন, কিন্তু কল্পনাতীত সেই বিষয়টিই আমি সেদিন স্বচক্ষে দেখেছিলাম। আজ পর্যন্ত আমি সেই রাতের কথা ভুলতে পারিনি। আর তাই ভর্তির সুযোগ পেয়েও আমি আর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইনি।


ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে যখন আমি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাই। এখানেও আমি এলাকার এক বড় ভাইয়ের কক্ষে উঠি (শাহ পরান হল)। বড় ভাই আমাকে তাঁর সিট ছেড়ে দিয়ে অন্য কক্ষে গিয়ে থাকলেন। আমাকে থাকার জন্য মেস ঠিক করে দিলেন। মেসের আরেক বড় ভাই আমাকে টিউশনি ঠিক করে দিলেন। এ মেসে ওঠার তৃতীয় দিনে সকাল ৮টায় ক্লাসে যাব; কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আমার কাছে ছাতা ছিল না, আবার এত ভোরে কাউকে যে ডাকব সে সাহসও পাচ্ছিলাম না। যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছিল ছাতা ছাড়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। শেষমেশ সাহস করে এক বড় ভাইয়ের কক্ষে নক করলাম এবং আমার সমস্যার কথা বললাম। উনি রাগের পরিবর্তে খুশি হয়ে ছাতা দিয়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।


শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও মাস্টার্স করার সময়ে বড় ভাই ও বোনদের কাছ থেকে যে সাহায্য-সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি, তা কোনো দিন শোধ করার মতো নয়। তাঁদের সঙ্গে দেখা হলে বা কথা হলে শ্রদ্ধায় এমনিতেই মাথা নত হয়ে আসে।


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার খুব কাছের একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা র‍্যাগিং করেন কেন? উনি উত্তরে আমাকে বলেছিলেন, র‍্যাগিংয়ের মাধ্যমে সিনিয়র ও জুনিয়রের মাঝে সম্মানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কী ''বিজ্ঞ'' উত্তর ! যাকে র‍্যাগিং দিয়ে মানসিক রোগী বানিয়ে দিচ্ছে, তার সঙ্গে সম্মানের সম্পর্ক গড়ে উঠবে - এমন ভাবনা যে বা যারা ভাবতে পারে, তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র!! কী অবাক দুনিয়া !


গত বছর আমি লেখাপড়ার জন্য কানাডায় আসি। এখানে একজন বিদেশি শিক্ষার্থীকে সার্বিক সহযোগিতা ও সাহায্য করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা কিন্তু র‌্যাগিংজাতীয় কোনো রকম ঘৃণ্য কাজের কথা ভাবতেও পারে না, বরং সাহায্য-সহযোগিতা করার মাধ্যমে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থী বলেছিলেন র‍্যাগিংয়ের মাধ্যমে ''ভালো সম্পর্ক'' তৈরি হয়, তিনি আমার এক বছর আগেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছেন। তিনি এখানে বাঙালি কমিউনিটির কাছে অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। তিনি এই সম্পর্ক তৈরি করেছেন আমাদের র‍্যাগিং দিয়ে নয়, বরং নতুন হিসেবে আমাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে।


আজ সমাজের এই নতুন ব্যাধি নিয়ে আমাদের ভাবার সময় এসেছে। একজন দিনমজুর থেকে শুরু করে কোটিপতি - সবাই অনেক আদর-যত্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্তানকে বড় করে। আর যে ছেলে বা মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় সে নিশ্চয়ই ভালোর মধ্যে ভালো। কোনো পরিবার বা শিক্ষার্থীর আশা-আকাঙ্ক্ষা যদি কিছু বখাটে ছেলে-মেয়ের হাসিঠাট্টায় নিমেষে শেষ হয়ে যায়, তাতে এটি সমাজ ও জাতির জন্য চরম অশনিসংকেত। এর মাধ্যমে একজন সুস্থ সবল মানুষকে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীতে পরিণত করা হচ্ছে। সারাটা জীবন তাকে ও তার পরিবারকে এ কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে। কী দোষে? কী অপরাধে তার এ শাস্তি? বিনা অপরাধে একজন শিক্ষার্থীকে এ ধরনের নির্যাতন করার অধিকার তাদের কেউ দেয়নি। এ ধরনের অপরাধের শাস্তি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।


প্রত্যেক শিক্ষকের উচিত র‍্যাগিংয়ের ভয়াবহতা নিয়ে ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করা। তাদের বোঝাতে হবে, সম্পর্ক উন্নয়নে এটি কোনো ভালো পথ নয়। বোঝাতে হবে, প্রথম বর্ষে ক্লাস করার সময় নবীনরা এমনিতেই সঙ্কুচিত থাকে। মা-বাবা ও পরিবারের জন্য তাদের মন কাঁদে। এ সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। তাদের বুদ্ধি, তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে হবে।


প্রতিটি বিভাগে ও হলে শিক্ষকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। তবেই আমরা একটি শক্তিশালী ভালোবাসার বন্ধনের সমাজ বা বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষার পরিবেশ পাব।


প্রশাসনকে এখানে পূর্বপ্রস্তুতি ও পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসনকে প্রচার চালাতে হবে ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরুর প্রথম দিন থেকেই। লিফলেট বিতরণ, পোস্টার, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে র‍্যাগিংয়ের ভয়াবহতা ও শাস্তি সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে। এর পরও কোনো ঘটনা ঘটে গেলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ আর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার দুঃসাহস না দেখায়।


লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com