আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশা
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ১৭:১৩
আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশা
আমিনুল হক পলাশ
প্রিন্ট অ-অ+

সহজ ভাষায় যদি আমরা একটি রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা দিতে চাই তাহলে বলা যায়, ‘রাজনৈতিক দল হলো কিছু সুনির্দিষ্ট নীতি ও কর্মসূচীর ব্যাপারে ঐক্যমতের ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়া একটি জনগোষ্ঠী যারা নির্বাচনে অংশগ্রহনের মাধ্যমে জনগনের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করে নিজেদের নীতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী সমাজ তথা দেশের বৃহত্তর কল্যাণ সাধন করতে চায়।’


এ থেকেই বুঝা যায়, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে মূলত তিন ধরনের রাজনৈতিক চর্চা ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হয়।


প্রথমত, দলীয় রাজনীতি অর্থাৎ নিজেদের দলীয় নীতি আদর্শ ঠিক করা, বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচী পালন করা, প্রয়োজনীয় অঙ্গসংগঠন তৈরি করা, নিজেদের কোর সমর্থকদের আস্থায় রাখা ইত্যাদি। এই রাজনীতি হলো একটা দলের মৌলিক ভিত্তি। এটার নিয়মিত ও যথাযথ চর্চার মাধ্যমে একটা দল বড় ও শক্তিশালী হয়।


দ্বিতীয়ত, ভোটের রাজনীতি। উদ্দেশ্যগত দিক থেকে এটাই মূল কাজ, যেহেতু রাজনৈতিক দলের আলটিমেট লক্ষ্য হলো নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে শাসনক্ষমতায় যাওয়া। এটা প্রথমটা থেকে একটু ভিন্ন। কেননা ভোটের রাজনীতিতে শুধু নিজেদের অঙ্গসংগঠন কিংবা কোর সমর্থকদের কথা ভাবলে চলবে না, বরং সমমনা ও বিরুদ্ধমনা সকলের কথা বিবেচনায় আনতে হবে। তাই এটার কর্মপদ্ধতিও সম্পূর্নরূপে ভোটারদের চাহিদা অনুযায়ী হবে।


অঞ্চলভিত্তিক আলাদা আলাদাও হতে পারে। এই রাজনীতি করতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে দলীয় কিছু নীতির ব্যাপারেও হয়তো কিছুটা ছাড় দেয়া যেতে পারে, যেন জনগণের বৃহত্তর অংশ আস্থায় আসে এবং দলের ভোটব্যাংক সমৃদ্ধ হয়। এই রাজনীতি ঠিকভাবে করতে না পারলে রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে, চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।


তৃতীয়ত, রাজনীতি হলো উন্নয়নের রাজনীতি। কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে পার্লামেন্টে যেতে পারলে এই রাজনীতিই দলের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। যদি তারা সরকার গঠন করতে পারে তাহলে দেশের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করবে, জনবান্ধব কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে। যদি সরকার গঠন না করতে পারে তাহলে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহনের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে সরকারকে সহায়তা করবে, সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করবে, সরকার ভুল করলে জনগণকে নিয়ে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ সরকার গঠন করে এবং না করেও এই রাজনীতির অংশীদার হওয়া সম্ভব। আর এই রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক সময় দেশের স্বার্থে নিজেদের দলীয় লোকদের পছন্দের বাইরেও কাজ করতে হবে। এই রাজনীতি ঠিকভাবে করতে পারলে নতুন সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হবে, দলের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। না পারলে জনগণ ভোটের সময় মুখ ফিরিয়ে নিবে।


এই তিন ধরনের রাজনীতির প্রতিটি একে অন্যের পরিপূরক। কাগজে-কলমে একটি রাজনৈতিক দলের নীতি খুব ভালো থাকতে পারে, কিন্তু তা যদি জনগণকে জনগণের ভাষায় বুঝানো না যায়, তাহলে ভোটের রাজনীতিতে মার খেয়ে যেতে হবে। আবার একবার নির্বাচিত হবার পর উন্নয়নের রাজনীতি ঠিকভাবে করতে না পারলে পরবর্তী নির্বাচনেই মানুষজন মুখ ফিরিয়ে নেবে। এমনকি শুধু উন্নয়ন করেও দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া সম্ভব হবে না, যদি নিজেদের দলীয় রাজনীতি ঠিক না থাকে। কারণ, দল ঠিক না থাকলে উন্নয়নের রাজনীতির সুফল দল ঘরে তুলতে পারবে না, অন্য কেউ তা ভোগ করবে। অর্থাৎ একটা রাজনৈতিক দল যত ভালোভাবে এই তিন ধরনের রাজনীতির মাঝে সমন্বয় করতে পারবে তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে তত শক্তিশালী হবে, উন্নতি করবে, বারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে।


এই তিন ধরনের রাজনীতির মাঝে সমন্বয় কতটা ভালো হতে পারে তা বর্তমানে ভারতের ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টিকে(বিজেপি)দেখলে বুঝা যায়। ডানপন্থী এবং ক্ষেত্রবিশেষে উগ্রপন্থী কিছু আচরণ বিবেচনায় নিয়েও বলা যায়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দলের আদর্শ উদাহরণ হলো বিজেপি, যদিও দলটির বয়স মাত্র ৩৭ বছর।


প্রথমবারের মতো ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত দুই মেয়াদে দলটি ভারতের ক্ষমতায় ছিলো। সে সময়ের কিছু ভুলের জন্য পরবর্তী দুই মেয়াদে কংগ্রেসের কাছে মসনদ হারায়। ২০১৪ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি বেশ আটঘাট বেঁধে নেমেছে এবং সফলও হচ্ছে। তাদের নতুন শ্লোগান হলো ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ তৈরি করা অর্থাৎ একমাত্র সর্বভারতীয় দল হিসেবে সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার করা। এই কাজে তারা সফলও হচ্ছে। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনই এর বড় প্রমাণ। বর্তমানে ভারতের ২৯টি রাজ্যের মাঝে ১৭টিতে বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। লোকসভা ও রাজ্যসভা দুইটিতেই তাদের রয়েছে নিরঙ্কুশ আধিপত্য।


বিজেপির বর্তমান রাজনীতির কয়েকটি দিক উল্লেখ করা যেতে পারে। দলটির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ মন্ত্রীসভায় নেই, সংসদ সদস্যও নন। কেন্দ্রীয় সম্পাদকদের বেশিরভাগই তাই। ফলে নিজেদের দলীয় রাজনীতির ব্যাপারে তারা সার্বক্ষণিক মনোনিবেশ করতে পারছেন, দলের সাংগঠনিক ভিত শক্তিশালী করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করতে পারছেন।


এটা গেলো দলীয় রাজনীতির ব্যাপার। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে এমনকি বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও তাদের নেতৃবৃন্দের মুখে উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য শোনা গিয়েছে। এটা তারা সচেতনভাবেই করেছেন। কেননা মানুষজন এটা শুনতে চায়। এতে তাদের ভোট বাড়ে বৈ কমে না। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগী আদিত্যনাথকে নির্বাচিত করার পেছনেও রয়েছে দীর্ঘমেয়াদে ভোটের রাজনীতির চিন্তা। সাম্প্রতিক সময়ে গুজরাটে গোহত্যা নিষিদ্ধ করার যে আইন হলো সেটাও ভোটের রাজনীতিরই খেলা।


একইভাবে উন্নয়নের রাজনীতিতেও মোদী-নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার পিছিয়ে নেই। এর একটা বড় উদাহরণ হলো, ৫০০ ও ১,০০০ রুপির নোট বাতিল করা। দুর্নীতি রোধে নোট বাতিলের এই সিদ্ধান্ত স্বয়ং বিজেপির অনেক নেতাই পছন্দ করেননি, বিরোধীরা তো একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনেই নেমেছিল। কিন্তু তাও এই সিদ্ধান্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিয়েছিলেন দেশের স্বার্থে এবং এই সিদ্ধান্ত বিজেপিকে দল হিসেবে এগিয়ে দিয়েছে।


তিন ধরনের রাজনীতিতে বিজেপির এই সমন্বয় দলটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে এবং বড় ধরনের কোনো ভুল না করলে সামনের লোকসভা নির্বাচনেও যে বিজেপি জয়ী হবে - তা এখনই বলে দেয়া যায়।


ভারতের ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশাল পার্থক্য আছে। বিজেপির বড় সুবিধা হলো তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেশবিরোধী কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল নেই, যা বাংলাদেশে আছে। তাছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে ধরনের ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে হচ্ছে, সেটাও ভারতে নেই।


এতোসব সামলে নিয়েও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে একটা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমরা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছি, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব নেতৃত্বের কাতারে দাঁড়িয়েছেন। তারপরও মাঝে মাঝে উন্নয়নের রাজনীতি, দলীয় রাজনীতি এবং ভোটের রাজনীতিতে সমন্বয়ের ব্যাঘাত ঘটছে। শেখ হাসিনা যে গতিতে নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন সেই গতিতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যেতে পারছে না। সাম্প্রতিক কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এর প্রমাণ।


আর দেড় বছর পর পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে সর্বোচ্চ সফলতা আনতে হলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে তিন ধরনের রাজনীতির মাঝে সমন্বয় করতে হবে। কাজ শুরু করার এখনই সময়। কুমিল্লার নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটতে হবে, ছেঁড়া সুতোগুলো জুড়ে দিয়ে একসুরে বাজাতে হবে।


এতো কথা বলার একটাই কারণ। বাংলাদেশের স্বার্থেই শেখ হাসিনার সরকার দরকার, আওয়ামী লীগকে দরকার। এই অপ্তবাক্য মাথায় নিয়েই দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কাজ করে যাবে, একজন আওয়ামী সমর্থক হিসেবে এটাই প্রত্যাশা।


লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com