বাংলা ভাষার মান কতটুকু রাখতে পেরেছি?
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪:১৪
বাংলা ভাষার মান কতটুকু রাখতে পেরেছি?
তাসলিমুল আলম তৌহিদ
প্রিন্ট অ-অ+

ফেব্রুয়ারির প্রথম থেকেই পত্রিকা, অনলাইন ও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষার মাসের স্মরণে বিভিন্ন ধরনের লেখালেখি। তাই নিজেকে জড়িয়ে ফেললাম ভালোবাসার তাগিদে লেখার জন্য। ভাষা আন্দোলন বা স্বাধীনতা আন্দোলন দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু ইতিহাস আমাদের প্রজন্মের কাছে যে বার্তা দিয়েছে, সেখান থেকেই দেশের মমতা বোধের সৃষ্টি হয়েছে।


পেয়েছি দেশাত্ববোধক হাজারো গান, যেখান থেকে খুঁজে পাই অন্তরের খোরাক। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারিসহ’ হাজারো গান, যেগুলো শুনলে শরীর শিউরে উঠে মাতৃভূমির প্রতি অসীম ভালোবাসায়। অন্তর থেকে জানান দিতে থাকে- সুযোগ থাকলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজপথে নামার। সেই সুযোগ নেই আমাদের, কারণ রফিক, সালাম, জব্বারের মত আরো নাম না জানা আমাদের ভাইয়েরা তৎকালীন পকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেদের জীবন দিয়ে এনে দিয়েছেন বাংলা ভাষা। কাজেই আমাদের দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে, সেই বাংলা ভাষার রক্ষণাবেক্ষণ করা ও শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদন করা। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে আমরা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছি?


পৃথিবীর অন্য যে কোন ভাষার চেয়ে বাংলাভাষার মান বা ঐশ্বর্য আলাদা। কারণ এই ভাষার স্বীকৃতি পেতে দিতে হয়েছে লক্ষ প্রাণ। তাইতো বাংলা ভাষার গুরুত্ব বুঝাতে যেয়ে হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘বাংলা ভাষা মানুষ বা তরুর মত জন্ম নেয়নি, কোন কল্পিত স্বর্গ থেকেও আসেনি।’


শুধু এই দিক থেকে নয়, প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে এটাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু সেই ভাষাকে আমরা কতুটুকু শ্রদ্ধাভরে ব্যবহার করছি? আমরা প্রতিনিয়ত এই ভাষাকে সংকুচিত করে ফেলছি। কথায় কথায় আধুনিকতার জন্য ইংরেজি সংমিশ্রণে বাংলাভাষায় কথা বলাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা আবার ‘বাংলিশ’ বলা হয়। আমরা বাট-সো বলতেই যেন সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এই প্রচলনটা গ্রামগঞ্জে বেশি হচ্ছে তা নয়, শিক্ষিত সমাজেই বেশি ঘটছে। এখানেই নয়, যদি অন্যদিক দেখি, যে জিনিসগুলো ইংরেজি করা প্রয়োজন নয়, তারপরও আমরা সেগুলোকে ইংরেজি করছি কেন? যেমন ঢাকা শহরসহ সারা বাংলাদেশে সাইনবোর্ড গুলো অধিকংশেই ইংরেজির ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে।


যদি মনে হয়, ইংরেজিতে সচেতনতার জন্যই এইগুলো আমরা করছি। তাহলে বলবো আমরা সেখানেও কার্যত সফল হতে পারেনি। কেননা একটু পরিসংখ্যান ঘটলেও দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ইংরেজিতেই আশানুরুপ ফল করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একইভাবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় যে বোর্ডগুলো ভালো ফল করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানেও আমরা ইংরেজিকে খুঁজে পাব।


ইংরেজির বিষয় ভিন্ন, কারণ সেটা আন্তর্জাতিক ভাষা। জানাটা সবার জন্য জরুরি। এবার আসি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভাষা হিন্দি আমরা সেভাবে চর্চা শুরু করেছি, তাতে বোধহয় হয় নিজেদের অস্তিত্বই ধরে রাখা কঠিন। দেদারসে চলছে ভারতীয় হিন্দি চ্যানেল, সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছি আমরা হিন্দি ভাষা। এছাড়া দিনদিন বলিউডের মুভিগুলো যেন বাংলা সিনেমার চেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এগুলো রোধ করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ভাষাকে বিকৃতির মাধ্যেমে বিদেশী ভাষার সংমিশ্রণে বাংলা গান রচিত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নাটকেও বাংলা ভাষাকে বিকৃতি করা হচ্ছে। এইভাবে যদি আমরা খেয়াল করে দেখি তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না, যে ভাষার বিকৃতির আমাদের দ্বারাই বেশি হচ্ছে।


আমরা যদি মহান একুশের বিশ্লেষণ করতে যায়, তাহলে বলতে হয় শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতেই আমাদের একুশের এই উদযাপন। কিন্তু একদিকে যেমন আমরা প্রতিনিয়ত ভাষা বিকৃতি চলেছে, অন্যদিকে স্মৃতি রক্ষণাবেক্ষনের কোন দায়িত্বই নেই। শুধু ফেব্রুয়ারি আসলেই আমাদের সালাম, জব্বার, রফিকসহ অন্যদের কথা মনে পড়ে। স্মৃতিগুলো ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এর রক্ষাণাবেক্ষণ জরুরি। শ্রদ্ধা কথা বলতে গেলে একুশে মহান দিনে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, কিন্তু ফুল দিতে যেয়ে যেন নিজেদের অবস্থান জানান দেওটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে ব্যাস্ত সেলফি তুলতে, তারচেয়ে উদ্বোগের বিষয় আমাদের জন্য শহীদ মিনারে জুতা পায়ে উঠা? এটা কোন ধরনের আচরণ?


কয়েকটি টিভি চ্যানেলে এই দৃশ্য দেখে সত্যিই হতাশ। অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব জুতা পায় দিতে উঠছে বেদিতে। অন্যদিকে দেখা গেল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের শ্রদ্ধা জানানোর নামে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ। ফুল ভেঙে চুরে নিজেরা মিডিয়াতে মুখ দেখাতেই ব্যস্ত। সত্যিই এইটাই যদি শহীদদের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে শহীদদের আত্মা কি শান্তি পাবে?


শেষ কথা, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি আসলে আমাদের ভাষা শহীদদের প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়, তখন শুরু হয় সভা-সেমিনার করার প্রতিযোগিতা। আর মাস শেষ হলে ব্যানারগুলো ভাঁজ করে রেখে দেয় সামনে বছরের জন্য। সময় এসেছে নতুন করে ভাবার, সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলকে ভাবতে হবে। প্রকৃত শ্রদ্ধা করতে হবে শহীদদের এবং ভাষা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক ভাবে ২১ ফেব্রুয়ারির যে স্বীকৃত পেয়েছিলাম, তা কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে।


লেখক: সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com