রোহিঙ্গা ইস্যু: আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান কোথায়?
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১১:৩৬
রোহিঙ্গা ইস্যু: আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান কোথায়?
মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
প্রিন্ট অ-অ+

মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো দলবদ্ধভাবে বসবাস। এ দলবদ্ধতা থেকে প্রবর্তিত হয়েছে মানবসমাজ ব্যবস্থা। মানবসমাজের বৃহত্তর প্রয়োজনে গড়ে উঠে রাষ্ট্র। আধুনিক যুগ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার যুগ। বিশ্বের রাষ্ট্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় দেশ কোন একক জাতি, একক সম্প্রদায়, ধর্মীয় গোষ্ঠী বা শ্রেণীর নয়। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সার্বজনীন। নির্দিষ্ট কোন দেশের সকল ধর্মের, সকল বর্ণের ও সকল গোষ্ঠীর জন্য এক সার্বভৌম ব্যবস্থা।


আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অভ্যন্তরেও দেখা যায় আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরুসহ নানান মত বিরোধ। মানুষকে বাঁচতে হয় সংগ্রাম করে। বাঁচার জন্য মানুষ নানা পথ খুঁজে। অনেক ক্ষেত্রে পালিয়ে বাঁচতে চায়। কঠিন পথ অতিক্রম করে মুখোমুখি হয় বাস্তবতার, জড়ায় এক বিপদ থেকে আরেক বিপদে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত দাঙ্গা ও ধর্মীয় প্রতিহিংসার শিকার দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। অথচ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মানবতাবিরোধী অপরাধে চরম ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশও।


আমি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী একজন নাগরিক। এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবান জেলায় কর্মরত সরকারি সমাজকর্মী। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা এ অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা প্রত্যক্ষ করছি জন্মলগ্ন থেকে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন কালেও এ সমস্যার প্রত্যক্ষদর্শী। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে দীর্ঘ দিন অবৈধ বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে সৃষ্ট হচ্ছে নানান অভিযোগ ও বিরোধ। ভিনদেশী নাগরিক হিসেবে গোপনে সরকারি সেবা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি, গোপনে ভোটার তালিকাভুক্তি, রেজিস্ট্রিবিহীন বিবাহ, মানবপাচার, অবৈধ মাদকব্যবসা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অবৈধ শ্রমবাজার দখল ইত্যাদি। এসব অভিযোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তি সরকারি প্রশাসনের জন্য বিরাট উদ্বেগ এবং বাড়তি চাপ।


সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যু একটি বহুল আলোচিত এবং একান্ত মানবিক বিষয়। এটি কেবল বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের সমস্যা নয়। বরং এটি বৈশ্বিক সমস্যা ও আন্তর্জাতিক সংকট। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ও নিকটবর্তী এলাকা হল বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা। এখানে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই ব্যাপক আকার ধারণ করছে। সমসাময়িক এই ইস্যুটি অন্যতম আঞ্চলিক-সামাজিক সমস্যা হিসেবে রূপলাভ করেছে।


রোহিঙ্গা মিয়ানমারের একটি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক মুসলিম জনগোষ্ঠী। যারা নিজ দেশেও পরবাসী। বিভিন্ন সময়ে ওই দেশের দমন, নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার এ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় খুঁজছে কয়েক দশক ধরে। শুধুমাত্র বাঁচার তাগিদে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৮,০০০ বৈধ শরণার্থী এবং প্রায় ৫ লাখ অবৈধ রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। যারা কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও ঢাকা জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের জীবন বড়ই করুণ, নির্মম, অসহায় ও মানবেতর। এরা রাষ্ট্রহীন, বন্ধুহীন, শরণার্থী এবং উদ্বাস্ত।


মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ব্রিটিশরা ১৮২৬ সালে দেশটি দখল করে। তখন তা ভারতের একটি প্রদেশে পরিণত করে। বর্তমানে দেশটির স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুচি যার বাবা ছিলেন অং সান। তিনি মিয়ানমারের জাতির জনক। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি দেশটি ব্রিটিশ হতে স্বাধীনতা লাভ করে। যার আয়তন ছয় লাখ ৭৭ হাজার বর্গ কিমি। জনসংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ৭৬জন। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশে। যার আয়তন ৩৭ হাজার বর্গকিমি। রাখাইন প্রদেশের জনসংখ্যা ৩২ লাখ। প্রধান দুটি জাতিসত্তা রাখাইন ও রোহিঙ্গা। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন সম্প্রদায়। এ অঞ্চলের বৃহত্তম সংখ্যালঘু হল মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে এককালে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ। ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নির্যাতনে প্রায় অর্ধেক দেশান্তরিত হয়ে বর্তমান সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখেরও কমে।


বর্মী জাতির জনক জনক অং সান মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পূর্বে দেশে সত্যিকার গণতন্ত্র বা ট্রু ডেমোক্রেসি প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেছিলেন ‘একমাত্র সত্যিকারের গণতন্ত্রই জনগণের প্রকৃত মঙ্গল করতে পারে, যা শ্রেণী, গোত্র অথবা ধর্ম কিংবা লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগ দেয়। জনগণই প্রকৃত সার্বভৌম। যদি জনগণের স্বার্থকেই প্রাথমিক বিবেচনায় নিয়ে শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারি তাহলেই সত্যিকারের গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হবে (দ্য পলিটিক্যাল লিগাসি অব অং সান)।


১৯৪৮ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৩ ধারায় অন্যান্য জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও আরাকানিজ মুসলিম নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত ছিল। পঞ্চাশের দশকে দেশটির গণতান্ত্রিক উনু সরকার রোহিঙ্গাসহ ১৪৪টি জাতিগোষ্ঠীকে সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মিয়ানমারে সাধারণ জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক শক্তির অভিযাত্রা ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা সরকারের হাতে পরাভূত হয়।


জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে রোহিঙ্গারা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রহীন নাগরিক (stateless citizen)। রোহিঙ্গারা প্রথম বৃহৎ নির্যাতনের শিকার হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে। যখন বার্মার রাজা আরাকান রাজ্য দখল করে নেন। আবার দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালে ১৯৪২ সালে জাপান যখন বার্মা দখল করে নেয়। তখন তারা গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও নির্যাতনের শিকার হয়। ধারণা করা হয় ওই সময় প্রায় ৫০,০০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়। ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখলের পর রোহিঙ্গা নৃগোষ্ঠীর উপর নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া। শুরু হয় তাদেরকে রাষ্ট্রহীন করার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। ১৯৭০ সাল থেকে তাদের নাগরিকত্ব সনদ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। এভাবে রোহিঙ্গারা stateless citizen এ পরিণত হয়। ১৯৮২ সালের ১৫ অক্টোবরে সামরিক জান্তা জেনারেল নে উইন নতুন নাগরিকত্ব আইন জারি করেন। আইনটিতে মিয়ানমারে তিন ধরনের নাগরিকত্বের বিধান রাখা হয়। যেখানে ১৩৫টি গোত্রভুক্ত মানুষকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তিন ধরনের নাগরিকত্ব আইনের কোনটিতে ‘রোহিঙ্গা’ নামের কোন জাতিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।


রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক trajectors এর পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৪২, ১৯৬২, ১৯৭৮, ১৯৯২ ও ২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের আরাকান থেকে বিতাড়ন করা হয়। ১৯৭৮ সালে অপারেশন ‘নাগামিন ড্রাগন’ কালে ১,৬৭,০০০ জন রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্তু বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। ১৯৯১ সালের ২৬ জুনের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী অপারেশনের ফলে আরো ২,৫০,৮৭৭ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।


মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক অং সান সুচি। বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আসীন। তাঁর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে গত বছরের শেষ ভাগে পুনরায় শুরু হয় নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ। মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। যা জনসংখ্যা বহুল বাংলাদেশের জন্য মরার উপর খাড়ার ঘায়ের শামিল (extra burden)। সূত্র: দি জার্নাল অব সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট, ঢাবি, সংখ্যা-১, জুন’২০১৩।


রাষ্টীয় বৈষম্যের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মূলত মিয়ানমারের নাগরিক। এর ঐতিহাসিক সত্যতা আছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাখাইন প্রদেশে (আরাকান রাজ্যে) বসবাস করে আসছে। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আগত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান ও স্থানীয় আরকানিজদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উৎপত্তি। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের দাবি, রোহিঙ্গা হলো ভারতীয়, বাঙ্গালি ও চাঁটগাইয়া। ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে আরাকান এনেছে। এই দাবির সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না। খ্রিস্টীয় ৮ম শতকে চন্দ্র বংশীয় রাজারা আরাকান শাসন করতেন। রাজা মহৎ উঙ্গ চন্দ্রের রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০) কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্যতরী রামব্রী দ্বীপের কাছে বিধস্ত স্থলে তাদের আরোহীরা ‘রহম’ ‘রহম’ (দয়া কর দয়া কর) মর্মে চিৎকার করতে থাকেন। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে আরাকান রাজার কাছে নিয়ে গেলেন। আরাকান রাজা তাদের উন্নত আচরণে সন্তুষ্ট হন। তাদেরকে আরাকানে বসত স্থাপনের অনুমতি দেন। আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ স্থানীয় লোকজন তাদের রহমত গোত্রের লোক মনে করতেন। তারা ‘রহম’ বলেই ডাকতে লাগল। এবং ক্রমশ শব্দাটি বিকৃত হয়ে রহম> রোয়াই> রোঁয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গা হয়ে যায়।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ তাদের গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, মুসলমানরা বার্মায় বসত স্থাপনের পর হতে রাজকীয় উপদেষ্টা, প্রশাসক, মেয়র ও স্থানীয় চিকিৎসাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গত শতাব্দীর ৫০ দশকেও সংসদ সদস্য পদসহ সরকারের নানা উচ্চপদে আসীন ছিল তারা। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এ গোষ্ঠীকে দেশের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ। এ কারণে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে আজ চরম অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত সংখ্যালঘু ও জনগোষ্ঠী। নুন্যতম মৌল-মানবিক অধিকার বঞ্চিত। তাদের আর্তনাদ শোনার কেউ নেই।


মিয়ানমারে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের উত্থান হলে সংখ্যালঘু রাখাইন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর আগ্রাসন শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তানি প্ররোচনা ও সাহায্যে স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গারা আরাকান মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে। তখন থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের রোষানলে পড়ে। ১৯৬২ সালের সামরিক জান্তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা চালায়। বৌদ্ধ মৌলবাদীদের আস্থা অর্জনের জন্য রোহিঙ্গা নিধন ও উচ্ছেদকে পুঁজি হিসেবে গ্রহণ করে। গত বছরের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের মংডু জেলায় ৩টি পুলিশ ফাঁড়িতে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। নিহত হয় ৯ জন পুলিশ সদস্য। লুট করা হয় অস্ত্র ও গোলা বারুদ। প্রকৃত হামলাকারী কারা, তা আদৌ স্পষ্ট নয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সন্ত্রাসী পাকড়াও করার জন্য শুরু করে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’। জাতিসংঘের তথ্য মতে এ অপারেশন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে।


তবে আন্তর্জাতিক চাপে অবশেষে সান সুচি রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানকল্পে পরামর্শক কমিটি গঠন করেছেন। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে মিয়ানমারের ৬ নাগরিক ও ৩ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ নিয়ে ‘রাখাইন কমিশন’ গঠিত হয়। কমিশন তদন্ত শুরু করেছে। কমিশনের তদন্ত দল রাখাইন প্রদেশে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা পরিদর্শন করেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।


প্রতিবেদনে দেখা যায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গারা গণহত্যা, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, শিশু নির্যাতন, প্রবীণ-প্রতিবন্ধী নির্যাতন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, জোরপূর্বক শ্রমহরণ, শস্য ক্ষেত ধ্বংস সাধন, বসতভিটায় অগ্নিসংযোগসহ হাজারো মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার নাগরিক। তারা জোরপূর্বক অভিবাসী ও রাষ্ট্রহীন নাগরিক। অথচ মিয়ানমারের সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত দ্বন্দ্বে আক্রান্ত বাংলাদেশও। এটা বাংলাদেশের আঞ্চলিক সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, মানবপাচার, বস্তি সমস্যা ও ভিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল জর্জরিত। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক উদ্ধাস্তু সমস্যা। সৌদি আরব, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আট লক্ষাধিক রোহিঙ্গা দেশান্তরী হয়েছে।


বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘সবার বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুর শান্তিুপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশী। দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক তৎপরতার মাধ্যমে সরকার এ আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমার। এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র বাংলাদেশ। উভয় রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক সরকার বিদ্যমান। দু’জন নারীর নেতৃত্বে উভয় রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে। দু’ নেত্রীর মধ্যে বিদ্যমান অন্যতম প্রধান মিল, উভয়ই জাতির জনকের কন্যা। যোগ্য উত্তরাধিকারী। তাঁদের কাছে স্ব-স্ব জাতির প্রত্যাশার ব্যাপ্তী ও ব্যাপকতা সীমাহীন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতিসতর্কতার সঙ্গে এ সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সুচি রাখাইন কমিশন গঠন করে বিশ্বকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি ও তার সরকার, এ সংকট নিরসনে বিশ্বাসী এবং উদ্যোগী।


বহুজাতিক বা বহুদলীয় সমন্বিত দেশ হল আদর্শিক রাষ্ট্র। বহুধার্মিক বা বহুমতের শৃঙ্খলিত রাষ্ট্রই হল সার্বজনীন রাষ্ট্র। আধুনিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য্য তার সার্বজনীন নীতির উপর নির্ভরশীল। তবে দীর্ঘ সেনাশাসন কবলিত বর্মী রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি আজও সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। তাদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও জাতিগত বিরোধের বোঝা বাংলাদেশের উপর চাপানো হয়েছে। কফি আনান কমিশন রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা নিধন প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করেছে। এ গ্রহবাসী একটি সুন্দর আগামী প্রত্যাশা করছে।


লেখক: প্রাবন্ধিক


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected].com, [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com