সময়ের আয়নায় সরস্বতী-কথা
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:৪৬
সময়ের আয়নায় সরস্বতী-কথা
পংকজ দেব অপু
প্রিন্ট অ-অ+

জীবনের দুটো গতি। উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। উত্তরায়ণ মানে ঊর্ধ্বদিকে যাওয়া আর দক্ষিণায়ন মানে নিচে নেমে আসা। উত্তরায়ণে গেলে পুনর্বার জন্ম নিতে হয় না অর্থাৎ মায়া-মোহের এই পৃথিবীতে আর ফিরে আসতে হয় না। শুক্লপক্ষে চিরবিদায় গ্রহণ করলে তাই মুক্তিলাভ ঘটে। হয়তো সেই কারণেই প্রাচীন মুনিঋষিরা সৎ আর পুণ্য কর্মকে শুক্লপক্ষে করার বিধান দিয়েছেন। শ্রীমৎভাগবত গীতার অষ্টম অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে।


সনাতন ধর্মের পবিত্র উৎস বিধায় উত্তরায়ণের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে পূজা করা হয় সরস্বতী দেবীর। সরস্বতী মানে যেহেতু জ্ঞান, তাই তার পূজা মানেই জ্ঞানের পূজা। দেবীর কাঠামো থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। দেহকাঠামোর অঙ্গভঙ্গি যেন জ্ঞানের পূর্ণ খনি। সেই খনিতে যদি সাধক একবার নামতে পারেন তাহলে পার্থিব মায়া জাল তাকে আর বন্দী করতে পারে না।


দেবীর দুই হাত, বর্ণ তাঁর সাদা। বাহন তাঁর রাজহংস, দু’হাতের একটিতে বই, অন্যটিতে বীণা। সাদা মানে স্বচ্ছ আর স্বচ্ছতা যেখানে সেখানেই পূর্ণতার অধিষ্ঠান। মনের ভাব প্রকাশিত ভাষায় বই যার আধার আর বীণা থেকে উঠে আসা সুর বিমুগ্ধ করে মানুষকে। বীণা হল মেরুদণ্ডের প্রতীক, দেহের খুঁটি মেরুদণ্ড। দেহের বীণায় তিনটি তার, মেরুদণ্ডেরও তিনটি তার। তিনভাবে তিনরকম গুণের স্বর। সাধক যখন মেরুদণ্ড-বীণার সুষম্না তারে প্রাণের আবেগ দিয়ে আঘাত করেন তখন বেজে উঠে মধুর সুর। দেবীর বীণা থেকে উত্থিত সপ্তস্বর-সা রে গা মা পা ধা নি। প্রথম দুই স্বর ’সা’ এবং ’রে’ দেবী নামের প্রথম দুটো বর্ণ। ‘গ’ এবং ‘ম’ তে বোঝায় গমন। ‘প’ তে পবিত্রতা ‘ধ’ তে ধারণ আর ‘ন’ তে আনন্দ।


শব্দবিজ্ঞানে এই সাত স্বরকে কল্পনা করা হয়েছে যা ধর্মের সাথে অটুট বন্ধনে বাঁধা। ঋগ্‌বেদে বলা হয়েছে ‘শব্দই ব্রহ্ম’। শব্দ নিঃশেষ হলে দেহ প্রাণহীন, অকেজো। দুধ মেশানো জল থেকে জলকে বাদ দিয়ে শুধু দুধটুকু গ্রহণ করে রাজহংস। জগৎ সংসারে সার এবং অসার দুটো সত্তা। যোগীরা পার্থিব সামগ্রী থেকে গ্রহণ করেন সার, পড়ে থাকে অসার।


সরস্বতী শব্দসত্তা। বাকদেবীর করুণায় অসাধারণ বাগ্মিতার অধিকারী হই আমরা। তাই আমরা তাঁর করুণাপ্রার্থী। দেবীর বীণা থেকে উত্থিত অনন্য সুরের সংগে প্রাণ সাধকের সুরের সমন্বয় ঘটানো্‌ই জ্ঞানসাধনার চরম লক্ষ্য। সেই সুরের সংগে যখন ঘটে না সুরের ঐক্য তখনই জীবন হয়ে উঠে ছন্দতালহীন, একবারে দারুণ এলোমেলো আর জমে থাকা আবর্জনা জীবনকে করে তোলে পুঁতিগন্ধময়। জীবন হয়ে উঠে ভীষণ দুঃখময়। মোহ-কালিমার অলীক অন্ধকারে আমরা হারিয়ে ফেলি আপনসত্তা।


এ থেকে উত্তরণ লাভে আমাদের আশ্রয় নিতে হয় দেবী সরস্বতীর চরণ-কমলে। জ্ঞান সাধনায় সিদ্ধ না হলে ভক্তির আশা থাকে না। দেবীর শুচিশুভ্র মূর্তির দিকে চোখ তুলে তাকালে মনের রিপুসমূহ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় শুভ্রতার মধ্যেই। তাই দেবীকে বলা হয় সর্বশুক্লা, বৈরাগ্য বিদ্যার জননী। মানুষের আত্মিক যে ক্রমবিকাশ তার সাথে জ্ঞান সাধনার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।


সরস্বতী পূজার সর্বোচ্চ লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষুদ্র ‘অহং’ এর বিকাশমান কুঁড়িকে জ্ঞানরূপ সূর্যের উজ্জ্বল আলোকস্পর্শে পদ্মের মতো ফুটিয়ে তোলা। বাকদেবীর আশীর্বাদে সকল অন্ধকার বিদূরিত হয়, সবটুকু সংকোচনের ঘটে অবসান, সত্তার হয় নবউজ্জীবন। বোধশক্তির প্রকাশে জীবন হয়ে উঠে পরিপূর্ণ। আত্মিক বিকাশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলেই সরস্বতী বিকশিত শতদল পদ্মে সমাসীনা, ঐশ্বর্য ও জ্ঞানের বিধাত্রী দেবী বলেই তিনি সকল বিভব সিদ্ধিময়ী। অন্তরের আঁধার বা বিদ্যার শেষ কণাটুকু অপসারিত করেন বলেই তিনি আলোকময়ী সর্বশুক্লা সরস্বতী। দেবীর বাহন রাজহংস যেমন জলমেশানো দুধ থেকে গ্রহণ করে শুধু দুধ, তেমনি হংসের আদর্শকে জীবনে বরণ করে নিতে হবে। সমাজ থেকে অসত্য, অসুন্দরকে বাদ দিয়ে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলকেই বরণ করতে হবে। তবে সরস্বতী পূজা হবে সার্থক।


লেখক: গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী, অধ্যাপক।


বিবার্তা/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com