সার্ক সাহিত্য উৎসবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৫০
সার্ক সাহিত্য উৎসবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিনিধি
ড. মুহাম্মদ সামাদ
প্রিন্ট অ-অ+

২০০৯ সালের ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ গিয়াসউদ্দীন আহমদ আবাসিক এলাকায় আমার ৬৩/এ ফ্ল্যাটের দরজা খুলেই রীমা জানালো যে, প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জরুরি চিঠি এসেছে। চিঠিটি ‘ফাউন্ডেশন অব সার্ক রাইটারস অ্যান্ড লিটারেচার’-এর চিফ অ্যাডভাইজার লেখক-সংগঠক মিজ অজিত কাউর পদ্মশ্রীকে লিখা। চিঠিতে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে বিডিআর বিদ্রোহের মত বেদনাবিধুর ক্রান্তিকাল উপস্থিত হওয়ায় ভারতের আগ্রায় অনুষ্ঠেয় সার্ক সাহিত্য উৎসবের প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতে পারছেন না বলে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে যেতে নির্দেশ করেছেন। ইংরেজিতে লিখা এই চিঠি পড়ে আমি খুব অবাক হই- যেমন অবাক হয়েছিলাম শেখ হাসিনার দ্বিতীয় নির্বাচনী এলাকা ও তাঁর স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার গ্রামের বাড়ি পীরগঞ্জে জন্ম-নেয়া মধ্যযুগের বাঙালি কবি হেয়াত মামুদের জন্মোৎসবে যোগ দেয়ার জন্যে মন্ত্রী-কবি ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে যখন আমাকে পাঠিয়েছিলেন। তখন আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল রংপুর সার্কিট হাউজের নিচতলার পাঁচ নম্বর কক্ষে। রংপুরের বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছিলেন- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখনই রংপুর অঞ্চলে তাঁর রাজনৈতিক সফরে আসতেন তিনি এই পাঁচ নম্বর কক্ষটিতে অবস্থান করতেন। তথ্যটি জেনে আমি খুব শিহরিত বোধ করি! কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত সেই কক্ষে রাত্রিযাপনের সৌভাগ্য হলেও আমি সেদিন ঘুমাতে পারি নাই। বঙ্গবন্ধুর জীবন সংগ্রাম, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর সপরিবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা ভেবে ভেবে আমার রাত কেটে যায়।


এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিঠির কথায় আসি। লেখক শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন লেখক অজিত কাউর। এই সময়ই, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি বিজয়ী নেতা হিসেবে তিনি দ্বিতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় সেই বছরের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষা বাহিনী ‘বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)’-এর একটি অংশ বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহী বিডিআর সৈন্যরা তাদের সদর দফতর দখল করে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও ১৭ জন বেসামরিক লোককে হত্যা করে। তারা বহু অফিসার ও তাঁদের পরিবারকে জিম্মি করে বাসা-বাড়ি, বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর এবং মূল্যবান সম্পদ লুটপাট করে। সেই সময় বিডিআর ক্যাম্প আছে এমন আরো ১২টি শহরে ও সীমান্তবর্তী এলাকায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়োকোচিত প্রাজ্ঞ পদক্ষেপে সেই ষড়যন্ত্রমূলক ও ভয়াবহ বিদ্রোহের অবসান ঘটে। রাষ্ট্রের এমন সংকটকালে দেশের বাইরে কোন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া তাঁর পক্ষে মোটেই সম্ভবপর ছিল না। তাই সার্ক সাহিত্য উৎসবের মুল থিম, কবি-সাহিত্যিক ও পন্ডিতবর্গের ভাবনা-চিন্তা সম্পর্কে তাঁর অপার আগ্রহ এবং স্বজন হারানো সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবার-পরিজনের পাশে থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীমতী অজিত কাউরকে যে চিঠি লিখেন তা ঐতিহাসিক কারণে প্রণিধানযোগ্য। পাঠকদের জন্যে চিঠিটি এখানে তুলে দিলাম:


My dear Mr [s]. Ajeet Cour, 10March 2009


I thank you most sincerely for you letter of invitation to me for participating in the "Festival of SAARC Literature", in Agra on 13 March 2009. I am also grateful for your considering me as Chief Guest in this august moot of gifted litterateurs from all SAARC member countries.


May I say it has been with immense pleasure I went through the contents of your letter. I was particularly impressed that the gathering of scholars would also deliberate, among other important issues, the serious theme of terrorism, and its multi-dimensional impact, on the lives and literature of the people in our South Asian region. The intellectual level of discussions would surely give birth to new and innovative ideas, which could inspire governments in appraising afresh their measures and policies towards this, and other growing malaises, like ethnic conflicts and fundamentalism. Moreover, the presence of literary geniuses as Mahasveta Didi would undoubtedly contribute significantly to the intellectual aura and ambience of the literary festival.


As one who delves in art and literature, in rarely available spare time these days, it was for me an opportunity for enjoyment and pleasure. Unfortunately, I have to forego this unique opportunity, in view of the tragedy of 25 February, when we lost scores of our youthful army officers, in an act of unprecedented terrorism ever to occur anywhere in our present day world. As of now, I am deeply engrossed in sharing the sorrows of families of those who have lost their near and dear ones, as well as calming our stunned nation. I am sure you understand the gravity of our national dilemma, and therefore, would appreciate my inability to be present in this year's "Festival of SAARC Literature. ‘However, I would look forward to such enjoyable occasions in the future.


In my absence, nevertheless, I have asked Dr. Muhammad Samad, Prof., Institute of Social Welfare & Research, University of Dhaka, Dhaka-1205 (email: [email protected]) one of our promising litterateurs, to participate in this important gathering of writers of the SAARC region.


Yours Sincerely,


(Sheikh Hasina)


Mr[s]. Ajeet Cour
Chief Advisor
Foundation of SAARC Writers and Literature (FOSWAL)
4/6, Siri Fort Institutional Area,
New Delhi-110049, India.


বলা আবশ্যক যে, পরে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের নাম যুক্ত করে আরেকটি সংশোধিত চিঠি শ্রীমতী অজিত কাউরকে দেয়া হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের নানান পদক-পুরস্কারে ভূষিত সেলিনা আপা অজিত কাউরের বিশিষ্ট বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজন। ফাউন্ডেশন অব সার্ক রাইটারস এন্ড লিটারেচার-এর পক্ষ থেকে তিনি আগেই আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং আমার আগেই আগ্রায় চলে গিয়েছিলেন। তাঁকে যুক্ত করার ফলে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনার প্রতিনিধি হিসেবে সেলিনা আপা আর আমি ভারতের আগ্রায় অনুষ্ঠিত সার্ক সাহিত্য উৎসব (Festival of SAARC Literature)- এ যোগদান করি। অজিত কাউরের আমন্ত্রণে সে বছর বাংলাদেশ থেকে কবি খন্দকার আশরাফ হোসেন, কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান ও লোকগবেষক সাইমন জাকারিয়া সার্ক সাহিত্য উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন।


শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন


২০০৯ সালের ১৩ থেকে ১৬ই মার্চ ভারতের উত্তর প্রদেশে আগ্রার তাজ সিটিতে সার্ক সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অজিত কাউর আমারও পূর্ব পরিচিত। ২০০১ সালে কবি শামসুর রাহমানকে এক লক্ষ রুপি মূল্যমানের সার্ক লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড দিতে ঢাকায় এলে জাতীয় জাদুঘরে অজিত কাউরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি তখন জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তিনি একাধিকবার সার্ক সাহিত্য উৎসবে যোগদানের জন্যে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু আমার যাওয়া হয়ে ওঠে নাই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রতিনিধি হিসেবে সার্ক সাহিত্য উৎসবে যোগদান করা যার কপালের লিখন, তার তো যাওয়া না হয়ে ওঠারই কথা! অবশেষে ১৩ই মার্চ দুপুরে আমি আগ্রা বিমানবন্দর থেকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাই এবং উৎসবের উদ্বোধক সার্কের তৎকালীন মহাসচিব শ্রী শীলকান্ত শর্মা ও সম্মানিত অতিথি ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পদস্থ কর্মকর্তা ড. খেয়া ভট্টাচার্যের ভাষণ শ্রবণ করি। উৎসবের মূল থিম ছিল ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অভিঘাত: লেখকের ভূমিকা’। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেলিনা আপা আগেই বক্তব্য দিয়ে ফেলেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সার্ক সাহিত্য উৎসবের প্রতি ঐকান্তিক সমর্থনদান, সাফল্য কামনা ও বাংলাদেশ থেকে লেখক সেলিনা হোসেন ও আমাকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণের জন্যে আয়োজক প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন অব সার্ক রাইটারস এন্ড লিটারেচার পক্ষ থেকে অজিত কাউর বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন। নিজে একজন লেখক হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহিত্যপ্রীতি ও তাঁর প্রতিনিধি প্রেরণের কথা উৎসবে অংশগ্রহণকারী কবি-লেখকদের কাছে বহুলভাবে প্রশংসিত হয়।


রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর পরমতসহিষ্ণুতা


এবারের সাহিত্য উৎসবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান ও মায়ানমার থেকে কবি-লেখক-সাংবাদিক-সংগীতজ্ঞ-লোকসাহিত্য গবেষক ও চলচিত্রনির্মাতাগণ অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া, মূল থিম যেহেতু ছিল ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অভিঘাত: লেখকের ভূমিকা’, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের কয়েকজন লেখক-সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী এই উৎসবে যোগ দেন। সকাল থেকে প্রায় মধ্যরাত অবধি মূল মিলনায়তনে, ছোট কিছু কক্ষে, এমনকি ক্যান্টিনে নানান পর্বের অনুষ্ঠান চলতে থাকে। দ্বিতীয় দিন সকালে গণতন্ত্রের সংগ্রামে কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনায় আমরা অংশ নিই। আমি সংক্ষেপে ঈশপের গল্প থেকে জীব-জন্তু-পশু-পাখির আচরণের মধ্যে দিয়ে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার কথা উল্লেখ করে আজকের পৃথিবীতে দেশে দেশে কবি-লেখকদের অবদান তুলে ধরি। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মুহাম্মদ ইকবাল প্রমুখ কবি-লেখকের ভূমিকার কথা যেমন বলি, তেমনি চিলির পাবলো নেরুদা, প্যালেস্টাইনের মাহমুদ দারবিশ, দক্ষিণ আফ্রিকার মোলয়েসদের অবদান উল্লেখ করি। মনে আছে, আমার বক্তৃতার পর সামনের সারিতে বসা এক শালপ্রাংসু ভদ্রলোক আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দিত করলেন। নাম আবিদ হোসেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। আমার পর ছিল তাঁর বক্তৃতার পালা। গণতান্ত্রিক সমাজের সহনশীলতা ইতিহাসের আলোকে মেলে ধরলেন আবিদ হোসেন। তিনি ১৯৩৪ সালের ১৫ই জানুয়ারি বিহারের ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প এবং আরও কিছু বিষয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর একমত না হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে এই দুই প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের সহনশীলতা ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের প্রশংসা করে তা থেকে সবাইকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বললেন। জানা যায়, বিহারের ভূমিকম্প সম্পর্কে গান্ধীজী বলেছিলেন: ‘উহা অস্পৃশ্যতা পাপের প্রায়শ্চিত্ত, ভগবানের কোপ!’ রবীন্দ্রনাথ এই কথা শুনে অবাক হয়েছিলেন এবং ১৯৩৪ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে লিখেছিলেন: ‘অস্পৃশ্যতার পাপে যাহারা হত বা আহত হইয়াছে, যাহাদের গৃহাদি ধ্বংস হইয়াছে- বিধাতার শাস্তি তাহাদের উপর পড়িল, আর সারা দেশময় যাহারা স্পর্শদোষ মানিয়া চলিতেছে তাহারা তো দিব্য বাঁচিয়া থাকিল- মহাত্মাজীর এই যুক্তি কবি কেন কাহারও পক্ষে মানিয়া লওয়া সম্ভব নহে।’ যাই হোক, আবিদ হোসেন ইংরেজিতে আরও যা বললেন তার বাংলা করলে দাঁড়ায় যে, নিজেদের মধ্যে একমত না হওয়ার পরও কোন একদিন শান্তিনিকেতন থেকে বিদায় জানিয়ে গান্ধীজী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নাকি বলেছিলেনÑ ভারতবর্ষের ভগবান শান্তিনিকেতনে তাঁর চরণচিহ্ন ফেলে ফেলে চলে যাচ্ছেন! আবিদ হোসেনের জ্ঞান, তথ্যের বিস্তার, ভাষা ও বাচনভঙ্গিতে সেদিন আমি খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম।


মায়ানমার ও অং সান সু চি


মায়ানমারের কবি তিণ-তিণ উইন জু ২০০৯ সালের সার্ক সাহিত্য পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিলেন। মায়ানমার সরকার তাঁকে আগ্রা সাহিত্য উৎসবে যোগদানের অনুমতি না-দেয়ায় তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন নরওয়ে প্রবাসী বার্মিজ কবি নন্দা তিন্ত সুয়ে। নরওয়ে প্রবাসী কয়েকজন সামরিক জান্তা বিরোধী ও অং সান সু চি’র সমর্থক বার্মিজ কবি-লেখক ও ইউরোপীয় সাংবাদিক আগ্রা সার্ক সাহিত্য উৎসবে এসেছিলেন। তাঁদের পরিচালিত দিল্লি ও নরওয়ে-ভিত্তিক একটি টেলিভিশনের জন্যে সিনিয়র রিপোর্টার মাইয়ো মিন্ত অং এবং দিল্লির ‘ডেমোক্রাটিক ভয়েস অব বার্মা’র রেডিও-টেলিভিশন রিপোর্টার সোয়ে মিন আমার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। আমি সাক্ষাৎকারে মায়ানমারের সামরিক শাসনের অবসান ও সু চি’র নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলাম। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের উপনির্বাচনে সু চি’র রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি’র বিপুল বিজয়ে সে বছর মে মাসে তাঁকে নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখি। আমার কবিতার শেষ দুই প্যারায় সু চি’র ভবিষ্যৎ সফলতা নিয়ে আমি সামান্য শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম এইভাবে:


‘সু চি, আজ তুমি মুক্ত। সামনে সহস্র খোলাপথ।
কোন পথে পা বাড়াবে নিশ্চয়ই তুমি জানো;
তবু, নরম পায়ের নিচে কাঁকর, পাথর আর
ইয়াঙ্গুনের আকাশে নানান জাতের বাজ পাখিদের
আনাগোনা দেখে আমার কিঞ্চিৎ ভয় হচ্ছে!


তাই, তোমাদের আরাকান রাজসভার বাঙালি কবি
দৌলত কাজীর নায়িকা চন্দ্রানী আর
আলাওলের পদ্মাবতীর বিরহের কথা মনে করে
একালের বাঙালি কবির দায় মেটাতে আমিও
তোমার বকুল ফুলে ঢাকা কানে কানে বলিÑ
মুহূর্তে আলোর গতি লক্ষাধিক মাইল হলেও
আগুনের লেলিহান শিখা, রক্তপাত আর
ঘরে-বাইরে লোভার্ত শত্রু কবলিত
নুন আনতে পান্তা ফুরনো সমাজে
সে আলো কখন যে কীভাবে প্রবেশ করবে!’


পরে ২০১৪ সালের ২৯শে জুন ইয়াংগুনে অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক ইউনিভার্সিটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সূচকের ওপর তৈরি করা The State of the Tropics শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন নোবেলজয়ী রাজনীতিক অং সান সু চিকে দিয়ে বৈশ্বিক-উম্মোচনের জন্যে সম্মেলন আহবান করে। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুস সবুর খান এবং ‘ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)’-এর উপাচার্য হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে আমি সেই সম্মেলনে যোগদান করি। মি. সবুর সু চিকে তাঁর উপহার প্রদান আর আমার সিলেক্টেড পোয়েমস ও কবি কাজল বন্দোপাধ্যায় কৃত সু চিকে নিয়ে রচিত আমার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ উপহার দেয়ার ছবি তুলে এনেছিলেন। সিঙ্গাপুর ভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেল উদ্বোধনী পর্বটি সরাসরি সম্প্রচার করেছিল। প্রসঙ্গক্রমে সম্মেলনের প্রধান অতিথি অঙ সান সু চি তাঁর ভাষণে মায়ানমারের সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কর্মসূচি তুলে ধরেন। সেই সম্মেলনে সু চিকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে, আপনি ক্ষমতায় গিয়ে মায়ানমারের মত সামরিক শাসন কবলিত ও পশ্চাৎপদ সমাজে কিভাবে আপনার কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করবেন? সু চি’র উত্তরের একটি কথা আমার কানে লেগে আছে-Even the path might be painful; বলা বাহুল্য, রোহিঙ্গাদের বর্বর নির্যাতন করে দেশহারা করাসহ নানা বিষয়ে অতীতের মত দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান না নেয়ায় বর্তমানে সামরিক জান্তার কারাগারে বন্দি অং সান সু চি ও তাঁর দেশের চলার পথ সত্যিই বেদনাদায়ক হয়ে পড়েছে।


শরৎচন্দ্রে পথের দাবী


আমার বার্মা ভ্রমণকে ইতিহাসের আলোকে দেখার লক্ষ্যে আমি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রেঙ্গুন ভিত্তিক বিখ্যাত উপন্যাস পথের দাবী সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। ১৯২৬ সালের আগস্টে পথের দাবী প্রথম প্রকাশিত হয় এবং পরের বছর ১৯২৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতে এই সাহসী উপন্যাস নিষিদ্ধ হয়। সারা দেশ জুড়ে নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছিল। তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত এমন বিপ্লবী ছিলেন না যিনি পথের দাবী পড়ে অনুপ্রাণিত হন নাই। তখন হাতে লিখে কপি করে সশস্ত্র বিপ্লবীদের পথের দাবী পড়ানো হতো। আমি চার-পাঁচ দিন ধরে ‘হলি ডে হোটেল’-এ অনেক রাত পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পথের দাবী পাঠ করে রেঙ্গুন শহর ঘুরে ঘুরে একটুও মেলাতে পারিনি। কোথায় সেই কাঠের বাড়িঘর? কোথায় টিনের শ্রমিক কলোনীর গিজগিজে কর্দমাক্ত কোলাহল? মহাপ্রতাপশালী ব্রিটিশরাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্ধকার জঙ্গলের পোড়োবাড়িতে রহস্যময় ডাক্তার সব্যসাচীর নেতৃত্বে দেশমাতৃকার তরে নিবেদিত সুমিত্রা, হীরাসিংদের গোপন বিপ্লবী তৎপরতা; ভারতীর প্রেম, ব্রজেন্দ্রর বিশ্বাসঘাতকতা; জোছনালোকিত ইরাবতীর জলে ঢেউয়ের আলোছায়ায় দোলানো ডিঙি নৌকা- না, শতবর্ষ পরে এই নতুন রেঙ্গুন শহরে পথের দাবীর কিছুই দেখার আর উপায় নেই। তবে বার্মায় বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎকালীন কমার্শিয়াল কাউন্সিলর আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরীর ভালোবাসা ও সহৃদয়তায় মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি, বিশ্বখ্যাত শ্বেডাগন প্যাগোডা আর বার্মার ন্যাশনাল মিউজিয়ামে কারুকাজ খঁচিত পালঙ্কের ওপরে বিছানো লোককথায় শোনা অবিশ্বাস্য রুপোর পাটি দেখার স্মৃতি অমলিন হয়ে আছে। বৌদ্ধধর্ম আর বার্মার সমাজ-রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন মান্যবর রাষ্ট্রদূত ব্রিগেডিয়ার অনুপ চাকমার অনুপূঙ্খ বিশ্লেষণ শুনে সম্ভাবনাময় অথচ দুর্ভাগা দেশটির নিরীহ জনমানুষের জন্যে আমার মন বেদনায় ভরে ওঠে।


ফতেপুর সিক্রিতে


১৫ই মার্চ দুপুরের পর সেলিনা আপা আর আমার কোন নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম ছিল না। তাই একটু আগে-ভাগে দুপুরের খাবার খেয়ে আগ্রা থেকে এক-দেড় ঘণ্টার পথ সম্রাট আকবরের এক সময়ের রাজধানী ফতেপুর সিক্রি দেখতে গেলাম (১৫৭১ - ১৫৮৫)। অবশ্য ১৬০১ সালে কিছুদিন এখানে কাটিয়ে গিয়ে আর ফেরেননি আকবর। তবে মুঘল সাম্রাজ্যের পোড়াপত্তনকারী সম্রাট জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের আমল থেকেই মুঘলদের এক প্রিয় পাথুরে পার্বত্য গ্রাম ছিল ফতেপুর। সম্রাট বাবর চিতোরের রাজা রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করার পর অবকাশ যাপনের জন্যে এখানে ‘বিজয় উদ্যান’ নামে একটি বাগান বানিয়েছিলেন। সেই বাগানে একটি আটকোণা চাতাল তৈরি করে ফতেপুরে বসে বাবর তাঁর আত্মস্মৃতি বাবুরনামার অংশ বিশেষ ও কবিতা রচনা করেছেন বলে জানা যায়। উৎসবের উদ্যোক্তরা আমাদের জন্যে একজন প্রৌঢ় বাঙালি গাইড ঠিক করে দিলেন। সিক্রির ফটক থেকেই আমাদের গাইড কিছু ইতিহাস আর কিছু কিংবদন্তী বিবৃত করতে করতে রাজধানীর বিরাট উঁচু প্রাঙ্গণে নিয়ে উঠলেন। লাল বেলে পাথর ও চুন-সুড়কি দিয়ে তৈরি অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ করা সব স্থাপনা। গাইড মহোদয় সামনের দিকের একেবারে শেষ মাথা থেকে আরম্ভ করে অট্টালিকা-ভবন ও স্থাপনাগুলোর সঙ্গে জড়িত নানান কাহিনীর মুখস্থ বর্ণনা দিয়ে চললেন। জানালেনÑ মধ্য এশিয়ার তাঁবু-আকৃতির প্রথম ছোট অট্টালিকাটি আকবরের বাল্যসঙ্গিনী ও প্রথম স্ত্রী রুকাইয়া বেগমের বাসভবন; তার চেয়ে সামান্য বড়টি মারিয়াম বেগমের। আর মূল পাঁচতলা প্রাসাদে থাকতেন সম্রাজ্ঞী যোধা বাই। এখানেই সম্রাট আকবরের পীর সুফি সাধক শেখ সেলিম চিশতির আর্শীবাদে যোধা বাইয়ের গর্ভে জন্মলাভ করেন সম্রাটের একমাত্র পুত্র মুঘল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী শাহজাদা সেলিম- পরবর্তী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর। পাঁচতলা প্রাসাদের দোতলার ডান দিকের অংশ ‘সামার প্যালেস’ ও বাম দিকের অংশ ‘উইন্টার প্যালেস’ বলে পরিচিত। গ্রীষ্মকালে পাশের ‘মতিঝিল’ থেকে শীতল হাওয়া এসে যোধা বাইয়ের শরীর জুড়িয়ে দিত। ‘সামার প্যালেস’ আর ‘উইন্টার প্যালেসে’র নিচে দুই দিকে ৬০/৬৫জন দাসীর থাকার জায়গা ও মাঝখানে প্রশস্ত খোলা চত্বর। চত্বরের মাঝ বরাবর সামনে যোধা বাইয়ের পুজোর মন্দির। প্রাসাদের চূড়ার মিনার সংলগ্ন পঞ্চমতলা চারিদিকে খোলা। সম্রাটের সঙ্গে কিংবা সঙ্গী পরিবৃত হয়ে জোছনা রাতে মৃদুমন্দ হাওয়ায় যোধা বাইয়ের জীবন উপভোগের শাহী এন্তেজাম। সম্রাটের তিন বেগমের মধ্যে একা যোধা বাইয়ের জন্যে এতসব শাহী এন্তেজাম দেখে সেলিনা আপার নারী অধিকার সচেতন মন নারীর প্রতি বৈষ্যম্যে ব্যথিত হয়ে ওঠে। তিনি যোধাবাইয়ের পুত্র সন্তান জন্মদান বা সম্রাটের উত্তরাধিকারী নিশ্চিত করাকে এহেন বৈষম্যের কারণ বলে চিহ্নিত করলেন। আমিও সায় দিলাম।


তারপর গাইড মহোদয় আমাদের নিয়ে গেলেন ফতেপুর সিক্রির ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনা বাজারের পাশে দেওয়ানী খাসের সেই ভবনে- যার ভেতরে বসতো সম্রাটের নবরত্ন সভা। বাইরে থেকে একতলা মনে হলেও গোলাকার দেওয়ানী খাসের ভেতরটা দোতলা। ভেতরের দোতলায় আড়াআড়ি বিম দিয়ে কেন্দ্রস্থলে সম্রাটের, আর চতুর্দিকে নবরত্নদের নয়টি আসন বসানো। অবাক লাগে জ্ঞানালোচনার এমন অদ্ভুত ও অভুতপূর্ব আয়োজন দেখে। মনে হলো যেন- মহামতি সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর মধ্যেখানে বসে চতুর্দিক ঘুরে ঘুরে রাজা বীরবল, মিয়া তানসেন, আবুল ফজল, ফৈজি, রাজা মান সিংহ, রাজা টোডর মল, মোল্লাহ দো পিয়াজ্জা, ফকির আজিয়াও-দীন ও আবদুল রহীম খান-ই-খানানের সঙ্গে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে আলোচনা বা ধর্ম নিয়ে তুমুল তর্কে মেতে উঠেছেন।
মুখোমুখি দাঁড়ালে, প্রাসাদের দোতলার বাম প্রান্ত থেকে একটি করিডোর গিয়ে সংযুক্ত হয়েছে স্বয়ং সম্রাটের দোতলা অট্টালিকায়। এই অট্টালিকায় অস্বাভাবিক উঁচু জানালার পাশে সম্রাটের নিরাপদ শয্যা ছিল। সামনে চওড়া বারান্দা। বারান্দার সামনে নিচে চতুষ্কোণ জলাধারের মধ্যখানে একটি কালো পাথরের বেদী। এই বেদীর ওপরে বসে সুরসম্রাট মিয়া তানসেন তুলতেন সুরের ঝংকার। দোতলার চওড়া বারান্দায় সম্রাটের বেগম বা হেরেমের রূপসীদের সহযোগে সুরের মূর্ছনায় পানাহারে মত্ত সম্রাট গভীর রজনী অবধি উপভোগ করতেন সংগীতের অমৃত সুধা।


তারপর সম্রাটের নিজস্ব দোতলা অট্টালিকার পেছনে অর্থমন্ত্রী টোডরমলের দফতরের ধ্বংসাবশেষ দেখলাম। পাঁচতলা প্রাসাদ পেছনে রেখে একজন বয়স্ক ফটোগ্রাফার চটজলদি ছবি তুলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের হাতে দিলেন। সেলিনা আপার দেখার আগ্রহ ততক্ষণে কিছুটা মিইয়ে এসেছে। পুরনো প্রাসাদ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বাড়িঘর ও সেই যুগের মানুষজনের লৌকিক-অলৌকিক ঘটনার কিংবদন্তী শুনতে আমার আগ্রহ অপার। গাইড যা যা বলেন আমি তাই শুনে আনন্দিত হই। প্রাসাদের বাইরে সামান্য দূরে জামে মসজিদ আর সম্রাট আকবরের পীর সাহেব শেখ সেলিম চিশতির মাজার। প্রবেশ পথ দুটি। শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করতে সম্রাট যেতেন ‘শাহী দরওয়াজা’ দিয়ে আর অন্য মুসুল্লিদের জন্যে ‘বুলান্দ দরওয়াজা’। ‘বুলান্দ দরওয়াজা’ সম্ভবত এখনও বিশে^র সর্বোচ্চ দরোজা। আমি ‘শাহী দরওয়াজা’ দিয়ে প্রবেশ করে মাজারে ফাতেহা পড়ে ‘বুলান্দ দরওয়াজা’ দর্শন করে নিচে নামলাম এবং অপেক্ষমান সেলিনা আপার সঙ্গে দিনে দিনে আগ্রা ফিরে এলাম। উল্লেখ্য, সম্রাট জাহাঙ্গীর দরবেশ শেখ সেলিম চিশতির দৌহিত্র ও তাঁর ছোটবেলার খেলার সাথী শেখ আলাউদ্দিন চিশতিকে ইসলাম খান উপাধি দিয়ে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেছিলেন। ইসলাম খান পাঁচ বছরের অধিককাল বাংলার মুঘল সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৬০৮ - ১৬১৩)।


সার্ক সাহিত্য উৎসবের ঘোষণা


সার্ক সাহিত্য উৎসবে কিছু আমন্ত্রিত অতিথির অনুপস্থিতিতে সেলিনা আপা ও আমাকে একাধিক সেমিনারে সভাপতিত্ব করতে ও আলোচনা পর্বে অংশ নিতে হয়েছে। সাহিত্যপাঠ পর্বে সেলিনা আপা তাঁর ছোটগল্প পড়েছেন। আমি কবিতা পড়েছি। বিভিন্ন পর্বে নবীন-প্রবীণ কবি-লেখক-পন্ডিতজনের কবিতা-কথা ও আলোচনা শুনে সমৃদ্ধ হয়েছি। উৎসবে নেপালের কবি-বন্ধু আভি সুবেদি আমাদের জাতীয় কবিতা উৎসবের স্মৃতিচারণ করলেন। ঢাকায় বাংলা একাডেমির পর দ্বিতীয়বার ভারতের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকসমাজবিজ্ঞানী ড. জওহরলাল হান্ডুর বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হলো। দিল্লির হিন্দি কবি অমিত দাহিয়া বাদশা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর শহিদ অগ্রজের স্মৃতিচারণমূলক একটি করুণ কবিতা পড়ে সবাইকে অশ্রুভারাক্রান্ত করে তুললেন। পাকিস্তানের প্রবীণ লেখিকা পারভিন আতিফ, শ্রীলঙ্কার লেখক লক্ষণথা আথুকোরালা, বার্মার নে উইন মিন্ত, মালদ্বীপের তরুণী ফাতমা সউসান ও ভারতের বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার কবি-লেখকেরা সকলেই সার্ক অঞ্চলে মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। মিলনায়তনের বাইরে দাঁড়িয়ে দিল্লি প্রবাসী আফগানিস্তানের তরুণ লেখক আবদুল মানান শিউয়াইশার্কের সঙ্গে কথা হলো। তিনি তাঁর দেশের তরুণ সমাজকে লেখালেখি ও চিরায়ত উদার সংস্কৃতি চর্চায় মাধ্যমে মৌলবাদের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন বলে আমার সঙ্গে একান্ত আলাচারিতায় জানালেন। এখানে দাঁড়িয়েই আফগান যুবক মানান আর আমি আগ্রার তরুণী সাংবাদিক হিনা নিজামকে সাক্ষাৎকার দিলাম। পুরো উৎসব জুড়ে আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস দমনে ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগের বিষয়টি তুলে ধরেছি এবং মানবতার শত্রু সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে বাংলাদেশের মানুষের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছি। পরিশেষে, আগ্রা সার্ক সাহিত্য উৎসবের ঘোষণায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ এশিয়ার কবি-লেখক ও শিল্পী সমাজের সম্মিলিত প্রয়াস অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।


রচনাকাল: ১৯শে জুলাই ২০২১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


লেখক: কবি ও শিক্ষাবিদ; প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/ইমরান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com