বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়ে
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৮:০৪
বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়ে
​মাহবুবউল আলম হানিফ
প্রিন্ট অ-অ+

আমাদের এই বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়ে। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের দেশ রচিত হয়েছে। সব ধর্মের বাণী হচ্ছে-মানুষের কল্যাণ।


কুসংস্কার লালন করে ঘরমুখী রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করে যারা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।


ইসলাম অন্তরের ধর্ম। সর্ব শক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ইসলামের হেফাজত কর্তা। অথচ আজ ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীরা ইসলামের নাম করে যে ভাষায় কথা বলছে, এর মধ্যে কোন শান্তির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়? এদের আচরণের মধ্যে কোন সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যায়?


বঙ্গবন্ধু কখনো কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। গোটা জাতিকে একত্রিত করে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই ‘৭১ এর ৭ই মার্চ তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। যে চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে তিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলেন তার অন্যতম ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কিন্তু ধর্মহীনতা নয়। যার যার ধর্ম সেই সেই পালন করবে। আমাদের নবী করীম (সা.) ও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তো এটা বলতে পারি না, আল্লাহপাক শুধু আমাদেরই সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনের আলোকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা এক এবং অদ্বিতীয়।


ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে একাত্তরে একটি গোষ্ঠী আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো। ইসলামে কোন ‌অনাচার অবিচারের জায়গা নেই। এরা রাজাকার আলবদর বাহিনী তৈরি করেছিলো ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে। নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিলো। ফতোয়া দিয়েছিলো নারীরা গণিমতের মাল। এদেরকে ভোগ করা জায়েজ। এই গোষ্ঠী কখনোই স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মানতে তাদের আপত্তি, কিন্তু কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে জাতির পিতা মানতে তাদের কোন অসুবিধা হয়নি।


আমার আলেম ভাইদেরকে বলছি, আপনাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে এই দূর্বৃত্তরা। আপনারা চোখকান খোলা রাখুন। আসল আর নকলের পার্থক্য বুঝতে পারবেন। শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে কোন নৈরাজ্য, অশান্তি কায়েম করার চেষ্টা করবেন না।


বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সেই ফয়সালা ’৭১-এ হয়ে গেছে। ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান রচিত হয়, সেই সংবিধানের যে চারটি মৌলিক স্তম্ভ ছিল, তার একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু যেখানেই যেতেন, তিনি এটির অর্থ যে ধর্মহীনতা নয়, তা বারবার উল্লেখ করতেন। তিনি বলতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যার যার ধর্ম সে পালন করবে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র পৃথক থাকবে। তিনি একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন চিরকাল। যে আওয়ামী লীগ শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম দিয়ে, অচিরেই সে নাম থেকে মুসলিম শব্দটি উঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি; যাতে তার চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।


কিন্তু এ লড়াই, এ বিপুল আত্মত্যাগ নিছকই একটা ভূখন্ড বা মানচিত্রের জন্য ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো পেতে চেয়েছিলাম, যা কতগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করবে। নাগরিকদের মাঝে সেগুলো নির্বিঘ্ন চর্চার পরিসর তৈরি করবে।


অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নেই। সবাই মানুষ।’ এই সত্যকে ধারণ করেই আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছে। পৃথিবীর বুকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বহু ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশা ও আদশের্র সম্ভাবনাময় এক বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে একই চেতনা ধারণ করে।


সে চেতনা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনা। যখন গোধূলি নামে তখন একই সঙ্গে আজানের ধ্বনি এবং শাঁখের ধ্বনি জানান দেয় যে, আমরা মহান বাঙালি জাতি, আমাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য নেই, নেই কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ। সেই জন্মলগ্ন থেকেই আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলাদেশ নামে পরিচিত বিশ্বের কাছে। আজান দিলে যখন মুসলিম পুরুষরা মসজিদের দিকে যায়, তখন হিন্দু নারীরা তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালেন। ঈদের সময় যেমন হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে আনন্দ করে, তেমনি পূজা-পার্বণে সব বাঙালি মেতে উঠে মহাসুখের আনন্দভেলায়। বাঙালির পয়লা বৈশাখে নারী-পুরুষ, বিভিন্ন ধর্ম গোত্র নির্বিশেষে সবাই মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এখানে থাকে না কোনো বৈষম্য, কোনো ভেদাভেদ। সবাই মেতে উঠে বাঙালিয়ানায়।


মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠী তার ইতিহাসে একটি অনন্য ও অভিনব বাস্তবতা তৈরি করে। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য একদিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে অভিষিক্ত করে, অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর ভিতরে দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে পাওয়া সেসব আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার এক কঠোর দায় আরোপ করে এবং অবারিত সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ তাই একাধারে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা। আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে আদর্শগুলো ধারণ করে আছে, তার শুরুর দিকেই আসে মুক্তি, বাঙালিত্ব, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবাধিকার। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। সৃষ্টিলগ্ন থেকে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের যে ঝান্ডা উড়িয়ে এসেছে এই দলটি, শত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়েও সেই ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে। দলটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির দেশে পরিণত করার চেষ্টাকে কেবল রুখেই দেয়নি, অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংবিধানকেও সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে।


এবার আসি গতকাল কুমিল্লায় ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আমার বক্তব্য পরিষ্কার। ইসলামে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের স্থান নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। যখন আস্থার সংকট দেখা দেয়; অনিশ্চয়তা, গুজব তখন আমাদের গ্রাস করে ফেলে। সাময়িক সমাধান নয় প্রয়োজন সমস্ত আস্ফালন আর ধৃষ্টতার কড়া জবাব। আস্থা ফেরাতে হবে এবং এক্ষেত্রে সবার দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। এ দেশের মাটি খুব নরম। এই ভূ-খন্ডের মানুষ চরম সংবেদনশীল। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কীভাবে পরিচালিত হবে সেটার ফয়সালা ’৭১ সালেই হয়ে আছে।


লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ


বিবার্তা/ইমরান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com