বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজধানী লন্ডন
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৯:৪৪
বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজধানী লন্ডন
তওহীদ ফিতরাত হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+

আগরতলা মামলার দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে লন্ডনের বাঙালী সমাজ অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে মিটিং মিছিলের মাধ্যমে বিশ্ব জনমত গঠনে রেখেছিলেন অগ্রণী ও ঐতিহাসিক সাহসী ভূমিকা। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে প্রথম যাত্রাবিরতি ও সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন ইংল্যান্ড থেকে। তখনো গ্রেট বৃটেন আমাদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতিদান করেনি তবুও তৎকালিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়াড হীথ ছুটে এসেছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ককে বরণ করে নিতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের ১৩ সদস্যকে বর্বরভাবে হত্যার পর প্রথম প্রতিবাদ হয় এই শহর থেকে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন আজ বাংলাদেশ বিরোধী সকল কর্মকান্ডেরও রাজধানী।


আর, বাস্তবতা হলো স্বাধীনতার পর হতেই শুরু হয়েছে বাংলাদেশ নামক ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে ৭১এর পরাজিত দেশী বিদেশি শত্রুর একের পর এক ষড়যন্ত্র। কিন্তু বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাসিনাকে সরাতে বর্তমানে যে সকল ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার মূল সুতিকাগার লন্ডন। আর এই সব কুচক্রিদের জন্য ষড়যন্ত্রের রাজধানী বলা যায় লন্ডনকে। এখান থেকেই পরিচালিত হয় স্বাধীনতা বিরোধীদের বাংলাদেশ বিরোধী সকল কার্যক্রম। তারেক সৈনিক, জিয়ার সৈনিক, বাঁশের কেল্লা নামক মিথ্যার জন্ম দেয়া পেইজগুলো এই শহরে বসেই বানায় একদল অর্থলিপ্সু পাকি পন্থীরা।


ইংল্যান্ডে বসবাস করে স্বাধীনতার প্রথম লগ্নে ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যার মূল নেতা খুনী চৌধুরী মঈনউদ্দিন। বাংলাদেশের আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, মঈনউদ্দিনের ফাঁসির রায় হয়েছে সেখানে। এই মঈনউদ্দিনের নেতৃত্বে দেশ থেকে আসা জামায়াত শিবিরের একটি বড় অংশ নানান ধরনের সরকার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলেছে প্রতিনিয়ত। যেমনটা করে গেছে তাদের পূর্বসূরিরা।


লন্ডনের বাংলা মিডিয়ার সিংহভাগ স্বাধীনতা বিরোধী ও বিএনপি পন্থীদের হাতে। কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যম দেখলে অবাক হতে হয়, সংবাদ পড়ছি নাকী জামায়াত বিএনপির কোন লিফলেট পড়ছি। কোন কোন সংবাদপত্র তো এই জাতীয় সংবাদ প্রকাশ করে, সাংবাদিকদের তোপের মুখেই সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।


এমন কি, সরকারের নানান রকমের প্রনোদনা পাওয়া ইমপ্রেস টেলিফিল্মের টেলিভিশন ইংল্যান্ডেও একসময় বিএনপি ও জামাতের সাথে সম্পর্কিত ছিল বলেই প্রচলিত আছে। বাংলাদেশের আদালতের দন্ডিত অপরাধী তারেক রহমানের জন্মদিন সেই চ্যানেলে লাইভ প্রচারিত হয়!


শোনা যায় তারেক রহমান ও চ্যানেল আই ইউরোপের এক কর্মকর্তা গোপন মিটিং করেছেন বছরখানেক আগে। এখনো চ্যানেল আইয়ের নাম বিক্রি করে পরিচয় দেয়া সেই সাংবাদিক, যখন ছাগলের তিন বাচ্চার মতোন বেফাঁস কথাবার্তা বলেন তখন আড়ালে লোকজন মুখ টিপে হাসেন। তিনি অভিযোগ করে বেড়ান, বাংলাদেশ সরকার লন্ডনে তার চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার লন্ডনে কোন টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করার কোন নিয়ম বা এখতিয়াত কোনটাই বাংলাদেশ সরকারের নেই। অবশ্য দুষ্ট লোকে বলে তার টিভি বড় বউয়ের অর্থের জোগান বাতিল হবার কারণে বন্ধ হয়েছে।


২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনে আক্রমণ করে জামায়াত বিএনপি। বঙ্গবন্ধু ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ছবি ভাঙচুর করে জামায়াত বিএনপি। বিদেশে নিজেদের হাইকমিশনের হামলা একধরনের মানসিক বৈকল্যের বহিঃপ্রকাশ। এইসব হামলা প্রমাণ করে লন্ডনে তারা কতোটা সংঘটিত।


জামায়াত নেতা গোলাম আজম ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বে লন্ডন আসে ও অনেকের সাথে গোপন মিটিং করে। জেনারেল জিয়ার সাথে তার যে আঁতাত হয় সেটিও এই লন্ডনে বসেই। তারপর গোলাম বাংলাদেশে ফিরে যায় পাক পাসপোর্ট দিয়ে। ২১শে আগষ্ট শেখ হাসিনা হত্যা প্রচেষ্টার প্রধান কুশীলব সাজাপ্রাপ্ত তারেক রহমান ইংল্যান্ডের রাজধানীতে বসে অনবরত দেশের ইতিহাস বিকৃত করার মতন বিষয়ের অবতারণা করে। কিছুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে, তারেক রহমান ও ব্রিটেনে বসবাসরত, কিছু পলাতক, কিছু বহিস্কৃত সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে লন্ডনে গোপন বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের বিষয় গোপনীয় থাকলে ও ধারণা করা যায়।


এই নেপথ্যের কুশীলবরা একের পর এক চেষ্টা করে চলেছে শেখ হাসিনার সরকারকে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নিঃশেষ করে দিতে। তারেকের নেতৃত্বের প্রতি তার নিজের দলের নেতাকর্মীদের ও আস্থা না থাকায় সকল ষড়যন্ত্রই মুখ থুবড়ে পড়ে বারবার।


কনক সরোওয়ার নামক পলাতক তথাকথিত সাংবাদিক একের পর এক ইউটিউভ বানিয়ে দেশের ভেতরে বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতর একটা সংঘাত সৃষ্টির পায়তারা করে যাচ্ছে। উস্কানীমূলক ও মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে দেশের সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা দেশদ্রোহিতা এবং সেই দেশদ্রোহী কাজটিই করছে। তার সাথে আরেক পলাতক "পাগলা শহীদ" নামক সাবেক এক সেনা কর্মকর্তা প্রলাপের মতন চিৎকার চেচামেচি করে যাচ্ছে প্রতিদিন। মূলত তাদের চেষ্টা হল সেনাবাহিনীকে উসকে দিয়ে দেশের সরকার পরিবর্তন করা।


ডঃ কামালের মেয়ে জামাই ডেভিড বার্গম্যান লন্ডন বসেই বাংলাদেশ বিরোধী প্রপাগান্ডার বিষয় গুলো তৈরী করে। বার্গম্যানের বদৌলতে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে এই সকল ভূয়া বিষয়গুলো প্রচার করা হচ্ছে। এই লন্ডন থেকেই আল জাজিরার “প্রধানমন্ত্রীর লোক” শীর্ষক তথাকথিত ডকু ড্রামার বাংলা ডাবিং করা হয়েছে। প্রগতিশীলদের মুখোশ পরা কিছু নাট্যকর্মী বাংলা ভার্শনটুকুতে বিপুল অর্থের বিনিময়ে কন্ঠ দেন। সার্বিক তত্বাবধায়ক হিসাবে নাম শোনা যায় ২০০৯ সালে লন্ডন আসা নাট্যকর্মী লীসা গাজীর। যিনি ডঃ কামালের মেয়ে ও ডেভিড বার্গম্যানের স্ত্রী সারাহ কামালের ঘনিষ্ট বন্ধু। তিনি শহীদুল আলমের মুক্তির দাবীতে লন্ডনে সোচ্চার ছিলেন। শেখ রেহানার কন্যা ব্রিটিশ এমপি টিউলিপের কেম্পেইনের সময় চ্যানেল ফোরের উপসথিত রিপোর্টের সাথেও তার সংযুক্তি থাকার সম্ভাবনা আমাকে অনেকেই বলেছিলেন। এই লীসা আরো বলে বেড়ান তিনি বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ রেহানা ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠজন।


ঘাতক, চৌধুরী মঈনউদ্দিন, তারেক রহমান, ডেভিড বার্গম্যান, কনক সরোয়ার, পাগলা শহীদসহ (সাবেক সেনা কর্মকর্তা) জামায়াতের (পদত্যাগকারী) নেতা ব্যারিষ্টার রাজ্জাক সকলেই একই সুতায় বাঁধা।


মনে রাখতে হবে রাজাকার শিরোমনি সাঈদী ও গোলাম আজমের পূত্র কন্যারা এই নগরীতে বসবাস করে। এরা সকলে লন্ডনে বসে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে আর স্বপ্ন দেখে আরেকটি ১৫ই আগষ্টের। এবং বারবার সেই হুমকি দেয়, আমাদের মনে করিয়ে দেয়। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ কিংবা প্রগতিশীল সংগঠনগুলো এইসব বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে। মুক্তিযুদ্ধের যে ঐতিহ্য, যুক্তরাজ্যকে মহিমান্বিত করেছিল, এখন ততোটাই কলংকিত করছে।


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যুক্তরাজ্যের প্রচার সেল ও তথ্য প্রযুক্তি সেল নীরব দর্শক। তাদের কার্যক্রম অনেক বেশী শক্তিশালী ভূমিকা রাখার দাবী রাখে যা করতে তারা ব্যর্থ। লন্ডনে জন্ম নেয়া ষড়যন্ত্রের পাল্টা জবাব এই লন্ডনে বসেই দিতে হবে। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উচিত রাজনৈতিক মোকাবেলায় আরো বেশী কার্যকর ভুমিকা রাখা। বাংলাদেশ হাইকমিশনেরও অনেক করনীয় আছে বলে মনে করি। দেশ বিরোধীদের রুখতে, সার্বিক পরিকল্পনা করে যুক্তরাজ্যের আইনের বিধান মেনে কিভাবে প্রতিহত করা যায় সেই বিষয়গুলো ভাবতে হবে।


লেখকঃ ব্রিটেন প্রবাসী, সিলেট এম সি কলেজের ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত সাবেক জিএস।


বিবার্তা/এনকে

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com