সেই আওয়ামী লীগ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২০, ১০:৫০
সেই আওয়ামী লীগ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সম্প্রতি দলের কল্যাণে কিছু কথাবার্তা বলছেন। এমনটা দলের অনেকেই আড়ালে বলেন কিন্তু প্রকাশ্যে বলার সাহস রাখেন না, কিংবা বলার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। বাহাউদ্দিন নাছিমের কথাগুলো আওয়ামী লীগের লাখ লাখ কর্মীর প্রাণের কথা, এমনটা দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায়। আমাদের সময়ে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতেই উঠে আসেননি, আওয়ামী লীগের মহাদুঃসময়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার পরিশ্রমী কর্মী হয়ে কাজ করেছেন। জেলায় জেলায় পোস্টার পাঠানো থেকে যোগাযোগ অনেক কাজ করেছেন। সারা দেশের নেতাদের চিনতেন। শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস ছিলেন। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে জেল রিমান্ড নির্যাতন ভোগ করেছেন। ওয়ান-ইলেভেনেও নিপীড়নের শিকার হন। ক্ষমতা ও বিরোধী দলের শিক্ষা অভিজ্ঞতা নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছেন।


আওয়ামী লীগ উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বমহিমায় ইতিহাসে আলোকিত হয়ে আছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী বামদের নিয়ে ন্যাপ গঠন করে চলে গেছেন। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক জেল নির্যাতনকালে প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ট্র্যাজিক জীবনের সমাপ্তি টেনেছেন। সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যু, পাকিস্তানি সেনাশাসক আর পশ্চিমা দালাল এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই অটল থেকে হাল ধরেছিলেন। তুমুল বৈরী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে নিজের ক্যারিশমায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়েছিলেন। সেখানেও লক্ষ্য অর্জনের পথেই মানিক মিয়াকেও হারিয়েছিলেন। অনেকে ছিটকে গিয়েছিলেন। তবু দলের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটিয়ে অসংখ্য অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, সংগঠক, নিবেদিতপ্রাণ সাহসী কর্মী দলের সকল পর্যায়ে তৈরি করে গোটা জাতিকে এক মোহনায় এনে দেশটা স্বাধীন করে জাতির পিতা হয়েছিলেন।


একজন দুর্ধর্ষ সাহসী বিশ্ববরেণ্য নেতা হয়েছিলেন সাধকের মতো নির্লোভ চরিত্রের আত্মত্যাগে। কতটা সংগ্রাম নির্যাতন, কারাগার থেকে কারাগারে জীবন কেটেছে তাঁর। মাথাটা নত হয়নি। তেমনি কত সাহসী আদর্শিক বীর তৈরি হয়েছিলেন তাঁর পথ ধরে! সেসব একালের রাজনীতির ধূসরচিত্রে বড় বেশি মিথের মতো শোনায়। সব শ্রেণির, সব ধর্মের মানুষের দল আওয়ামী লীগ গরিবের দল ছিল। নেতৃত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠরাই ছিলেন গরিব পরিবারের শিক্ষক উকিল মোক্তার। তাদের সততা ত্যাগ আত্মমর্যাদাবোধ ছিল বিতর্কের ঊর্ধ্বে। মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা ছিলেন অনুদানদাতা। সামন্ত শ্রেণি থেকে আসাদের সংখ্যা ছিল কম। আজ সবাই যেন আসমান থেকে পড়া নবাবজাদা একেকজন। বিশেষ করে যেসব এমপি, নেতা এলাকায় নিজস্ব বাহিনীতে অর্থনৈতিক বাণিজ্যের জমিদারি চালু করেছেন। দলকে ব্যবহার করে নিজেদের ভাগ্য গড়া এসব ব্যক্তি আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও নষ্ট করছেন। কর্মীদের বিরোধে ও অনৈতিক পথে ঠেলেছেন। আদর্শিকদের ঘরে তুলেছেন। দলের সর্বনাশটা রাজদুর্নীতির পাপে এরাই করছেন। কেন্দ্রের উদাসীনতা ও প্রশ্রয়ে এমনটাই হয়েছে। বঙ্গবন্ধু অনুদানের টাকা দল ও কর্মীদের পেছনে খরচ করতেন। তিনি জেলে থাকলে বেগম মুজিব দিতেন। সন্তান-পরিবার কষ্ট করেছে। বিলাসিতা শেখেনি। তাঁর রাজনীতির কর্মী-নেতারাও তাই ছিলেন। সব দলের নেতারাই এমন ছিলেন। আগে নেতারা দল করে ভিটেমাটি বিক্রি করতেন। এখন পদবি পেলে বিত্তবৈভবের মালিক হন অঢেল। কীভাবে? এমপি হলে সাত পুরুষের বসে খাবার জোগাড়। তাই বলে সবাই নয়। এখনো অনেকে মানুষকে বিপদে দান করেন, আবার অনেকে মানুষেরটা লুট করেন। এখনো আওয়ামী লীগে সৎ-আদর্শবানরা অনেক। এখনো দেশে অনেক সৎ মন্ত্রী-এমপি আছেন। কিন্তু দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সব মলিন করে দিচ্ছে আদর্শিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে। একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের জন্য অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শাসনের জন্য আদর্শিক নেতা-কর্মীর শক্তিশালী গণমুখী জনপ্রিয় আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই।


আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধেই নেতৃত্ব দেয়নি, গণতন্ত্রসহ সব সংগ্রামে সর্বোচ্চ রক্ত ও জীবন দেওয়া নেতা-কর্মীর দল। জনগণের মধ্যে জন্ম নিয়ে জনগণকে নিয়ে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতিতে জয়ী এক জাতীয়তাবাদী দল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার -পরিজনসহ নৃশংস হত্যার পর তাঁর আদর্শিক উত্তরসূরি নেতা-সংগঠকরা দলটিকে কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড় করিয়েছিলেন কত ষড়যন্ত্রের মধ্যে। ’৮১ সালে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলের দ্বিতীয় দফা চূড়ান্ত বিকাশ ঘটান। দলকে ক্ষমতায় আনেন। কিন্তু গত ১১ বছরের শাসনকালের আওয়ামী লীগের দিকে তাকিয়ে দলের কাছে প্রশ্ন রাখাই যায়, সেই আওয়ামী লীগ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? বঙ্গবন্ধুর এত ছবি দিকে দিকে আজ, এত মুজিববর্ষের আয়োজনে তাঁর নাম নেওয়া হয়! এত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বিক্রি হয়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কোথায়? জীবনে রাজনীতিতে দর্শনে চেতনায় কী লালিত হয়? লালিত হলে এত দুর্নীতি এত লোভ এত অনাচার দম্ভে বিষাক্ত সমাজ হয় কী করে? আওয়ামী লীগ কেন তার দুঃসময়ে নেতৃত্ব দেওয়া প্রয়াত নেতাদের মৃত্যুর দিনেও স্মরণ করে না? আদর্শিক দল আওয়ামী লীগে এত চোর সুবিধাবাদী এমন দাপুটে হয় কেমন করে?


লোভ ও দুর্নীতির বিষে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি থেকে জেলা নেতৃত্বেও অনেকে আজ বিষাক্ত। এমপিদের মধ্যে কারা বিতর্কিত এলাকার বারো ভূঁইয়া তা-ও জানে মানুষ। অঙ্গসংগঠনের নেতা-নেত্রীদের একটা অংশের খবরও সবার জানা। সুবিধাবাদী নব্য আওয়ামী লীগারদের নাম দিয়েছি আমি ১১ বছরের আওয়ামী বালক। এরা সবখানেই ক্ষমতার কালটা কাটায়। অনেকেই প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের হাত ধরেই দলে এসে তাদের রাজদুর্নীতির যুগে প্রবেশ করান। আর ১১ বছরী বালক আওয়ামী লীগাররা দুর্নীতির টাকায় ফুলেফেঁপে বড় হতে হতে শেষ। সেই মুনতাসির ফ্যান্টাসি নাটকের আফজাল হোসেনের দারুণ অভিনয়টাই চোখে ভাসে। যা পায় সব গিলে খায়! আওয়ামী লীগের একটা অংশ এদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে দুর্নীতি লুটপাট। অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিয়েছেন রাক্ষুসে ক্ষিধে মেটানোর সুযোগ। অনেক পাবলিক সার্ভেন্ট ক্ষমতা ও অর্থের গরমে এলাকার রাজনীতিতেও হাত দেন। এরা মিলেমিশে আওয়ামী লীগকে লেজেগোবরে অবস্থায় নিয়েছেন।


এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোটা শিক্ষাঙ্গন, এমন কোনো পেশা নেই যেখানে দুর্নীতি ও লোভের আগ্রাসন নেই। এরা ১৭ কোটি মানুষের দেশে সংখ্যালঘু কিন্তু ক্ষমতার পাদপ্রদীপে থাকার সুবাদে সমাজের সবখানে দাপুটে। গোটা সমাজকেই লোভের বিষে বিষাক্ত করে রুচির দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এ বিষের ছোবলের কথা বললে আওয়ামী লীগের খেয়ে-পরে চলা অপরাধী চক্র রাগে আক্রোশে ফোঁস করে ওঠে। বিএনপিপন্থিরা বড় খুশি হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জমানা কত দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভয়ঙ্কর শাসনকাল ছিল তা ভুলে যায়। এ বিষ এক দিনে গোটা রাজনীতি প্রশাসন সমাজ- এক কথায় দেশকে বিষাক্ত করেনি, ক্ষমতার পালাবদলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকেই দিনে দিনে বেড়েছে এর দেনা। তবু ২০০১ সাল থেকে দীর্ঘ ১৯ বছরে এটা দ্রুত অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত অপশাসন বলেই আওয়ামী লীগকে জনগণ ক্ষমতা দিয়েছিল। তাহলে আওয়ামী লীগ আমলটা এমন হবে কেন? আওয়ামী লীগের তো বিকল্প নেই। অপরাধীদের শায়েস্তার বিকল্পও নেই।


এর মধ্যে রাজনীতি রাজনীতিবিদশূন্য হয়েছে। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার, সবখানে দলীয়করণ, দলকানাদের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাহীনতার পরিণতিও আজ সুখকর নয়। আর বর্তমান ১১ বছরের শাসনামল দেখলে মনে হয় আওয়ামী লীগ তার পোড় খাওয়া কোনো অতীত থেকেই শিক্ষা নেয়নি। কিন্তু দলের সারা দেশের সর্বোচ্চ ১ হাজার নেতা-কর্মীর সঙ্গে নব্য নানা পেশা ও দলে আসা সুবিধাভোগীদের মোটা দাগের অংশের আওয়ামী লীগারদের লুটপাট ক্ষমতা ও অবৈধ অর্থের দম্ভ, অপকর্মের খেসারত লাখ লাখ নেতা-কর্মীকেই চড়া গুণে দিতে হয়। এ সুবিধাভোগী ১১ বছরের বালকরা কাল সরকারে আওয়ামী লীগ না থাকলে আপন চেহারায় নিজের পথ দেখবে। অনেকে পালিয়ে যাবে। আর হাজার হাজার নেতা-কর্মী কঠোর নির্যাতন নিপীড়ন ও প্রতিহিংসার শিকার হবে। কত প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে তা কি একবারও মনে করে না? ক্ষমতা কি অন্ধ করে দিয়েছে?


’৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার -পরিজনসহ নৃশংস হত্যাকান্ডের পর খুনিদের অবৈধ সশস্ত্র রামরাজত্বকালে জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে খুনের পর সারা দেশের নেতা-কর্মীদের নির্যাতন, কারাদহন ভোগ, প্রতিরোধযুদ্ধ, ঘুরে দাঁড়ানোর সেই কঠিন দুঃসময় ভুলে গেল কী করে? শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলকে ক্ষমতায় ফিরে আসতে ২১ বছরের অন্ধকার রজনি পাড়ি দিতে হয়েছিল। তা-ও সে সময় দলের যে নেতৃত্ব ওয়ার্কিং কমিটি, প্রেসিডিয়াম, জেলা এবং দেশজুড়ে ছিল, যে নিবেদিতপ্রাণ আদর্শিক দক্ষ সংগঠক, সাহসী নেতা-কর্মী, তা কি আছে আজকের আওয়ামী লীগে? সে সময়ের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আছে? সে সময়ের অভিজ্ঞ গণমুখী জাতীয় নেতাদের মতো জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও সমাজে প্রভাবশালী নেতারা কি আজ দলে আছেন? সে সময়ে একেক জেলা বা মহানগরীতে যে নেতৃত্ব ছিল তারাই তো আজ কেন্দ্রে নেই। নেতৃত্ব তৈরি বা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের অনেক ভুল ব্যর্থতা কি নেই?


আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে কতটা বিপর্যয়ে ছিল? কত নেতা-কর্মী মামলা কারা নির্যাতন গ্রেনেড বোমা হামলার শিকার হয়েছে? সেদিন কত নেতা-কর্মী এলাকাছাড়া হয়েছিল? কত নেতা-কর্মীর রক্ত ঝরেছিল দেশে? দলের প্রাণ ও শক্তি শেখ হাসিনাসহ একুশের গ্রেনেডের কারবালা থেকে কীভাবে ফিরে এসেছিল আওয়ামী লীগ? সব ভুলে গেল কী করে? ওয়ান-ইলেভেনের দুই বছরের কারাজীবন, নির্বাসন, মামলা রিমান্ড সব ভুলে গেল! সেই দুঃসময়ে কারা ছিলেন শেখ হাসিনার পাশে, রাজপথে তারা আজ কোথায়? ’৭৫ থেকে ওয়ান-ইলেভেন সব দুঃসময়ের নেতা-কর্মীদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দলকে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী করা হলো না! অথচ হাইব্রিডদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হলো এভাবে? আওয়ামী লীগের মতো দল কি মনে করে কখনো ক্ষমতা হারাতে হবে না? ’৭৫-এর পর দলে ও নানা পেশায় কতজন কমিটেড লোক ছিল? বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে হরতাল করতে কতটা কঠিন ছিল? কারা ছিল মিছিলের মুখ? কারা পুলিশি নির্যাতনের নির্মমতার শিকার হলো? তাহলে ক্ষমতায় দলের দায়িত্বে কি তারা আছেন? স্বাধীনতার পর এত রাজনৈতিক বিদ্রোহ তবু আওয়ামী লীগ একক দল ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তো অনেক আওয়ামী লীগার দলে নিষ্ক্রিয় হন। কেন? ’৭৯-এর নির্বাচনে অনেক আসনে দল প্রার্থী খুঁজে পায়নি! এত বড় দলের বাকিরা কোথায় গেলেন তখন? আজও সারা দেশ আওয়ামী লীগ কিন্তু ক্ষমতা হারালে কি সবাই থাকবেন? সব পেশার দাপুটে আওয়ামী লীগাররা? অথচ আজ উপনির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনেই ৫৬ জন মনোনয়ন চান! এটা কি দলের দেউলিয়াত্ব নয়? এদের কজন ওই আসনের কর্মীদের প্রাণ? ভোটারদের ওপর প্রভাব রাখেন? দলে কর্মী নেই যেন নেতার উৎসব নাকি নেতৃত্বের সংকট।


পাবনার উপনির্বাচনে সাবেক মন্ত্রী ডিলুর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, জামাতাসহ পরিবারেরই ছয়জন মনোনয়ন চান! কতটা বেহুঁশ হলে এমন হয়? ’৭৫-পরবর্তী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্দিনের ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বুদুরা কেন মনোনয়ন পাবেন না? যার খুশি এমপি হতে চায়! মুজিবকন্যার পর যেখানে সিনিয়র নেতারাই একাধিক আসনে মনোনয়ন চাননি, সেখানে সুনামগঞ্জেই রাজনীতির ১১ বছরের এক অনভিজ্ঞ যাকে ওপর থেকে জেলা নেতৃত্বে বসানো হয়েছিল সে-ও বিগত দিনের নির্বাচনে তিন আসনে মনোনয়ন চেয়েছিল! ১১ বছরে অঢেল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে এখন দুদকের তলবে। তাও শুনেছি ওপর থেকে প্রবল তদবির ছেড়ে দিতে। এদের নাম নিতেও লজ্জা হয়! দল কি কোনো খবর রাখে না?


বাহাউদ্দিন নাছিম সর্বশেষ দৈনিক যুগান্তরে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগাররাই আওয়ামী লীগ করবে। দুর্দিনের সাহসী, সৎ নেতা-কর্মীরাই সবখানে কাজ করবে। এখানে “ভাই লীগ”-“এমপি লীগ”-এর কোনো সুযোগ নেই। ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। সেখানে কিন্তু এদের প্রয়োজন হয়নি। যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে, তারা কিন্তু অপকর্ম করবে। দলের নাম ভাঙিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করবে। আবার সময়ে উড়ে যাবে। উড়ে আসা পাখি উড়ে যায়। তাকে ধরে রাখা যায় না। এদের বলে “সাইবেরিয়ান বার্ড”। এদের হাত থেকে রাজনীতিকে রক্ষা করতে হবে।’


বাহাউদ্দিন নাছিম যথার্থ বলেছেন, শেখ হাসিনার ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসতে তো হাইব্রিডদের প্রয়োজন পড়েনি? তাহলে? বিএনপি জমানায় কি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে বিরোধী দলে থেকে মোহাম্মদ হানিফ, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে মেয়র নির্বাচিত করেনি? নেতারা ছিলেন আদর্শিক কর্মী সংগঠক, সবাই ছিলেন আবেগ অনুভূতিতে এক পরিবার। সবাই লড়েছেন। এখন ক্ষমতাকালে কেন তবে মেয়র ও এমপি করা হয় শীতের অতিথি পাখিদের?


নাটোরের আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট সাজিদুর রহমান খান ২০১০ সালে ক্ষমতার বসন্তের পাখি বা শীতের অতিথি পাখিদের ‘হাইব্রিড’ তকমা দিয়ে সতর্ক করলেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কাউয়া বললেন, কিন্তু ১০ বছরে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ হয়নি কেন? ’৭৫-এর পর ছাত্রলীগ সভাপতি হন ওবায়দুল কাদের। সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুন্নু, আরও কত নেতা তখন। কাদের এখন সাধারণ সম্পাদক প্রভাবশালী মন্ত্রী। দীর্ঘদিন ছাত্রলীগ দেখাশোনা করেছেন। সারা দেশে দুঃসময়ের ছাত্রলীগ নেতারা কি দলের কাঠামোতে ঠাঁই পেয়েছেন? তিনি কতটা করেছেন? বাকিরা কতটা করলেন? কতটা হিসাব আছে দলের তৃণমূলের?


আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগ একটি মাল্টিক্লাস অর্গানাইজেশন। এখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আছে। ফলে অনেকে ঢুকে পড়ে। তবে স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বা অন্যায় অপকর্মের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের দলে জায়গা না দেওয়ার বিষয়ে আমাদের পার্টির সিদ্ধান্তই রয়েছে। এখানে প্রশ্ন আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের যে ৮০০ নেতা-কর্মী যোগদান করেছিল তাদের কি বের করা হয়েছিল? সারা দেশের জেলা কমিটির তদন্ত হবে কি? থানা কমিটির?


তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দলের সব নেতাও যে ধোয়া তুলসীপাতা, তা বলতে পারব না। ফলে যারা দলে ঢুকেছে, তারা কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে কাউকে না কাউকে খুশি করেই ঢুকেছে। আবার যারা নিয়েছে তারা নিয়েছে দল ভারী করার জন্য। যারা রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শে সমৃদ্ধ নয়, তারাই এভাবে দলে ঠাঁই দিয়েছে। এতে তারা নিজেদেরও কলুষিত করেছে আবার দলেরও ক্ষতি করেছে। তবে এটাও ঠিক, কেউ বুঝে করেছে, কেউ না বুঝে করেছে।’ তাহলে কি দল শুদ্ধি অভিযান করবে? নেতৃত্বের কাছে এ প্রশ্ন থেকে যায়।


তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগে পরিশুদ্ধতার সেই কাজটি আমরা করব। সাহেদ, সাবরিনা, পাপিয়া, জি কে শামীম বা ক্যাসিনোর অধিপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যারা যুক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তাহলে প্রশ্ন- ক্যাসিনো বাজিকর লোকমান কীভাবে মুক্ত আজ? ব্যাংক লুটেরা, অর্থ পাচারকারীরা কেন এত দাপুটে? কে দেবে এসব প্রশ্নের জবাব?


১১ বছরে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে যেসব নেতা অঢেল অর্থবিত্ত গড়েছেন, যেসব এমপি বিতর্কিত হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দলের প্রেসিডিয়াম বা ওয়ার্কিং কমিটিতে কখনো আলোচনা হয়নি কেন? দলীয় তদন্ত হয়নি কেন? ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া কারা কীভাবে এত সম্পদের মালিক জেলা সফরে গিয়েও নেতারা দেখলেন না! সম্মেলনে অনেক জেলায় বিতর্কিতরা নেতৃত্বে এলো কী করে? গত নির্বাচনে যেখানে বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার কথা সেখানে উল্টো পোড় খাওয়া কজন বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের বহাল রাখা হলো। উপনির্বাচনেও সেটি দেখা দিল। ক্ষমতার সুযোগেও কেন আদর্শিক পরীক্ষিতদের বসানো গেল না? ’৯৬ শাসনামলেও নানা চুক্তি থেকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রেসিডিয়াম, ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বিতর্ক হতো। সেখানে স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ দুর্নীতি, ব্যর্থতা, ব্যাংক লুট, শেয়ার লুট, অর্থ পাচারসহ নানা ইস্যুতে কখনো আলোচনা বিতর্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ দেখা গেল না। ক্ষমতা হারালে দলকেই তো মানুষের কাছে যেতে হবে। এমপি-মন্ত্রীদের চেয়ে আমলাদের দাপট কেন এত বেশি? এ দেশে সব আদর্শিক দল প্রায় বিলুপ্ত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির মানুষের একমাত্র জায়গা তো আওয়ামী লীগই। আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হলে বিপর্যয় এলে জাতিরই তো বিপর্যয়। তাই এত উদ্বেগ, এত কথা। বিএনপি প্রশাসন ও সুবিধাবাদীদের নির্ভর আদর্শহীন ক্ষমতার রাজনীতির দম্ভের করুণ পরিণতি ভোগ করছে। কিন্তু তাই বলে কি বিএনপি-জামায়াত জোটের শক্তি, সাম্প্রদায়িক শক্তি শেষ? শেষ নয়। কেউ কৌশলে, কেউ পীড়নে কেউ গর্তে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে গেলে কি আজকের মতো দেশজুড়ে সবাই থাকবে? থাকবে না। অতীত তাই বলে। আওয়ামী লীগকে আদর্শিক নেতা-কর্মীদের শক্তিতেই দাঁড়াতে হবে। সংশোধন অনিবার্য। জনগণের ওপরই নির্ভর হতে হবে। জনগণকে নিয়েই লড়তে হবে। যে প্রয়োজনে ১৪ দল থেকে মহাজোট গড়েছিল দুঃসময়ে সেই প্রয়োজনও তখন দেখা দেবে। তাহলে এ শক্তিকে সুসংগঠিত করার সঙ্গে দল ও সরকারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেই কেন? মাঠে বিতর্কিত নেতৃত্ব রেখে কি দলকে জনপ্রিয় করা যায়?


লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।


বিবার্তা/এনকে

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com