ভাগ্যবিধাতা সংসদ বোবা নয় কথা বলো জবাব দাও
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২০, ০৮:১৬
ভাগ্যবিধাতা সংসদ বোবা নয় কথা বলো জবাব দাও
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

শরীরের ক্ষয় দেখা যায়, মনের ক্ষয় দেখা যায় না! মনের ক্ষয় শেষ করে দেয় জীবন। আয়ু যায় কমে। বিষণ্নতা অবসাদ নিঃসঙ্গতা এমন করে কখনো জীবন দুর্বিষহ করে তোলেনি। দেশজুড়ে সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকে আক্রান্ত। এমন মানসিক যন্ত্রণার জীবনের চেয়ে একবেলা খেয়ে পরা নির্ভয়ের আতঙ্কমুক্ত স্বাধীন প্রাণবন্ত জীবন কত আনন্দের, সুখের। করোনায় এমন ভয় তাড়া করা আতঙ্কগ্রস্ত অনিশ্চিত জীবন কখনো আসেনি জীবনে। এমন অসহায় বিপন্ন পৃথিবীর মুখ দেখেনি মানুষ। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের কত বিত্তবান, প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী, সমাজ আলোকিত করা কত মেধাবী সন্তান, অগণিত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কতজন মারা যাচ্ছেন। এমন কোনো পেশার মানুষ নেই যারা মরছেন না, আক্রান্ত হচ্ছেন না। করোনা যেন রোগীর প্রতি বড় অবহেলার অসুখ, বড়বেশি মর্মান্তিক মৃত্যু ছোঁয়াচে করোনার! করোনা মানুষকে মানুষ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মানবতার সেবক চিকিৎসক-নার্সদের দূরে সরিয়ে রাখছে তাদের আশ্রয়ে থাকা রোগী থেকে। আবেগ অনুভূতিহীন করে দিচ্ছে মানুষকে। স্বার্থপর করে তুলছে। পরিবার নেয় না করোনায় মৃত স্বজনের লাশ। সন্তান জঙ্গলে ফেলে দেয় মাকে করোনা সন্দেহে! বাবাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেয় না সন্তান-স্ত্রী! কী করুণ অবস্থা! অন্তিমযাত্রায় কেউ পাশে নেই। এমন এক অসহনীয় দমবদ্ধ জীবনে এবারের মতো নিরানন্দের প্রাণহীন ঈদ আসেনি কখনো! ভয় আতঙ্ক গৃহবন্দিত্ব সঙ্গনিরোধ মানুষের মনোজগতে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সেই অস্থিরতা, অনেকের বেমানান কর্মকান্ড দেখা যায়। শিশুদের মন তো আরও অশান্ত। এই বিয়োগান্তক পরিণতির শেষ কোথায় কেউ জানে না। কবে মুক্তি তাও না। যেন মৃত্যুর অপেক্ষা।


করোনার অভিশাপ মাথায় নিয়েই জীবিকার লড়াইয়ে অর্থনীতি বাঁচাতে শর্ত সাপেক্ষে দেশে লকডাউনের অবসান হয়েছে। পৃথিবীজুড়ে জীবিকার জন্য জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে হচ্ছে অনেক দেশকে। করোনার ধ্বংসলীলায় সর্বোচ্চ আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রেও লকডাউন উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর ভয়াবহতা কাটিয়ে না ওঠা নিউইয়র্কেও ৮ জুন খুলছে সব। অনেক দেশ লকডাউনের সময় বাড়িয়েছে। অনেক দেশ কারফিউর সময় বাড়িয়েছে। আমাদের দেশে করোনায় মানুষের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার যখন বাড়ছে তখন লকডাউন তুলে নিয়েছে। এ নিয়ে অনেকে বিতর্কের ঝড়ও তুলছেন। বহুবার বলেছি লকডাউন অনন্তকাল চলতেও পারে না। কর্মহীন হয়ে মানুষও বাঁচবে না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া দেশও চলবে না। ক্ষুধা দারিদ্র্য দুর্ভিক্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে। পৃথিবীজুড়ে নিয়ত চরিত্র বদলানো করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনার ভ্যাকসিন, ওষুধ বের করার লড়াই চলছে। ঘাম ঝরছে গবেষণাগারে। অনেকে দাবি করছেন আশার আলো দেখার। সুসংবাদ কেউ দিতে পারছেন না। করোনার সঙ্গে মানিয়েই জীবনযাপনের কথা বলা হচ্ছে। অসহায় আজ পৃথিবীর শক্তি। বিজ্ঞানের অহংকার লুটিয়ে পড়েছে করোনার ত্রাসে। আমাদের লকডাউন অবসানে বিমান ভাড়া বাড়েনি। বেড়েছে গণপরিবহনের ভাড়া। হায়রে গরিব, মরণ তার সব পথে! ক্ষমতা সব ক্ষেত্রেই চোখ পাল্টায় মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যুগে যুগে।


জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন ১০ জুন শুরু হচ্ছে। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার স্ত্রী করোনায় ইন্তেকাল করেছেন। আগের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অধিবেশন এক ঘণ্টা চলে ছিল। এবারও দর্শনার্থী নিষিদ্ধ। সাংবাদিক প্রবেশাধিকারের সুযোগ নেই। একেক কার্যদিবসে ৬০ জন করে হাজির করা হবে কোরাম রক্ষায়। সামাজিক দূরত্ব থাকবে আসনবণ্টনে। সতর্কতা অবশ্যই উত্তম। এবার বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে ১৮ হাজার কোটি টাকা ছিল। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক প্রশাসনিক সামাজিক ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য খাতে এক দশকের লুটপাট নির্লজ্জ অভিশাপে পরিণত। করোনার চিকিৎসার চিত্র করুণ। এর অভিশাপে স্বাস্থ্যসেবা থেকে ছিটকে পড়েছে জনগণ।


সংসদ সার্বভৌম। সংবিধান আইন প্রণয়ন থেকে সংশোধন, সরকার গঠন থেকে জনগণের ভাগ্য নির্ধারণের জায়গা। সংবিধান আমাদের ক্ষমতার মালিক করেছে। সংসদ সদস্যরাই জনগণের প্রতিনিধি। সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সংসদ হচ্ছে সব আলোচনা বিতর্ক জবাবদিহিতার আঁতুড়ঘর। সংসদীয় গণতন্ত্র বাইসাইকেলের মতো, দুই চাকার ওপর ভর করে চলে। প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্র ও নির্বাচনে জন্ম নেওয়া এই সংসদে সরকারি দলের চাকা অনেক শক্তিশালী। বিরোধী দল নামের চাকাটা বড় দুর্বল রুগ্ন পুষ্টিহীন মরচে পড়া। সরকারি দল নামের চাকার কাছে বড় অনুগত। সংসদ ও সংসদীয় গণতন্ত্র তাই বড় আকর্ষণহীন নিষ্প্রভ। যেন এক চাকায় চলছে সংসদ। আমলাতন্ত্রের দাপট তাই প্রবল। দুর্নীতিবাজ অব্যবস্থাপনা বড় বেশি প্রকট। এটা সব দলেরই জনগণকে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা না করার পরিণতি। সেই সামরিক শাসন অবসানকালে তিনজোটের রূপরেখাসহ গণতান্ত্রিক শক্তির অঙ্গীকার ভঙ্গের কুফল ভোগ করছে জাতি। তবু সংবিধানে দেওয়া জনগণকে তার মালিকানা নিয়ে সংসদের দিকেই তাকাতে হয়।


সংসদের মাননীয় স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধী দলের নেতা ও সদস্যগণ জানেন, জনগণের কত টাকায় এক দিনের সংসদ অধিবেশন চলে। সংসদ জনগণের ভাগ্যবিধাতা। সংসদ সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জায়গা। জাতীয় ইস্যুতে আলোচনা বিতর্ক ও সিদ্ধান্তের জায়গা। হে সংসদ এই করোনার মহাদুর্যোগকালেও বোবা হয়ে থেকো না, কথা বলো। সংসদ সদস্যদের জনগণের কাছে ওয়াদা দায়বদ্ধতা আছে। কেবল কারও কারও ক্ষমতাগর্বিত আনন্দ ভোগ-বিলাসের জন্য নয়। জনগণ ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি দিয়েছে। অফিস দিয়েছে। বাসস্থান দিয়েছে। সম্মানী দিয়েছে। ব্যক্তিগত সহকারী দিয়েছে। ফ্ল্যাটের আসবাব বিদ্যুৎ পানি সব সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এসব ছাড়াও দিয়েছে সম্মানী। তবু কেউ কেউ এলাকায় অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়েছেন। নির্লোভ আদর্শের পথ ছেড়ে অর্থবিত্ত ভোগ-বিলাসের পথে অন্ধ। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আদর্শিক নির্লোভ রাজনীতির পথপ্রদর্শকদের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর থেকে এর যাত্রা শুরু সামরিকতন্ত্রের যুগে। গণতন্ত্রের যুগে রাজদুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। হে সংসদ ও সংসদ সদস্যগণ জনগণ এখন করোনার ধ্বংসলীলায় গভীর অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি। এটা রাজনীতির বিষয় নয়, জীবন-মরণের লড়াই। মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। এটা জাতির সম্মিলিত লড়াই। করোনা কে সরকারি দল, কে বিরোধী দল, কে ধনী, কে গরিব, কে শিক্ষিত কে অশিক্ষিত, কে মুসলমান কে হিন্দু দেখছে না। কখন কার মৃত্যু কেউ জানি না। প্রতিটা মৃত্যু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা কোথায়? চট্টগ্রামকে বলা হয় বাণিজ্যিক রাজধানী। কত ক্ষমতাবান বিত্তবানের ঝলমলে পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা প্রাচ্যের রানীর রূপের আড়ালে চিকিৎসা ব্যবস্থার কী কুৎসিত রূপ তা দৃশ্যমান হয়েছে গত এক দশকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও বড় আইকন হয়ে ওঠা এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলমের করুণ মৃত্যুতে! তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট শিল্পপতি সাইফুল আলম মাসুদের বড় ভাই। আইসিইউর কী সংকট! আক্রান্ত আরেক ভাইয়েরটা খুলে তাকে দিয়ে বাঁচানো যায়নি। তিনি মারা গেলে আক্রান্ত ভাইকে দেওয়া হয়। পরিবারটির প্রায় সবাই আক্রান্ত। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। কিন্তু সরকারি বরাদ্দের যেমন লুটপাট হয়েছে তেমনি বিত্তবানরা দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ করলেও চিকিৎসাসেবায় যে নজর দেননি সেটাও উন্মোচিত হলো। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও পরিবারসহ আক্রান্ত হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের জন্য কী করেছিলেন যে ভরসা পাননি! একদশকে ব্যবসা জগতে আরও বড় হওয়া এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার পরিবারসহ করোনায় আক্রান্ত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপুটে শিক্ষক-ছাত্রই নয়, শিক্ষক গড়ার কারিগর অধ্যাপক আবদুল কাদির ভূইয়া আমার বিভাগের শিক্ষক নন। তবু সবার শিক্ষক ছিলেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন। অবসরে গিয়ে নিয়মিত ফোন করতেন। করোনায় মারা গেলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর স্ত্রী নীলুফার মঞ্জুসহ আক্রান্ত হলেন। নীলুফার মঞ্জু মারা গেছেন। তিনি ৭০ সালের নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ড. মফিজ আলী চৌধুরীর কন্যাই নন, দেশসেরা ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। অনন্য সাধারণ বিদুষী নারী। দেশে কত মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতির!


ঢাকার হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘলাইন পরীক্ষার। ব্যাপক হারে পরীক্ষা হচ্ছে না। জেলায় জেলায় বিশাল হাসপাতাল, পড়ে থাকা কত মেশিন! চিকিৎসক-নার্স সংকট। আইসিইউ নেই! ল্যাব নেই। হে সংসদ সদস্যগণ জবাব চান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদফতর থেকে সিভিল সার্জন পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতের কর্তারা বরাদ্দের টাকা কী করেছেন? সংসদীয় তদন্ত কমিটি হোক। প্রতিটি এমপির কাছেই তো চিত্র আছে স্বাস্থ্যসেবার। সংসদে প্রাণখুলে বলুন। বছরের শুরুর সংসদ অধিবেশনেই ডা. রুস্তম আলী ফরাজী করোনা নিয়ে সাধারণ আলোচনার নোটিস দিয়েছিলেন। সে দিন সংসদ আলোচনার দুয়ার খুললে প্রস্তুতি এত দুর্বল বিলম্বিত হতো না। ক্ষমতাবান বিত্তবান সবাইকে তো এখন দেশেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তাহলে এ বেহাল দশা কেন? স্বাস্থ্যকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে কেন? দুই-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাতকে হিসাবের বাইরে রেখে দিয়ে অব্যবস্থাপনায় পূর্ণ অদক্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করা হলো কেন? যথাসময়ে করোনা হাসপাতালগুলোকে অক্সিজেন, ভেন্টিলেটরসহ পর্যাপ্ত আইসিইউ বেডে সুসজ্জিত করা হয়নি কেন? নকল মাস্ক, পিপিই সরবরাহ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া কেন? স্বাস্থ্যবীমা, প্রণোদনা ইত্যাদি শুধু সরকারি ডাক্তারদের জন্য বরাদ্দ করায় দুই তৃতীয়াংশ সেই বেসরকারি চিকিৎসকরা কাজে কি অনীহা বোধ করবে না? প্রথম থেকে করোনা পরীক্ষা শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কুক্ষিগত রাখা হয়েছিল কেন? এখন পর্যন্ত সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার সুবিধা নেই কেন? আমজনতাকে রাস্তায় ফেলে স্বাস্থ্য ডিজি করোনা চিকিৎসার জন্য সিএমএইচে আশ্রয় কেন? কেন মুগদা বা কুয়েত মৈত্রীতে নয়?


নারায়ণগঞ্জের করোনা যুদ্ধের বীর কমিশনার খোরশেদ মৃত ৬১ জনকে দাফন ও সৎকার করে স্ত্রী লুনাসহ করোনা আক্রান্ত। স্ত্রীর শ্বাসকষ্ট হলে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও আইসিইউ পাননি! পরে শামীম ওসমান এমপি স্কয়ারে ভর্তি করান। যার শামীম ওসমান নেই তার? কুয়েত মৈত্রী আর মুগদায় কি কেউ চিকিৎসা নিয়েছেন আগে? করোনা হাসপাতালে কি রোগীরা চিকিৎসা পায়? দেশের ৭০ ভাগ চিকিৎসক বেসরকারি হাসপাতালে। শুরুতেই তাদের নিয়ে করোনাসহ সব চিকিৎসার পরিকল্পনা স্বাস্থ্য বিভাগ গড়ে তোলেনি কেন? সচিবরা জেলার সমন্বয়কারী। কতবার জেলা সফর করেছেন? প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি হাসপাতালে করোনার রোগীর চিকিৎসা করতে বলা হয়েছে। মানুষ বলছে দেশে এখন কোনো চিকিৎসাই নাই! কর্মকর্তারা বাণিজ্যে যত তৎপর পরিদর্শনে ততটা নয় কেন? দেশের মানুষ চিকিৎসাসেবা কেন পাবে না? এটা তার অধিকার। হে সংসদ সদস্যগণ জবাব নাও, জবাব চাও। পাঁচতারকা ইউনাইটেডে অনেক আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেল। এবার অবহেলিত করোনা রোগীর পোড়া লাশ! জবাব চাই হে সংসদ, জবাব চাই। প্রতিটি মৃত্যুর আর্তনাদ থেকে আজ জবাব চাইতেই হবে। পাঁচতারকা এ্যাপোলোর সিংহ ভাগ শেয়ার প্রায় আড়াইহাজার কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে নাম বদলে এখন এভারকেয়ার হলেও রোগীদের আশ্রয় দেয় না। সব সরকারি হাসপাতালেও রোগীরা ডাক্তার নার্সের দেখা পায় না অনেক সময়। বাজেট বরাদ্দ করুন। খরচের পাই পাই হিসাবটা করুন। জনগণের ট্যাক্সের টাকা। কৃষকের হাড়ভাঙা, প্রবাসী শ্রমিকের রক্ত পানি করা টাকা। জনগণের সরকারকে জনগণের সংসদে জবাব দেওয়ার সময় এখন। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংসদে একটা কমিটি করা জরুরি যে কমিটি দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবা মনিটর ও কার্যকর করবে।


অচেনা ভয়ঙ্কর শত্রু কখন কাকে আক্রান্ত করবে, কখন কার জীবন কেড়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ দেবে ঠিক নেই। মরতে মরতে বাঁচো। বাঁচতে বাঁচতে মরো অবস্থা এখন। জীবিকার লড়াইয়ে এখন জীবন কার্যত নিয়তির হাতে। পর্যাপ্ত টেস্ট হলে দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ত। করোনার উপসর্গ নিয়েও মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখার তাগিদেই জীবিকার এড়াই শুরু। ৬৬ দিনের লকডাউনে দেশের অর্থনীতি চার লাখ কোটি টাকার লোকসান দিয়েছে। যদিও শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়কের জায়গায় সাহসের সঙ্গে ছয় কোটি মানুষকে খাবার দিয়েছেন। ৫০ লাখ মানুষকে নগদ অর্থ দিয়েছেন। দেশের বিত্তবান, এমপি, নেতারাও ঘরে ঘরে মানুষকে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। দিয়েছে সামাজিক সংগঠন। যার যা সামর্থ্য। প্রতি দুর্যোগে যেমন মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায় তেমনি দাঁড়িয়েছে। আবার চুরি-চামারিও হয়েছে। ব্যবস্থাও নিয়েছে সরকার।


মানবতার বিপরীতে দেশে-বিদেশে ঘটেছে অমানবিক ভয়ঙ্কর সব ঘটনা। দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বেশ কজন সাংবাদিক কারাগারে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক মানবাধিকারের দেশেও লাইভ রিপোর্ট করাকালে সিএনএনের রিপোর্টারকে পুলিশ তুলে নিয়েছে। লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের হাত ধরে যাওয়া ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন অপহরণকারীদের গুলিতে নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শেতাঙ্গ পুলিশের হাতে নিহত জর্জ ফ্লয়েড এখন একটি প্রতিবাদের নাম। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে লকডাউন ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে বিক্ষুব্ধ মানুষ।


করোনার আগাম প্রস্তুতি নিতে আমরা পুরো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলাম। তারপর ছুটির ফাঁদে সব যোগাযোগ বন্ধ করে সামাজিক দূরত্বের নিষেধাজ্ঞা দিয়েও আমরা শুরু থেকেই কার্যকর শক্তিশালী লকডাউনে যেতে পারিনি। লকডাউনকে বেপরোয়া অসচেতন মানুষ বুড়ো আঙ্গুলে বেটাগিরিতে উড়িয়ে দিয়েছে। গার্মেন্ট মালিকরা কারখানা খুলে সর্বনাশটাও ডেকেছিলেন। তবু পেশিবহুল শ্রমজীবী মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কাছে করোনাভাইরাস অনেকটাই পরাস্ত। গ্রামের হাটবাজারে তো লকডাউনের বার্তা যেন কাজই দেয়নি। ঈদের কেনাকাটা আর গ্রামে আসা-যাওয়ায় করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। পরিশ্রমী অসুখ-বিসুখহীন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাধর মানুষের কাছে করোনা সয়ে গেছে। কিন্তু যাদের নানা অসুখ-বিসুখ ও প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণি তাদের শয্যাশায়ী করেছে। অনেকে মর্মান্তিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। করোনার মহাপ্রলয় পৃথিবীর শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোকেও প্রবল ঝাঁকুনিতে জানিয়ে দিয়েছে ধ্বংস সহজ সৃষ্টিই কঠিন। সামরিক শক্তিতে যত প্রতাপশালী ধনাঢ্য একেকটি দেশ, তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল সেটি করোনার আঘাতে দৃশ্যমান হয়েছে। সেই হিসাবে আমাদের দেশের অবস্থা অনেক কঠিন জায়গায়। অর্থনীতিতে আমরা কেবল উদীয়মান। কঠিন দরিদ্রতা ও যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখা জাতি আমরা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা শুরু করেছিলাম। দেশের আয়তনের চেয়ে জনসংখ্যা বিশাল। তার ওপর দরিদ্রতা, অসচেতনতা শিক্ষার অভাব। আছে বেকারত্বের বোঝা। এর মধ্যে চিকিৎসা খাত কতটা দেউলিয়া সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত তার শেষ নেই। দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। অভিশাপের মাত্রা ছাড়িয়েছে কবে ব্যাংকিং খাতের লুটপাটে। বছরের পর বছর বিতর্কের ঝড় উঠে, লুটেরা ধরা পড়ে না। সংস্কার কমিশন হয় না। ঋণখেলাপিদের বাঁচিয়ে রাখার অভিনব ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হয়। রহস্য উপনাসের ফর্মা বাড়ে সমাধান হয় না। শেয়ারবাজার লুটতে লুটতে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর নিঃস্ব হওয়ার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী এক দশক। ব্রোকার হাউসগুলোও দেউলিয়া হওয়ার পথে। বাজিকর যারা তারাই কুতুব হয়ে বসে আছেন অর্থের পাহাড়ে। দেশ-বিদেশে তাদের সম্পদ। দূষিত বাতাসের মতো গা সওয়া হয়ে গেছে। জুয়াড়িরা ধরা পড়ে না। বাজারও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে বের হয় না। বিএসইসির নতুন নেতৃত্বও এসেছে। বাজারে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে করোনার বিপর্যয়ে শত্রুও কাউকে এমন পরামর্শ দেয় না। বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনা নিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর সিনেমা হতে পারে। কিন্তু এর সমাধান হয় না। সব প্রতিষ্ঠান ভঙ্গুর দুর্বল, সংস্কার নেই। শক্তিশালীকরণের কোনো উদ্যোগ নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নেই। আছে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়। সংসদ সদস্যগণ বোবা হয়ে বসে থাকবেন না, সংসদে কথা বলুন।


লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com