অসুস্থ জাতি ও বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ!
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২০, ২২:১২
অসুস্থ জাতি ও বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ!
আতিক মাহামুদ রোমেল
প্রিন্ট অ-অ+

অর্থনৈতিক সক্ষমতায় মোটামুটি আমাদের সমপর্যায়ের দেশ ভিয়েতনাম। চায়নার সাথে তাদের কয়েকশত মাইলের বিস্তৃর্ণ সীমান্তরেখা রয়েছে। ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারও চীন। দুদেশের নাগরিকদের মধ্যেও রয়েছে অবাধ আন্তঃযোগাযোগ সম্পর্ক। অথচ করোনা ভাইরাসের আঁতুড়ঘর চীনের প্রতিবেশী এই দেশটিতেই এখনো পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজন মানুষও মৃত্যুবরণ করেনি। আরও চমৎকার বিষয় হচ্ছে, প্রায় মাসখানেক আগেই দেশটি করোনা সংক্রমণের হার শুন্যে নামিয়ে এনেছে।


চীনে যখন করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, তখন থেকেই ভিয়েতনাম জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, চমৎকার ব্যবস্থাপনা ও জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এই ভাইরাস মোকাবিলা করা শুরু করে যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। যার সুফল এখন তারা পাচ্ছে।


ইতোমধ্যে তাদের অর্থনীতি প্রায় পুরোদমে চালু হয়ে গেছে, আমদানি রপ্তানি বাড়ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খবর হচ্ছে, যেসব বহুজাতিক কোম্পানি চীন থেকে তাদের উৎপাদন ইউনিট সরিয়ে বিকল্প কোন দেশে স্থানান্তরের চিন্তা করছে তাদের অন্যতম পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম। ফলে বিশাল অংকের বিদেশি বিনিয়োগ এখন দেশটির দরজায় কড়া নাড়ছে যা আসতে পারতো ভারত বাংলাদেশের মত দেশগুলোতেও।


শুধু ভিয়েতনামই নয়, আন্তঃযোগাযোগ ও ভৌগোলিকভাবে চীনের নিকটবর্তী দেশসমূহ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, হংকং, তাইওয়ান ও ইন্দোনেশিয়ার মত দেশগুলোও করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছে। যার ফলে এসব দেশসমূহে করোনার প্রাদুর্ভাব প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় শুন্যের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে।


এখন আমাদের দেশের কথায় আসি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যেহেতু এখন বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করেছে সেহেতু এর ঢেউ বাংলাদেশেও এসে পড়েছে। সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশও এর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তবে এই সংকট মোকাবিলা নিয়ে ইতোমধ্যে দেশে ব্যপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মূলত সরকারের অপরিকল্পিত নীতিমালা ও বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কারণে এমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ভাষ্য। সেই সাথে দায়িত্বশীলদের অনিয়ন্ত্রিত কথাবার্তা ও অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড এই সংকটকে আরো দীর্ঘায়িত করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


"আমেরিকা পারেনি, ইউরোপ পারেনি, কানাডা পারেনি। তাই আমরা না পারাটা আমাদের ব্যর্থতা নয় বরং করোনা সংকট মোকাবিলায় আমরা তাদের চেয়ে সফল। ইউরোপ আমেরিকার মত এদেশে এত বেশি সংখ্যায় মৃত্যু নেই, আক্রান্ত রোগী নেই, হাসপাতালে হাহাকার নেই, বেকারত্বের বালাই নেই, খাদ্যদ্রব্যের অভাব নেই, অর্থনৈতিক সংকট নেই"। এইগুলোই হচ্ছে আমাদের দায়িত্বশীল মন্ত্রী আমলাদের প্রতিদিনকার ভাষ্য।


অর্থাৎ, ইউরোপ আমেরিকার সাথে তুলনা করে এদেশের দায়িত্বশীলরা হয়ত জনগণকে এটাই বুঝাতে চান যে, "করোনা এখানে তেমন বড় কোন সমস্যা নয়। সবকিছুই ঠিকঠাক আছে, স্বাভাবিক আছে। তারা খুব সাফল্যের সাথেই এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করছে। জনগণের উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কিছু নেই। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্ব মেনে সবকিছু করা যাবে, স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরা যাবে"।


সরকারের সাফল্যের প্রমাণ রাখতেই হয়ত এখন গার্মেন্টস সহ শিল্প কারখানাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে, অফিস খুলে দেয়া হয়েছে, বাজার উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, মার্কেট খুলে দেয়া হয়েছে, রাস্তায় অবাদে ভিড় জমতে দেয়া হয়েছে, ঈদকে সামনে রেখে মানুষকে শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়তে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সফলতার চিত্র যদি আমরা দেখি তাহলে আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না।


সরকারের দায়িত্বশীলদের এইসব বক্তব্য ও কার্যকলাপ যে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া বেশি কিছু ছিল না তার প্রমান সময়ের বাস্তবতায় জনগণ আজ দেখতে পাচ্ছে। দেশে করোনা পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সীমিত পরীক্ষার মধ্যেও ইতোমধ্যে রোগীর সংখ্যা প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ পার হয়েছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে সরকার ঘোষিত মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুন বেশি যা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।


সবচেয়ে আশংকাজনক ব্যপার হচ্ছে, প্রতিদিন যা টেস্ট হচ্ছে এর ১৫% থেকে ২০% হারে রোগী সনাক্ত হচ্ছে। এ হিসেবে, প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনা টেস্ট করানোর জন্য সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্ণা দিচ্ছে তাদের সবাই যদি পরীক্ষার আওতায় আসে তাহলে রোগীর সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়াবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্লেষকরা।


আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত ইতোমধ্যে প্রায় ভেঙে পড়েছে। অনেক হাসপাতাল রোগীদের চিকিৎসা দিতে অপারগতা জানাচ্ছে। হাজার হাজার ডাক্তার প্রাইভেট প্রেক্টিস ছেড়ে দিয়েছে। চিকিৎসার জন্য একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, মারা যাচ্ছে। এমন খবরাখবর প্রায়শই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।


করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৯০ ভাগই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার বাহিরে রয়েছে। অর্থাৎ, সরকার মাত্র দশ ভাগ করোনা রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পেরেছে। যদিও করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আরও রয়েছে ডাক্তার-নার্সদের পর্যাপ্ত প্রোটেকশন ইকুইপমেন্টের অভাব, স্বাস্থ্য প্রশাসনের দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ।


এতসব অভাব, অভিযোগ, সমস্যা, সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যেও সবকিছু স্বাভাবিক প্রামাণের একটা অপচেষ্টা আমাদের দেশের দায়িত্বশীলরা করে যাচ্ছে। এতে আদতে কোন লাভ হবে? নাকি সংকট আরও ঘনীভুত হবে? যে অর্থনীতির কথা চিন্তা করে করোনার মত ভয়ংকর এই মহামারীকে অবহেলা করা হচ্ছে, জাতিকে অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, এই অসুস্থ জাতি নিয়ে সেই অর্থনীতিকে কতটুকু সমৃদ্ধ করা যাবে? তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে! কারণ একটা অসুস্থ জাতির সাথে কোন সুস্থ জাতির ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকতে পারে না।


বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলো করোনা সংকট কাটিয়ে উঠছে। বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর করোনা পরিস্থিতিও উন্নতির দিকে রয়েছে। তারা খুব শিগ্রই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমরা এখনো এই সংকটের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি এবং সহসায় এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।


এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা যদি সময়মত এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারি তাহলে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকতে হবে। অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়বে। বিশ্বের কোন দেশ আমাদের শ্রমিকদের ঢুকতে দিবে না, ব্যবসায়ীদের ঢুকতে দিবে না, পর্যটক ঢুকতে দিবে না। এদেশের ভিআইপি'রা চিকিৎসার জন্য বাহিরে যাবেন? সেই সুযোগও পাওয়া যাবে না। আমাদের দেশেও বহির্বিশ্ব থেকে কেউ আসবে না। যে রপ্তানি খাত বাঁচানোর জন্য গার্মেন্টসগুলো খুলে দেয়া হয়েছে সেই রপ্তানি খাতেও ধ্বস নামতে পারে। কারণ একটা অসুস্থ জাতির কাছ থেকে কেউ পন্য নিবে না যেমনটা চায়নার সাথে শুরুতে হয়েছিল।


কথায় কথায় ইউরোপ আমেরিকার সাথে তুলনা করে আমাদের মন্ত্রী, আমলারা কি সুখ পান জানিনা তবে জনগণের একজন প্রতিনিধি হয়ে এটুকু বলতে পারি, আপনাদের কথায় জনগণ মোটেও আশ্বস্ত হতে পারেনা। আপনারা ইউরোপ আমেরিকার ব্যর্থতা দেখিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পারেন অথচ ভিয়েতনামের মত সমপর্যায়ের একটা দেশের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিতে পারেন না।


সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ ধারণ করবে। যে ভ্যাকসিনের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অবাধে সব খুলে দেয়া হচ্ছে, সেই ভ্যাকসিন সময়মত বাজারে না আসলে জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে। তখন হয়ত বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি অসুস্থ জাতি হিসেবে পরিচিত হবে এবং বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাবে।


লেখকঃ সাংবাদিক ও সোস্যাল এক্টিভিস্ট, সংগঠক, দুর্নীতি প্রতিরোধ মঞ্চ


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com