করোনা: গজব তত্ত্বের সঙ্গে গুজবের বাজারও গরম
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২০, ২১:১০
করোনা: গজব তত্ত্বের সঙ্গে গুজবের বাজারও গরম
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
প্রিন্ট অ-অ+

করোনা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ বা অঞ্চলে। আতঙ্কে আচ্ছন্ন সব দেশের মানুষ। এ অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ অস্থির করে রাখছে মানুষের মন।


যারা সব ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা খোঁজেন তাদেরও এ ভাইরাসের ঘটনায় ভুগতে হচ্ছে যথেষ্ট জটিলতায়। নানাজনের নানা মত দেখে আসছেন তারা শুরু থেকেই।


করোনা নিয়ে যে পরিমাণ সাহিত্য বা বিশ্লেষণধর্মী রচনা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে অন্য কোনো রোগ নিয়ে হয়ত এতটা হয়নি। করোনাভাইরাসের জন্য এটা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।


বিজ্ঞানী, দার্শনিক, গবেষক, সমাজতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বক্তা, চিকিৎসক, মিডিয়াকর্মী এবং প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরই এ সম্পর্কে মতামত দেয়ার সুযোগ হয়েছে। ছড়াকাররা ছড়া লিখছে। গল্পকারদের গল্প বিভিন্ন পোর্টালে ছাপছে। প্রাবন্ধিকরা প্রবন্ধ নিয়মিত রচনা করে চলেছেন।


করোনা নিয়ে ইসলামী সংগীতও দেখা যাচ্ছে ইউটিউবে। ঔপন্যাসিক, নাটকের প্রযোজক ও সিনেমা পরিচালকরা এ রোগজীবাণুকে তাদের বিষয় বানালে অবাক হওয়ার কিছু নেই।


চীন থেকে যখন প্রথম এর সূচনা হয় প্রথমেই ধর্মীয় অঙ্গনে আলোচনা হয় এটা মুসলিম নির্যাতনের ফলে চীনের ওপর খোদার গজব। আল্লাহ জুলুম বরদাশত করেন না। কোরআন হাদিস থেকে অসংখ্য দলীল দেয়া হতে থাকে। বিভিন্নভাবেই চীনের বিপদে খুশি হতে দেখা যায় ইসলাম প্রিয় সাধারণ মানুষকে।


কিছুদিনেই জানা গেল এটার প্রভাবে এমনকি কাবা ঘরেও যেতে বাধা দেয়া হচ্ছে সাধারণ ওমরা যাত্রীদের। তাওয়াফ সাই বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে আমরা বলে ফেললাম, শাসকদের পাপাচারের কারণে সৌদিতেও আল্লাহর গজব নেমে আসছে।


ইরান শিয়া রাষ্ট্র তাই সেখানেও গজব পৌঁছে গেছে। কোরিয়া, আমেরিকা, ক্যানাডা, ইউরোপে অশ্লীলতায় সয়লাব। সবখানে গজব। যখন মুসলিম দেশগুলোতে হানা দিতে শুরু করল তখন আবার আমাদের অনেককে বলতে শোনা যাচ্ছে, না, এগুলোকে গজব বলা ঠিক হবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা উচিত।


কিছু বিশ্লেষণে বলা হলো, মুসলমানদের জন্য মহামারী রহমত, অমুসলিমদের জন্য গজব। আরেক বিশ্লেষণ হচ্ছে, মুসলিম-অমুসলিম সবার জন্যই গজব। সবারই পাপ রয়েছে।


অন্য বিশ্লেষক বলছেন, যারা এ বিপদের সময়ে ধৈর্য ধারণ করে নেক আমল করে যেতে পারবে তাদের জন্য এটাকে গজব বলা যায় না। আর যারা হা-হুতাশনে ডুবে থেকে সময় কাটাবে তাদের জন্য গজবই ধরতে হবে। গজব তত্ত্বের সঙ্গে গুজবের বাজারও গরম হয়েছে শুরু থেকেই। ভাইরাসটি নাকি আমেরিকা কৃত্রিমভাবে বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে চীনে। কাল্পনিক নানা কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় ছুটে বেড়াচ্ছে দিব্যি।


আন্তর্জাতিক পাপের আন্তর্জাতিক গজব তত্ত্বের মতো আন্তর্জাতিক গুজব ঘুরছে ভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বময়।


ধর্মীয় অঙ্গনে আলোচনা শুরু হলো, এটা কি কোনো ছোঁয়াছে রোগ কি না। এ বিষয়ে সমাধানহীন তুমুল তর্ক এখনো শেষ হয়নি পুরোপুরি। একটি মত হচ্ছে এটা অবশ্যই ছোঁয়াছে ও সংক্রামক ব্যাধি। কাজেই সব ধরনের সমাগম পরিহার করে চলতে হবে।


কোনো কোনো আরব দেশে মসজিদে নামাজের জামাত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জুমা বন্ধ হয়েছে আরবের বাইরের দেশেও।


হাদিসে আছে নবীজি বলেছেন, কুষ্ঠরোগি থেকে পলায়ন করো যেভাবে তোমরা সিংহ থেকে পলায়ন কর। এর সম্পূর্ণ বিপরীত মতও দেয়া হয়েছে, ইসলামে ছোঁয়াছে রোগ বলে কিছু নেই। বুখারী মুসলিমের হাদিসে আছে। কাজেই এধরনের সতর্কতার কোনো প্রয়োজন নেই।


আরেক দল বলছেন মাঝামাঝি থাকার কথা। ছোঁয়াছে বলে কিছু নেই কিন্তু আল্লাহ দিলে দিতে পারেন কোনো রোগকে সংক্রামক বানিয়ে।


সম্প্রতি আমাদের দেশে মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে কথা উঠেছে। জনৈক মন্ত্রী বলেছেন মসজিদে না আসার কথা। একদল তার চরম প্রতিবাদ করেছেন। আল্লাহর গজব থেকে বাঁচতে বেশি বেশি মসজিদে আসতে হবে। আরেক দল বলছেন মসজিদে আসাই একমাত্র ইবাদত নয়। আরো বহু নেক আমল আছে।


বৃষ্টির জন্যও তো নবীজি (সা.) মসজিদে না এসে ঘরে নামাজ পড়ার কথা বলেছেন। বেলাল আজানের সময় ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন সাল্লু ফি রিহালিকুম অর্থাৎ যার যার ঘরে নামাজ পড়ে নিন। তাহলে এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেন মসজিদে না এসে থাকা যাবে না।


কিছু ইসলামী স্কলার এমনও বলছেন, যারা আগে থেকে মসজিদে আসত তারা আসুক, নতুন করে কারো মসজিদে ভিড় বাড়াতে আসার দরকার নেই। চিন্তাবিদদের চিন্তার বৈচিত্র্যে মুগ্ধতা ও অস্থিরতা দুটিই আচ্ছন্ন করছে সাধারণ মানুষের মন।


করোনার বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করা উচিত কি না এ নিয়েও কত রকম মতামত প্রকাশ করতে দেখা গেছে। একদল বলছেন প্যানিক ছড়াবেন না। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেলে ক্ষতি হবে।


আরেকদল বলছেন, এই যে আতঙ্ক ছড়াবেন না এ কথা বললে আরো বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। সবাই যদি বলে ভয় পাবার কিছু নেই; তাহলে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ গেড়ে বসবে। ভয়ের ব্যাপার না হলে সবাই কেন ভয় পেতে নিষেধ করছে?


আরেক দল বলছেন, বাঙালি বেপরোয়া জাতি। এদের বেশি বেশি ভয় পাওয়াতে হবে, তা না হলে এরা সতর্ক হবে না। হাদিসে সিংহের মতো ভয় পেতে বলা হয়েছে এ ধরনের রোগকে।


অন্যান্য হাদিসে এসেছে আল্লাহর ওপর ভরসার কথা। ভয় না পাওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে বহু হাদিসে। কোরআনে আছে মুমিন ভয় পায় না, দুশ্চিন্তা করে না। মুমিনের কোনো ভয় নেই। লা খাউফুন আলাইহিম।


এ সব পাল্টাপাল্টি বক্তব্য থেকে আমাদের হয়ত বেছে নিতে হবে মাঝামাঝি কোনো ভারসাম্যপূর্ণ পথ। ভারসাম্যপূর্ণ পথ কী তা নিয়েও একেক মুনির একেক মত হবে। পরিস্থিতি অনুসারে সমাধান বের করে নিতে হবে আমাদের প্রত্যেকের কমন সেন্স থেকে।


এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও সরকারকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন কোনো একটি ব্যাখ্যা শুনে বাড়াবাড়ি করা শুভকর হয় না। সমসাময়িক কোনো বিষয় নিয়ে ইসলামের একটি ব্যাখ্যা শুনেই বাড়াবাড়ি ঠিক নয়।


প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর জ্ঞানী রয়েছে। এক ব্যাখ্যার বিপরীতে রয়েছে আরো বহু ব্যাখ্যা। করোনা নিয়ে যে সব গবেষণা হচ্ছে তা থেকে অনেক শিক্ষার ভেতর এটিও একটি ভালো শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে।


কোরআন-হাদিসে যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি; যেখানে নানারকম বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে, সেখানে কোনো একটি ব্যাখ্যাকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে চরম কঠোর হয়ে যাওয়া মোটেও ঠিক হতে পারে না।


কোরআনের কথা পবিত্র। কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যা অবশ্যই পবিত্র নয়। আমাদের ভুল হতে পারে। নিজেকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা মোটেও ভালো কথা নয়।


ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করছি নিবন্ধ। একবার মিসরের কাজির নিকট গেল এক বৃদ্ধা। একটি মাসআলার সমাধান চাইল কাজি সাহেবের কাছে। কাজি সাহেব বললেন, কোরআন-হাদিস অনুযায়ী সমাধান দিব? না ইমাম শাফেয়ীর মত অনুসারে সমাধান দিব?


বুড়ি বলল, ‘কোরআন-হাদিস অনুযায়ী নয়, ইমাম শাফেয়ীর মত অনুযায়ী সমাধান দিন। ইমাম শাফেয়ী যে মত দিয়েছেন তা কোরআন-হাদীসের ভিত্তিতেই দিয়েছেন। আপনি কোরআন-হাদিস যতটুকু বুঝবেন তার চেয়ে ঢেড় বেশি বুঝতেন ইমাম শাফেয়ী। আপনার করা কোরআনের ব্যাখ্যা আমার কাছে শাফেয়ীর কোরআনের বুঝের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য নয়।’


মূলত এ সব ক্ষেত্রে কোরআনের বা হাদিসের একটি-দুটি উদ্ধৃতির বাহ্য বক্তব্যের উপর ভরসা না করে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালেকের মতো পরিস্থিতির সার্বিক বিচার করত অধিক কল্যাণকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতাই শ্রেয়।


নব উদ্ভূত বিষয়ে কোরআন-হাদিসের নামে ইসলামের খণ্ডিত ব্যাখ্যা মানুষকে ইসলামের কাছে আনার চেয়ে দূরে ঠেলে দিতে পারে বেশি। সমাজ ও দেশ শিকার হতে পারে মহাক্ষতির। আল্লাহ আমাদের সঠিক বোঝার তাওফিক দিন।


লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ।


বিবার্তা/জাহিদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com