অন্তঃসত্ত্বার কারণে ইউএনওকে ওএসডি, সংসদে ক্ষোভ
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫০
অন্তঃসত্ত্বার কারণে ইউএনওকে ওএসডি, সংসদে ক্ষোভ
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগম বীনা
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করায় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপিরা। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বর্তমান নারী ক্ষমতায়নের যুগে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তারা। অন্তঃসত্ত্বার কারণে তাকে ওএসডি করা হয়।


সোমবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সাংসদ এবং সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ এ বিষয়ে আলোচনার সূচনা করেন। পরে নারায়ণগঞ্জ সদর আসনের সাংসদ শামীম ওসমান এই দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। স্পিকার নিজেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।


বৈঠকে ৭১ বিধির নোটিশ নিষ্পত্তির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনায় মেহের আফরোজ ওএসডির প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জ সদরের ইউএনওর ফেসবুক স্ট্যাটাসের প্রসঙ্গটি তোলেন।


তিনি বলেন, একজন নারী সন্তানসম্ভবা হলে বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একজন ইউএনও অত্যন্ত বেদনাবিধুর স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি ৯ বছর পর মা হতে যাচ্ছিলেন। নির্বাচনের সময় তিনি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ছিল না। আগামী এপ্রিলে তার সন্তান জন্মগ্রহণের কথা ছিল। তিনি যখন ডাক্তারের কাছে গেলেন তখন জানতে পারলেন, ওএসডি হয়েছেন। এই খবর শুনে মানসিক চাপে আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিনি অপরিণত সন্তানের জন্ম দেন। সময়ের বেশ আগে জন্ম নেয়া সন্তানটি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।


নারী উন্নয়ন ও মাতৃত্বকালীন বিভিন্ন সুযোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, একজন নির্বাহী কর্মকর্তা, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বে আছেন তিনি। সেই দায়িত্ব যদি তিনি যথাযথভাবে পালন করে থাকেন তাহলে সন্তান সম্ভবাকে কেন ওএসডি করা হলো? বিষয়টি আমাদের কাছে ক্লিয়ার নয়। তার পাশাপাশি আমি বলতে চাই একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের সঙ্গে যে আচরণ করতে হয়, আমার মনে হয় সমাজ এখনো তা উপলব্ধি করতে পারেনি।


সন্তান সম্ভবা নারীদের প্রতি অনেক গুরুত্ব দেয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর। একজন সন্তান যদি সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ না করে তাহলে শুধু মা নয়, আমাদের সমাজ ও দেশের জন্য বার্ডেন হতে পারে। এ ঘটনার জন্য একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি করেন তিনি।


এরপর শামীম ওসমান ওই নারীকে নিজের বোনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আমি এসময় ওমরায় ছিলাম। এই ঘটনার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত ও লজ্জিত। আমার নির্বাচনী এলাকা হিসেবে সার্টিফায়েড করতে চাই- ওই কর্মকর্তা অত্যন্ত কর্মঠ ও যোগ্য ছিলেন। নির্বাচনের সময় তাকে আমি অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও তিনি রাজি ছিলেন না; বরং কাজ করতে পারলে তিনি ভালো থাকবেন বলে জানান।


তিনি বলেন, এই নারী আমার বোন, স্ত্রী, মা। আজ আমি জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে বহুবার ফোন করেছিলাম। হয়তো আমার নম্বরটা তার কাছে নেই বলে তিনি ধরেননি। এই ঘটনা আমার এলাকায় হওয়ায় আমিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি। কেন, কীভাবে তাকে ওএসডি করা হলো তা জানতে চাই। আমি মানুষ হিসেবে বলছি, আশা করি এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রী সংসদে বক্তব্য দেবেন। তাকে বদলি নয়, কেন ওএসডি করা হলো তা তদন্ত করে বের করুন। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি তার বাচ্চাটা যেন হায়াত দারাজ করেন। বাচ্চাটা যদি কিছু হয় আমি নিজেকেও ক্ষমা করব না।


পরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, আশা করি, জনপ্রশাসন মন্ত্রী এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।


প্রসঙ্গত, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি করা হয়। ওএসডি’র পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বীনা তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। যা নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়।


তার স্ট্যাটাসের মূল বক্তব্য হলো- মাত্র ৯ মাস পূর্বে তিনি এ পদে যোগদান করেন। তার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও কোনো সন্তান হয়নি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে জানতে পারেন তিনি দুই মাসের সন্তান সম্ভবা। এ অবস্থা নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি এ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে এপ্রিসিয়েশনও দিয়েছে। অথচ সন্তান সম্ভবা হওয়ার পর তাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করে ছিল একটি মহল।


সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ২০ এপ্রিল; মানসিকভাবে প্রস্তুতিও ছিল তার। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেগুলার চেকআপ করার সময় খবর পান কর্তৃপক্ষ তাকে ওএসডি করেছে। তার অপরাধ তিনি সন্তান সম্ভবা। খবর শোনার পর তিনি মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেননি। অ্যাজমার রোগী হওয়ায় প্রচণ্ড মানসিকচাপে তার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এতে তার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই পেটের সন্তানের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়।


এরপর তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রি-ম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। বর্তমানে সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে। বীনার প্রশ্ন তার নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই বড় অপরাধ? বীনার অভিযোগ, তার জায়গায় পোস্টিং নিতে প্রভাবশালী কারো তদবিরে এমনটা হয়েছে।


বিবার্তা/মাইকেল/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com