৫ বছরের সাজার বিধান রেখে সড়ক পরিবহন বিল পাস
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০০
৫ বছরের সাজার বিধান রেখে সড়ক পরিবহন বিল পাস
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন বিল ২০১৮’ বুধবার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এতে বেপরোয়া মোটরযানের কবলে পড়ে দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।


সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে বিলটির জনমত যাচাই-বাছাই ও সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তি হয়।


নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে চালকের সাজা দুই বছর বাড়িয়ে এই আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার।


জনমত যাচাইয়ের দাবির জবাবে দেয়া বক্তব্যে সেতুমন্ত্রী বলেন, যারা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেছেন তাদের বলবো, ২৫ বছর অপেক্ষার পর আর কত অপেক্ষা করবো? আপনারাই বলছেন দুর্ঘটনা ঘটছে, যানজট হচ্ছে।


তিনি বলেন, অনেকে বলেছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের ফলে এই বিল এসেছে। এটা ঠিক নয়। এই বিলটি দেড় বছর আগে তৈরি করা। অংশীজনদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনার সোনালি ফসল এই সংসদে এসেছে। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মারে তাদের শাস্তি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সুতরাং শাস্তি কোনোভাবেই কম নয়।


বিলের ওপর দেয়া বিরোধী দলের সদস্যদের চারটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। অন্যান্য সংশোধনী প্রস্তাবের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিলের মধ্যে সবকিছু আনার প্রয়োজন নেই। বিধি-প্রবিধান করে অনেক কিছু সংযোজন করা যাবে।


এ সময় তিনি আরো বলেন, দুঃখজনক হলো, মাঝে মাঝে দেখি তিনজন আরোহী নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মোটরসাইকেল ছুটে চলে। এরা বেশিরভাগই রাজনৈতিক কর্মী। সুতরাং আমাদের দলগুলোকে সতর্ক হতে হবে।


এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে তোলা হলে তা পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।


প্রস্তাবিত আইনের ১০৫ ধারায় বলা আছে, এই আইনে যা-ই থাকুক না কেন, মোটরযান চালাতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে এ-সংক্রান্ত অপরাধ দণ্ডবিধির-১৮৬০-এর বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে দণ্ডবিধির ৩০৪বি ধারাতে যা-ই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলা করে মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে ওই চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।


বিলের ১১৪ ধারায় বলা আছে, এই আইনের অধীনে অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।


বিলে আরো বলা আছে, এই আইনের অধীন অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত নির্বাহী হাকিমের মাধ্যমে বিচার করা যাবে।


বিলের ৪ ধারাতে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করে পাবলিক প্লেসে গাড়ি চালাতে পারবেন না বা চালানোর অনুমতি দেয়া যাবে না।


৫ ধারায় বলা আছে, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র ছাড়া কেউ গণপরিবহন চালাতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দেয়া যাবে না।


৬৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আইনের ৪ ও ৫ ধারা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।


৬ ধারায় বলা আছে, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে ২১ হতে হবে। আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাশ হতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তান্তর করা যাবে না। এই ধারা কেউ লঙ্ঘন করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।


সরকার বা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা এবং প্রয়োজনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্থানীয়ভাবে প্রচারের মাধ্যমে সারা দেশের বা নির্দিষ্ট কোনো এলাকা, সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার বা টানেলে যেকোনো মেয়াদের জন্য সব বা যেকোনো মোটরযান চলাচল নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।


কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট চালক, কন্ডাক্টটর বা তাদের প্রতিনিধি নিকটস্থ চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে না গেলে এবং নিকটস্থ থানা, ফায়ার সার্ভিস বা হাসপাতালকে অবহিত না করলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে বিধান রাখা হয়েছে। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১ মাসের কারাদণ্ড বা ২০ হাজার বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে চালকের এ পয়েন্ট কাটা যাবে।


বিলে বলা হয়েছে, ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ ব্যবহার অথবা ইকোনোমিক লাইফ অতিক্রান্ত হওয়া মোটরযান চালালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে।


এতে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই ব্যক্তিকে চালক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দিতে পারবে না। শ্রম আইন অনুযায়ী লিখিত চুক্তি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তিকে গণপরিবহনের চালক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে না।


মোটরযানের দুর্ঘটনার কারণে কোনো ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল নামের একটি তহবিল থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাদের উত্তরাধিকারীদের এই তহবিল হতে ক্ষতিপূরণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চিকিৎসা খরচ দেয়া হবে।


বিলে বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকবে। কেউ এই আইনের অধীন অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে।


কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত হারে ও পদ্ধতিতে মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে আর্থিক সহায়তা তহবিলের জন্য বাৎসরিক বা এককালীন চাঁদা আদায় করবে। মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের জন্য চাঁদা দিতে বাধ্য থাকবে। তহবিলের টাকা তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।


আর্থিক সহায়তা তহবিল পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্টিবোর্ড থাকবে। বোর্ড আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে দেয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ ও মঞ্জুর করবে।


বিদ্যমান আইনের ১১৭টি ধারা ও ১২টি তফসিলের স্থলে ১৪টি অধ্যায়ে ১২৬টি ধারা রয়েছে। নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিকরণের জন্য সময় সময়, এক বা একাধিক বিষয়ে আদেশ প্রদান এবং নীতিমালা প্রণয়নের বিধান।


প্রতিবন্ধীবান্ধর মোটরযান প্রবর্তন এবং গণপরিবহনে নারী, শারিরীক প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য আসন সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।


মোটরযান চলাচলে শৃঙ্খলা রক্ষার্থে চালকের সিটবেল্ট বাধা, গাড়ি চালনার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা, সংরক্ষিত আসনে না বসা, বিপরীধ দিক থেকে মোটরযান না চালানো, যাত্রীদের সাথে সৌজন্যমুলক ব্যবহার ইত্যাদি বিধান রয়েছে বিলে।


সরকারি কর্মচারীদের অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ত্রুটিপূর্ণভাবে পালনের কারণে দূর্ঘটনা ঘটলে বা কোনো সড়কের ডিজাইন বা নির্মাণ বা রক্ষনাবেক্ষনজণিত বা তদারকির ওপর বর্তাবে এবং প্রচলিত আইনে বিধান হবে।


আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও উপআঞ্চলিক মহাসড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করে বিদেশ হতে আগত যানবাহন ও চালকের রুট পারমিট প্রদান করা হবে।


টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনয়ন এবং জনস্বার্থে স্বচ্ছ ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার বিধান। সড়ক বা মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাট-বাজার, দোকানপাটসহ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ বা তাৎক্ষনিকভাবে অপসারণের বিধান রয়েছে।


বিবার্তা/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com