ঈদে ঘরে ফিরতে গিয়ে নিহত ৪০৫, আহত ১২৭৪
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৮, ০৯:৫০
ঈদে ঘরে ফিরতে গিয়ে নিহত ৪০৫, আহত ১২৭৪
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

ঈদুল ফিতরে ঘরে ফিরতে গিয়ে নৌ, রেল ও সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ১৩ দিনে ৩৩৫টি দুর্ঘটনায় ৪০৫ জন নিহত এবং ১২৭৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৩৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১২৬৫ জন। এ ছাড়া নৌ দুর্ঘটনায় এখনো ২৫ জন নিখোঁজ রয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এসব তথ্য জানিয়েছে।


শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০১৮তে এসব তথ্য তুলে ধরেন।


লিখিত প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরে ঘরে ফেরাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। গত তিন বছরে ঈদুল ফিতরে ৬০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮০৩ জন।


তিনি আরো বলেন, ঈদ যাত্রা শুরুর দিন থেকে ঈদ শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরতে ১৩ দিনে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত ও ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হয়েছে। একই সময় নৌপথে ১৮টি দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত, ৫৫ জন নিখোঁজ ও ৯ জন আহত হয়েছে। রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ে ৩৫ জন, ট্রেনের ধাক্কায় ৪ জন ও ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ২ জনসহ মোট ৪১ জন নিহত হয়েছে। এবার ঈদে বাড়ি ফিরতে ও কর্মস্থলে যোগ দিতে গিয়ে মোট ৪০৫ জন মানুষ মারা গেছে।


মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ২০০৬ সালে ঈদুল ফিতরের সময় নৌ, রেল ও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল ২০০ জন। আর গত বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩০১ জন। আর এবার ৪০৫ জন।


এবার বেশি সংখ্যায় মানুষ নিহত হওয়ার কারণ সম্পর্কে মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরো বলেন, এবার ঈদে পরিবহনে বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়েছে। ফলে মানুষ বিশেষত দরিদ্র মানুষ বাস ও নৌপথে বেশি টাকা দিয়ে যেতে পারেননি। তাঁরা ট্রাকে করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছেন। এতে অবশ্যই সরকারের দায় আছে।


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিচ্ছি যে তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, সড়কের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করছেন কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।


সুলতানা কামাল আরো বলেন, আত্মহত্যা করার মতো শয়ে শয়ে মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে। আমরা বেপরোয়া জাতিতে পরিণত হয়েছি। যা কিছু হয়, তা বন্দুকযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জনগণও তালি দিচ্ছে। কিন্তু সংকটের সমাধান হচ্ছে না। আইনের শাসন সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করা দরকার।


গত ২৫ জুন মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূরপাল্লার যানে বিকল্প চালক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্য সব নির্দেশের মধ্যে রয়েছে, পরিবহনের চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, রাস্তার মাঝে চালকদের বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা, সিগন্যাল দিয়ে পারাপার করা, সিট বেল্ট পরানো নিশ্চিত করা। এসব বিষয় তদারকির জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।


আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো দৈবদুর্বিপাকের বিষয় নয়। এটি মানুষের সৃষ্ট। এটি প্রতিরোধের দায়িত্ব ছিল সরকারের। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো, পরিবহন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও অব্যবস্থাপনা। এসবের সঙ্গে সরকারে যারা বসে আছেন, তাদের সম্পর্ক রয়েছে। নিহত মানুষগুলোকে শুধু সংখ্যায় বিচার করা যাবে না। বেঁচে থাকতে তারা প্রত্যেকে মানুষ ছিলেন। এগুলো জীবন্ত মানুষের পরিসংখ্যান। রাষ্ট্রকে এই হত্যার দায় নিতে হবে।


সংবাদ সম্মেলনে আইবুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা মহামারি আকারে ধারণ করেছে। এর প্রধান কারণ আইন না মানার প্রবণতা বাড়ছে সবার মধ্যে। দেশে ২১৪টি ব্ল্যাক স্পট (সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা) রয়েছে। নির্মাণ ত্রুটির কারণে সড়কের এসব ব্ল্যাক স্পটে দুর্ঘটনা ঘটছে। এটি বুয়েট গবেষণা করে এটি বের করেছে।


বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে জানানো হয়।



এসব দুর্ঘটনার যানবাহন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮.৮৯ শতাংশ বাস, ১৬.৩৯ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ১২.২২ শতাংশ নছিমন-করিমন, ১৩.০৬ শতাংশ ব্যাটারি চালিদ রিকশা ও ইজিবাইক, ৬.৬৭ শতাংশ অটোরিকশা, ৮.৩৩ শতাংশ কার-মাইক্রো ও ১৫.২৮ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯.১৬ শতাংশ অনান্য যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।


মোট দুর্ঘটনার ৩৪.০২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২.৭২ শতাংশ পথচারীকে গাড়ী চাপা দেয়ার ঘটনা, ১৩.২৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা, ১.১০ শতাংশ চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে, ০.৭৩ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে ও ১৮.২০ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।


যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, বিরতিহীন বা বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো, অদক্ষ চালক ও হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, ব্যাটারি চালিত রিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেল অবাধে চলাচল, মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা, বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, সড়ক-মহাসড়কে ফুটপাত না থাকা ও সড়ক-মহাসড়কে বেহাল দশা এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।


সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট জোতিৎময় বড়ুয়া, মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


বিবার্তা/শান্ত/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com