স্বাধীনতার ৫১ বছর পরেও জীবনযুদ্ধ, ভিক্ষা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুন্নু মিয়া!
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:০০
স্বাধীনতার ৫১ বছর পরেও জীবনযুদ্ধ, ভিক্ষা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুন্নু মিয়া!
হাসান মাহমুদ মিলু, বোয়ালমারী
প্রিন্ট অ-অ+

স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রারম্ভে যে হাত রাজশাহী পুলিশ লাইনে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা, সেই হাত এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিখ মাঙে। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান তা দিয়েই অর্ধাহারে-অনাহারে সংসার চলে। নিদারুণ দুঃখ কষ্টে বিবাহযোগ্য দুই কন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে দিনাতিপাত করছেন বীরমুক্তিযোদ্ধা মুন্নু মিয়া। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে জয় ছিনিয়ে আনলেও জীবন যুদ্ধে তিনি পরাজিত সৈনিক।


হতভাগা এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মো. মানিক মিয়া ওরফে মুন্নু মিয়া। বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের চন্দনী গ্রামে। বাবার নাম মৃত আবুল হোসেন মিয়া। মুন্নু মিয়া পুলিশে কর্মরত থাকা অবস্থায় যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। রাজশাহী পুলিশ লাইনে উত্তোলন করেন বাংলাদেশের পতাকা।



অস্ত্রাগার ভেঙ্গে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি ও তাঁর সতীর্থরা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শক্তির কাছে দাঁড়াতে না পেরে পিছু হাটেন তাঁরা। পদ্মা নদী সাঁতরে আশ্রয় নেন ভারতে। তারপর ১নং সেক্টরের অধীন মুক্ত-অঞ্চল ভোলারহাট ও শিবগঞ্জ থানায় যুদ্ধকালীন সময় স্বাধীন পুলিশ বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। পাচ্ছিলেন ভাতাও। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ২০১৫ সালে গেজেট থেকে বাদ পড়লে ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।



এক সময় তিনি বেসরকারিভাবে বোয়ালমারী উপজেলা পরিষদে নাইটগার্ড হিসেবে চাকরি করতেন। বর্তমানে বয়সের ভারে কোন প্রকার কায়িকশ্রম না করতে পারায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে জীবন চালাচ্ছেন। মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যে যা পান তা দিয়ে দু’বেলা অন্নের সংস্থান করতেই কষ্ট হয় তাঁর। বয়সের ভারে নানা রোগ বাসা বেধেছে শরীরে, বৃদ্ধা স্ত্রীও অসুস্থ্য। তারউপর বিবাহযোগ্য দু’টি মেয়ের বোঝা কাঁধে দিশেহারা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। হাইকোর্টের রায় থাকলেও সাত বছরে পুনরায় তালিকাভুক্ত হতে পারেননি তিনি। মৃত্যুর আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির পূনর্বহাল চান এই মুক্তিযোদ্ধার পরিবার।


বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক মিয়া ওরফে মুন্নু মিয়া বলেন, হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই বন্ধ হয়ে যায় আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরাঘুরি করে ভাতা চালু করতে না পেরে দ্বারস্থ হই উচ্চ আদালতের। ভাতা পাওয়ার জন্য রিট আবেদন করেন তিনি। আদালত তাঁর পক্ষে রায়ও দেন। আদেশ দেন, যে তারিখ থেকে ভাতা বন্ধ হয়েছিল সেই মাস থেকেই ভাতা চালু করতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজও চালু হয়নি তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা। এ নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।



মুন্নু মিয়ার ভাষ্যমতে, ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলায় পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন তৎকালীন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. জামিল হাসান (বিপি নং-৭১০১১১৬৪৫৮)। ১৯৬৯ সালের ক্যান্ডিডেট রেজিস্টার অনুযায়ী মুন্নু মিয়ার সিরিয়াল নং ১০৬।



এরপর তিনি রাজশাহী ইপিপিআর (পুলিশ লাইন্স) এ যোগদান করেন। যার নং কনস্টেবল/৩২২ (রাজশাহী)। রাজশাহী পুলিশে কর্মরত অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ তিনি সম্মিলিতভাবে রাজশাহী পুলিশ লাইন্সে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ২৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী পুলিশ লাইনে পাক-বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন। পরে পাকিস্তানিরা রাজশাহী পুলিশ লাইন্স দখল করে নিলে পিছু হটে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের মুর্শিদাবাদে চলে যান। সেখান থেকে কলকাতা বাংলাদেশ মিশনে ১নং সেক্টরে যোগদান করেন। ১০ নভেম্বর জেনারেল ওসমানি কমান্ড সার্টিফিকেট দিয়ে ভোলারহাট থানার জোনাল অফিসার মালদহের কাছে প্রতিবেদন করার নির্দেশ দেন এবং ২৭ ডিসেম্বর শিবগঞ্জ থানায় বদলি করেন।


তিনি আরো জানান, শিবগঞ্জ থানায় কর্মরত থাকাকালীন বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দেয়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় পুলিশ সদস্য যে জেলায় কর্মরত ছিলেন ওই জেলায় পুনরায় চাকরিতে যোগদান করবেন। ওই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে মুন্নু মিয়া ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি রাজশাহী পুলিশ লাইন্সে পুনরায় যোগদান করেন। পরে রাজশাহী জেলায় কর্মরত থাকা অবস্থায় ঠিকঠাক বেতন-ভাতা না পাওয়ায় স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে চলে আসেন।


মুন্নু মিয়ার বিভিন্ন কাগজপত্র, দলিলপত্র সূত্রে জানা যায়, হেডকোয়ার্টার্স স্মারক নম্বর কল্যাণ/৬-৯৮/১৯৯০ (১০০), তারিখ ১১.০৭.৯৯ খ্রি. এর ২০ পাতায় মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় মুন্নু মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত আছে বলে পুলিশের এআইজি (কল্যাণ) মো. হুমায়ুন কবীর প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। একই বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. আরিফুর রহমান ২০০১ সালের ১২ অক্টোবর একটি সনদপত্র দিয়েছেন।


‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা গ্রন্থে’ ২য় খণ্ডের ৭০৯ নম্বর পাতায় রাজশাহী জেলার কনস্টেবল/৩২২ মানিক মিয়া ওরফে মুন্নু মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত আছে। ওই অনুযায়ী ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল রাজশাহী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবীর প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।


২০১৫ সালের জুলাই মাসে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা বন্ধ হওয়ার পরে মানিক মিয়া ওরফে মুন্নু মিয়া উচ্চ আদালতে রিট করেন। হাইকোর্টের বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী এবং বিচারপতি রাজিক আল জলিল ২০১৬ সালের ১২ জুলাই মুন্নু মিয়ার পক্ষে রায় দেন। রায়ে ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে বকেয়াসহ ভাতা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিবাদীদের। হাইকোর্টের রায় নম্বর ২০৮৫/২০১৬।


রায়ের পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্তকরণ ও সনদ প্রত্যয়নের জন্য ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জননিরাপত্তা বিভাগ পুলিশ শাখা-২ এর উপ-সচিব ফারজানা জেসমিন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর চিঠি পাঠান। যার স্মারক নম্বর ৪৪.০০.০০০০.০৯৫.১১.০০৫.১৯.৪১৬। কিন্তু এরপরও মুন্নু মিয়ার মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা চালু হয়নি।



মুন্নু মিয়া দাবি করেন, যুদ্ধের সময় এমএজি ওসমানির প্রদত্ত সনদপত্র রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা গ্রন্থেও আমার নাম রয়েছে। সে অনুযায়ী আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাই এবং ভাতা পেতে শুরু করি। ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বশেষ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা পেয়েছি। ভাতা বই নং ১৫০। সোনালী ব্যাংক, বোয়ালমারী শাখায় আমার হিসাব নং ৩৪০৯৬৫৭৪। ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে হঠাৎ করে আমার ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে হাইকোর্ট ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে আমার বকেয়াসহ ভাতা দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেন। পরে ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব ফারজানা জেসমিন স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্তকরণের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দিয়ে আমি মন্ত্রণালয়ে ভাতা দেওয়ার জন্য আবেদন করি। কিন্তু এখনো আমার ভাতা চালু হয়নি।


বীর মুক্তিযোদ্ধা মুন্নু মিয়া বলেন, আমি একজন প্রকৃতি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আজ স্বীকৃতি বঞ্চিত। নিজের প্রাপ্য সম্মান পেতে সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তির ও প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরে এখন ক্লান্ত। হাইকোর্ট আমাকে পূনর্বহালের নিদের্শ দিলেও কেনো এখনো আমি স্বীকৃতি পাচ্ছি না তা আমার জানা নেই। টাকা পয়সা নয়, আমি আমার প্রাপ্য সম্মান চাই। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।



বোয়ালমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অধ্যাপক আব্দুর রশিদ মুন্নু মিয়ার মুক্তিযোদ্ধা কালীন অবদান স্বীকার করে বলেন, ‘তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বর্তমানে খুবই খারাপ অবস্থায় আছে।’ দ্রুতই মুন্নু মিয়ার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি ও ভাতা চালু করার জোর দাবি জানান তিনি।



স্বাধীনতার ৫১ বছর পেরিয়ে গেলেও যাদের হাত ধরে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা, তেমনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করে চালায় সংসার। সারাদিন শেষে বাড়ি ফেরেন ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে। জানেন না আগামীকাল দু’বেলা খাবার জুটবে কিনা!


বিবার্তা/মিলু/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com