গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছেই
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২২, ১০:০৯
গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছেই
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

রাজধানীতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়কে ফিরেছিল স্বস্তির হাওয়া। গণপরিবহণ ব্যবস্থাপনায় এসেছিলো দারুণ পরিবর্তন। সড়কে শৃঙ্খলা ছিলো উন্নত দেশগুলোর মতো। কিন্তু সময়ের স্রোতে আবার সেই পুরোনো বিশৃঙ্খলা গণপরিবহনে।


নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়াও যত্রতত্র থামছে বাস। যাত্রীরাও হুড়োহুড়ি করে উঠানামা করছেন মাঝ সড়কেই। আবার ফুটওভারব্রিজ সঠিক স্থানে না হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ ব্যবহার করছেন না। ফলে রাজধানীতে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে সড়কে দুর্ঘটনা। গত এপ্রিল মাসেই শুধু রাজধানীতে ২৬টি দূর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। সড়ক দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।


গণপরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরীতে গণপরিবহনের এই বিশৃঙ্খলার দায় বাস চালক ও হেলপারদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও রয়েছে। তাই উভয় পক্ষকেই নিয়মের আওতায় আনতে হবে, তাহলেই কমবে সড়ক দুর্ঘটনা।


সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর অধিকাংশ স্থানেই নির্দিষ্ট যাত্রীছাউনি থাকলেও হাতেগোনা দু’একজন ছাড়া যাত্রী সমাগম নেই। কারণ, যে যেখানে পারছেন সেখানেই বাস থামিয়ে উঠছেন-নামছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাত্রী উঠানামা কাজটা সড়কের মাঝখানেই সারা হচ্ছে। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত স্থান বা স্টপেজ ছাড়ার পর বাসের দরজা বন্ধ রাখার কথা। আবার অন্য স্টপেজে পৌঁছালে দরজা খুলবে। কিন্তু নিয়মের কোনো ধার-ধারছে না গণপরিবহনের চালকরা। তেমনি যাত্রীরাও না বুঝেশুনে কোনো নিয়ম মানছেন না ।


রাজধানীর শাহবাগ-ফার্মগেট শহরের অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক। গত বৃহস্পতিবার ফার্মগেট-বাংলামোটরে দেখা যায়, পান্থকুঞ্জ পার্কের কোনায় যে যাত্রী ছাউনি/বাস স্টপেজ আছে, সেখানে বেশিরভাগ বাস দাঁড়াচ্ছে না। অপরদিকে বাংলামোটর মোড় ও সড়কের মাঝপথ থেকেই যাত্রী তোলা হচ্ছে। একই চিত্র মিরপুর-কলাবাগান সড়কেও দেখা যায়। অনেক যাত্রীকে আবার দৌঁড়ে সড়কের মাঝখানে চলন্ত গাড়িতে উঠতে দেখা যায়। পুরুষ যাত্রীদের পাশাপাশি নারীরাও রয়েছেন বাসে উঠার এমন প্রতিযোগিতায়। পথচারীদের অনেকেই জানিয়েছেন, এমন চিত্র সবসময়ের।



বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপের তথ্য বলছে, সারা দেশের শহরগুলোতে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৭৪ শতাংশই ঘটে রাজধানী ঢাকায়। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে অধিকাংশ দুর্ঘটনা বাসের কারণেই হচ্ছে।


এআরআই’র গবেষণা তথ্য বলছে, বাস চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই ঢাকায় বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকায় সাম্প্রতিক সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সবকটিতেই বাসের বেপরোয়া চালানোকে দায়ী করেছে এআরআই।


সারাদেশে ২০২১ সালে দেশে ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭ হাজার ৮০৯ জন। আহত হয়েছে ৯ হাজার ৩৯ জন। সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট দুর্ঘটনার ৯১ শতাংশই সড়কে ঘটছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন ২০২১’ প্রকাশ করে।


‘বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন ২০২১’-এ বলা হয়েছে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, সড়কে চাঁদাবাজি, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, দেশব্যাপী নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি-ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়াসহ সড়ক দুর্ঘটনা ব্যাপক হারে বাড়ার অনেক কারণ তুলে ধরা হয়।


রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২১ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।


নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশ আর মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।


করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছর কয়েক ধাপে দেশজুড়ে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মোট ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ ছিলো। এতোদিন গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক বিবার্তাতে বলেন, রাজধানীর সড়কের এই বিশৃঙ্খলা নিরসনে কী করা দরকার, অনেক আগে থেকেই সেটা বলে আসছি। আমরা হাতিরঝিলের দিকে তাকালেই এর সহজ সমাধান দেখতে পাই। আপনি দেখতে পাবেন, সেখানে ট্রাফিক বা পুলিশ লাগে না। একই মানের চালক সুন্দরভাবে বাস চালাচ্ছেন। যাত্রীরা হাত তুললেও থামছেন না কোনো চালক। নির্ধারিত স্থান থেকেই যাত্রী উঠানামা করা হচ্ছে। হাতিরঝিলের এসব বাসচালকরা ঢাকার অন্যান্য চালকদের মতোই। তারা সেখানে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালায় না। ফলে কোনো দুর্ঘটনাও ঘটে না। কিন্তু এরাই আবার অন্য সড়কে আসলে আচরণ পাল্টে ফেলে। কারণ, সেখানে রয়েছে পদ্ধতিগত সমস্যা। হাতিরঝিল প্রকল্প গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ঢাকাবাসী সড়কের বিশৃঙ্খলার সমাধান পেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা সেটাকেও কাজে লাগাইনি।


তিনি আরো বলেন, সিমটম বা উপসর্গ-ভিত্তিক কোনো সমস্যার সমাধান হয় না, যদি সেখানে বিজ্ঞানসম্মত কোনো নির্দেশিত পথ না থাকে। আমরা যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে চাই উপসর্গ দিয়ে। যে কারণে পুলিশের আইজিপি থেকে শুরু করে পরিবহন মালিকদেরও কোনো নির্দেশনা কাজে আসছে না। সড়কে দুর্ঘটনার উপসর্গ দেখে হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু তা মোটেও কাজে আসেনি।


কোনো জিনিসই কাজ করবে না, যদি আমরা সিমটমের দিকে তাকিয়ে থাকি। এজন্য প্রয়োজন একটি মডেল করিডোর। একটি করিডোরে একজন মালিকের বাস চললে সেখানে কোনো পুলিশ লাগবে না। এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তারা মৌসুমি কাজ করে মৌসুমি সমাধান চায়। এভাবে যারা শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে ফেল করেছে, তাদের লজ্জা পেয়ে চলে যাওয়া উচিত। সড়কের এমন বিশৃঙ্খলায় যারা বেনিফিশিয়ারি তাদেরকে সরিয়ে যদি বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই সমাধান গ্রহণ করা হয়, তাহলেই শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করেন সামছুল হক।


গণপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দুর্ঘটনার দায় এড়ানো সহজ বলেই সড়কে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। এই দুর্ঘটনার জন্য যেমন চালকদের দায় রয়েছে, ঠিক একইভাবে যাত্রী বা পথচারীদেরও উদাসিনতাও রয়েছে। কোনো পক্ষই দায় এড়াতে পারে না।


গাজীপুর থেকে ধানমন্ডি রুটের ভিআইপি পরিবহনের চালক মো. রাশেল মিয়ার সাথে কথা হয়। তিনি বিবার্তাকে বলেন, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাওয়ার আগেই যাত্রীরা নামিয়ে দেয়ার জন্য চিৎকার করতে থাকেন। তখন আমরা চাইলেও তাকে স্টপেজে নিয়ে যেতে পারি না। আবার দেখা গেছে, সড়কের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। ফুটপাত থেকে যাত্রী তার নির্ধারিত রুটের বাস দেখেই বাসের পেছনে ছুটতে থাকেন। তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই সড়কের মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে যাত্রীকে তুলতে হয়। তখন যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, সেটার দায় আমাদের ওপরেই চাপানো হয়।



একই ধরনের কথা বলেছেন দিশারি পরিবহনের এক চালকও। তিনি বিবার্তাকে বলেন, সব দায় আমাদের উপর দেয়া ঠিক না। কারণ, যাত্রী যদি নির্ধারিত স্থানে না নামে, বা নির্ধারিত স্থান থেকে না ওঠে, তাহলে আমরা তো তাদের জোর করে নামাতে বা উঠাতে পারি না।


তিনি আরো বলেন, মানুষ বাস থেকে নেমে একটুও হাঁটতে চায় না। তাদের সুবিধামত নামতে চায়। এতে একটু না যেতেই আবার দাঁড়াতে হয়। অথচ তারা যদি একটু হাঁটার অভ্যাস করে, তাহলে আমরা যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানেই নামিয়ে দিতে পারি।


কথা হয় বাংলামোটরে কাজ করা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মমিনুল ইসলামের সাথে। তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমাদের দেশে নিয়ম মেনে কোনো কিছু করা যায় না, এতে পিছিয়ে পড়তে হয়। আমি আগে সবসময় বাস স্টপে গিয়ে বাসে উঠতাম। দেখি সবাই বাস স্টপ ছাড়াই যেখানে সেখানে ওঠে, বাসও থামে নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়াই। এতে বাস স্টপে আসার পর বাসে জায়গা থাকে না। জায়গা না থাকায় বাসস্টপেও বাস থামে না। পড়তে হয় বিড়ম্বনায়! তারপর থেকে এখন যেখানে সেখানে উঠি। নিয়মতো আর আমার একার জন্য না। সবাই নিয়ম মেনে চললে তাহলে সড়কে দুর্ঘটনা অনেকটা কমে আসবে।


ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বিবার্তাকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য পরিবহনের চালক, মালিক ও হেলপারদের অনেক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এটার জন্য আসলে শুধু একপক্ষকে দায়ী করা যায় না। এতে যাত্রীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। এরপরেও আমরা দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।


তিনি আরো বলেন, দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা হচ্ছে। আগামী বছরের পহেলা এপ্রিল থেকে ঘাটারচর-মতিঝিল রুটে নিয়মিত পাইলট আকারে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। তখন হাতিরঝিলের মতই পরিবহন ব্যবস্থা চলবে। বাস চলবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে, ঘটবে না দূর্ঘটনা, মানুষ থাকবে নিরাপদে।


বিবার্তা/রিয়াদ/রোমেল/বিএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com