পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছি, জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের অভিযোগ
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২০, ২২:২৭
পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছি, জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের অভিযোগ
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

করোনাভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে গোটা দেশ এখন কোয়ারেন্টাইনে। জনগণের ঘরে থাকা নিশ্চিতে সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয়েছে। তবে ব্যাংক, হাসপাতালগুলোর মতো জরুরি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত আকারে চালু আছে।


এদিকে জনগণের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিত করতে রাজপথে দায়িত্ব পালন করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে পু্লিশ সদস্যরা ঢাকার রাজপথে শুরু থেকেই অবস্থান করছে। তারা রাস্তায় থাকা মানুষকে ঘরমুখী করতে নানা কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে সম্প্রতি পুলিশের আচরণে হতাশাও দেখা গেছে রাজধানীর মানুষের মাঝে। বিশেষ করে জরুরি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পুলিশের ভুল বোঝাবুঝির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওচিত্র ভাইরাল হয়, যেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তা একজন নারী ব্যাংক কর্মকর্তার কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় বাধার সম্মুখীন হলে তাদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়।


ওই ব্যাংক কর্মকর্তা অফিসে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হন। ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর সাইন্সল্যাবে। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের সহকারী কমিশনার, থানার ওসি ও একাধিক ট্রাফিক সার্জেন্টসহ পুলিশ সদস্যরা রাজপথে চলা প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান ও রিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন আটকে যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছিল। এতে করে চরম বিপাকে পড়েন ব্যাংকার ও চিকিৎসকরা। তারা নিজেদের পরিচয় দিলেও পুলিশ কোনো যানবাহনই রাস্তা চলাচল করতে দিচ্ছিল না। এ সময় একাধিক ব্যাংকার ও চিকিৎসককে রিকশা থেকে নামিয়ে হেঁটে যেতে বলা হয়।


পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তখন এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনারা যেমন জনগণের সেবা করছেন তেমনি আমরাও গ্রাহককে সেবা দিচ্ছি। গ্রাহকদের সুবিধার্থে সীমিত পর্যায়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা রাখার ব্যাপারে সরকারি প্রজ্ঞাপনের কথা আপনারা কি জানেন না? করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি জেনেও তো সন্তানদের রেখে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। আর আপনি বলছেন পল্টন দিয়ে হেঁটে যেতে।'


মোহাম্মদপুরের উদ্যান এলাকার বাসিন্দা এক নারী চিকিৎসক বলেন, তিনি পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) চাকরি করেন। আজ সকালে তিনি রিকশা নিয়ে মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান হাউজিং এলাকা থেকে আসার পথে বার বার পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। অন্যান্য স্থানে পুলিশ আটকালেও পরিচয় পেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আর এখানে আসার পর পুলিশ রিকশার চাকার পাম্প ছেড়ে দিয়েছে।


এ সময় তিনি বলেন, ‘এখন কি আমি মিটফোর্ডে হেঁটে গিয়ে অফিস করবো বলেন?’ এক পর্যায়ে অবশ্য পুলিশ ব্যাংকার ও চিকিৎসকদের কর্মস্থলে রিকশা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন।


পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে জরুরি সেবায় নিয়োজিতদেরকেও হেনস্তা করছে বলে অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই চিকিৎসক।


দেশজুড়ে করোনা পরিস্থির মোকাবেলায় সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধের নির্দেশ দেয়। তাই যে যেভাবে পারে সেভাবেই তাদের কর্মস্থলে যাচ্ছে।


এ বিষয়ে জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমান বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা করে ব্যাংকারদের জন্য সীমিত আকারে পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা উচিৎ।


জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার রেজা ফরহাদ বলেন, সকলের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, রাস্তায় রিক্সা নেই, গণপরিবহন বন্ধ, পথের মধ্যে পুলিশের বিড়ম্বনা, আইডি কার্ড দেখালেও যেতে দিচ্ছে না। তবুও আমরা এই ক্রান্তিকালে সরকারের নির্দেশনামত জনগণের সেবা করে যাচ্ছি।


রাজধানীর হাতিরপুল অগ্রণী ব্যাংকের অফিসার তাজিন সামছু এশা। তিনি বিবার্তাকে বলেন, ব্যাংক সীমিত আকারে খোলা রাখার কথা থাকলেও প্রতিদিনই ফুল ডিউটি করতে হচ্ছে। তবে ব্যাংকে যাওয়ার সময় রাস্তায় পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।


তার এক সহকর্মীর ঘটনার কথা বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আমার এক সহকর্মী রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বাসা থেকে হাতিরপুল এলাকায় অফিসে আসেন। কিন্তু গতকাল অর্ধেক রাস্তায় আসার পর পুলিশ তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে দিয়েছে। এ সময় ব্যাংকার পরিচয় ও কার্ড দেখালেও রক্ষা হয়নি তার। পরবর্তীতে বাকি রাস্তা তিনি হেঁটে হেঁটে আসেন। ব্যাংকে এসে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তবে এভাবে হয়রানি না করার জন্য শ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।


ব্যাংকের গ্রাহকরা মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখেন না জানিয়ে তিনি বলেন, হাতিরপুল এলাকায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা লেনদেন করেন না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ব্যাংকে না গেলেও অপ্রয়োজনীয় লোকজনের পদাচারণা অনেক বেশি। ওইসব লোকজন ব্যাংকে ভিড় করেন। কেউই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখেন না। এমনকি গ্রাহকরা মাস্কও পরেন না। তাই ব্যাংকে কর্মরত সবাই আতঙ্কে থাকেন।


স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের সাধারণ সম্পাদক (সোনালী ব্যাংক) মোজ্জাম্মেল লেলিন বিবার্তাকে বলেন, আমাদের অনেক সহকর্মী পুলিশের কাছে হয়রানির শিকার হয়েছে। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।


তিনি বলেন, ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে না। তারপরও নিজের উদ্যোগে আমরা যতটুকু সম্ভব সুরক্ষার ব্যবস্থা করে কর্মস্থলে যাচ্ছি। এরমধ্যে রাস্তায় পুলিশের হয়রানি। তবে হয়রানির বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে বলে জানান তিনি।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মফিজুর রহমান পলাশ বিবার্তা বলেন, যারা সরকারের নিষেধাজ্ঞার বাহিরে তাদের সহযোগিতা করার জন্য সবাইকে বলা হয়েছে। তবে যদি কেঊ সহযোগিতা না করে তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।


বিবার্তা/খলিল/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com