ভয়াবহ ২১ আগস্ট আজ, কী ঘটেছিল সেদিন
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৪৬
ভয়াবহ ২১ আগস্ট আজ, কী ঘটেছিল সেদিন
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

ভয়াবহ ২১ আগস্ট আজ। দিনটি ছিল শনিবার। এদিন বিকেলে ছিল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাজার হাজার মানুষের স্রোত ছিল সমাবেশে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের এ সমাবেশ মহাসমাবেশে রূপ নেয় সেদিন।


সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসীবিরোধী মিছিল নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে যাওয়ার কথা। তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জ চেপে বিকেল ৫টার একটু আগে সমাবেশস্থলে পৌঁছান বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন।


বিকাল ৫টা ২২ মিনিট। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগুতে থাকলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। মুহূর্তেই শুরু হলো নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড।


বঙ্গবন্ধু এভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে খই ফোটার মতো একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় ঘাতকরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৩টি গ্রেনেড হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। রক্তগঙ্গা বইয়ে যায় এলাকাজুড়ে। ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল শেখ হাসিনা।


পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে ট্রাকে অবস্থানরত নেতারা ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মানবঢাল রচনা করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে। নেতা ও দেহরক্ষীদের আত্মত্যাগ ও পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে মৃত্যুজাল ছিন্ন করে সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


ভয়ঙ্কর সেদিনের বর্ণনা করেন তৎকালীন কোতোয়ালি থানা মহিলা লীগের সম্পাদক রুমা। তিনি বলেন, আমরা সেদিন সাঈদ খোকনের সঙ্গে সমাবেশ স্থলে যাই। দুপুর দেড়টার দিকে আমরা বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে পৌঁছাই। সমাবেশ স্থলে ট্রাকের পশ্চিম পার্শ্বে আইভী আন্টির সঙ্গে ছিলাম।


রুমা বলেন, দাড়িওয়ালা একটা ছেলেকে দেখে আন্টিকে বললাম ছেলেটি মহিলাদের দিকে কেন? ছেলেটি আমাদের পাশের মার্কেটের দিকে ইশারা করল। আমরা দুজনে সেদিকে তাকালাম। এর মধ্যে ছেলেটি আমার বামদিক দিয়ে চলে গেছে। এ সময় আমি মাত্র ডান পা টা বাড়িয়েছি। তখনই প্রথম বিস্ফোরণটা হয়। পরে রাস্তায় পড়ে যাই। তখন আর জ্ঞান ছিল না।


হঠাৎ শুনতে পাই হইচই, কান্নাকাটি। ট্রাক খালি দেখতে পাই। একটা সময় পানি পানি করে চিৎকার করতে করতে আবার জ্ঞান হারাই। শুনেছি পরে কয়েকজন মিলে আমায় ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যান। সেখানে নাকি আমাকে মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়।


গ্রেনেডের আঘাতে পরাস্ত করতে না পেরে ওইদিন শেখ হাসিনার গাড়িতে ঘাতকরা ছুড়েছিল বৃষ্টির মতো গুলি। একেবারে পরিকল্পিত ও টার্গেট করা ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত গুলি ভেদ করতে পারেনি শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাচ। শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ।


তিনি বলেন, পরিকল্পিত হামলায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে শেখ হাসিনা ফিরে এলেও ওইদিন গ্রেনেড হামলার পর সেদিন স্পিলিন্টারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যান শত শত মানুষ। আকস্মিক মৃত্যু আর রক্তস্রোতে লণ্ডভণ্ড শান্তিপ্রিয় অসংখ্য মানুষের হাত-পাসহ মানবদেহের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।


কারও হাত নেই, কারও পা উড়ে গেছে। রক্তে ভিজে লাল হয়ে যায় পিচঢালা কালো পথ। অস্থায়ী সভামঞ্চ ট্রাকের চারপাশে রক্তের অনাহূত আল্পনা, শত শত মানুষের আর্তচিৎকার। বেঁচে থাকার জন্য, প্রাণ বাঁচানোর জন্য মুমূর্ষুদের আকুতি, কাতর আর্তনাদসহ অবর্ণনীয় মর্মান্তিক সেই দৃশ্য।


নারকীয় হামলা প্রতিহতে সেই সময়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোটের পুলিশ বাহিনী। শত শত রক্তাক্ত-ছিন্নভিন্ন হওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধারের পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে চতুর্দিক থেকে টিয়ারগ্যাস ছুড়ে নির্বিঘ্নে ঘাতকদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হয়। এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করা হলেও আলামত নষ্ট করতে সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। হামলাস্থলে থাকা সব আলামত একে একে ধ্বংস করা হয়।


রুমা বলেন, শত শত আহত যেন চিকিৎসা না পায় সেজন্যও উপরের নির্দেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, তৎকালীন পিজি হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের অলিখিত নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়েছিল। হামলার পর অগণিত আহতকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে নেয়া হলেও মূল প্রবেশদ্বার বন্ধ করে রাখা হয়।


বিএনপি-জামায়াত জোট সমর্থক ড্যাবের নেতারাও চিকিৎসা দিতে গড়িমসি করে। ফলে আহত বেশিরভাগ নেতাকর্মীদের সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালসহ নানা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এমনকি লাশের ময়নাতদন্ত নিয়েও নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ঘটে।


২১ আগস্টের সেই রক্তাক্ত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। নারী নেত্রী আইভী রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট মারা যান। আহত হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ।


রক্তাক্ত-বীভৎস ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় অন্য যারা নিহত হন


শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স কর্পোরাল (অব) মাহবুবুর রহমান, মোশতাক আহমেদ সেন্টু, হাসিনা মমতাজ রিনা, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (সবার প্রিয় আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন সরদার, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।


আহত হওয়া পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর অনেকেই ঘাতক গ্রেনেডের স্পিলিন্টারের দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। হাত-পা-চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী পঙ্গুত্ববরণ করে জীবনধারণ করছে।


বিবার্তা/রবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com