দ্যা আলকেমিস্ট : একটি অসাধারণ বই
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:০৪
দ্যা আলকেমিস্ট : একটি অসাধারণ বই
আশিক হাসান
প্রিন্ট অ-অ+

কিছু সিনেমা আছে অনেক পুরোনো অথচ আমার-আপনার দেখা হয়নি অথবা এমন কোনো আকর্ষণীয় স্থান যেখানে অনেকে গেছেন কিন্তু আমার যাওয়া হয়নি অথবা অনেক ভালো একটা বই যা অনেকে পড়েছে, কিন্তু সেই বইটা হয়ত আমি বা আপনি কখনও পড়িনি।


আধ্যাত্মিক ও বাস্তব জীবনের উপলব্ধি নিয়ে লেখা ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহোর অনবদ্য সাহিত্যকর্ম 'দ্যা আলকেমিস্ট' পড়ে মনে হলো, এতদিন পর কেন বইটা আমার হাতে এলো!


বইটি অনলাইনে ইংরেজী ও বাংলা অনুবাদ দুটোই পাওয়া যায়, কিন্তু আমি অনুরোধ করব সম্ভব হলে ইংরেজী অনুবাদটা পড়বেন। কারণ, বইটির মূল অর্থ বোঝার জন্য সেটা খুব জরুরী । তাছাড়া ইংরেজী অনুবাদের ভাষা বেশ ঝরঝরে এবং খুব সহজ করে লেখা।


পাওলো কোয়েলহোর আলকেমিস্ট বইটি তার দেশ ব্রাজিলে ১৯৮৮ সালে পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সেই সময় বইটি বেস্ট সেলিং লিস্টে না থাকলেও পরবর্তীতে এটি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বোচ্চ বিক্রিত বইয়ের তালিকার মধ্যে স্থান করে নেয়। ১৯৯৩ সালে ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া এ বইটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বইটির বিক্রি ক্রমশ বেড়েই চলেছে এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুবাদ করা বইও এটিই।


আসুন, দেখা যাক বইটিতে কি আছে?


বইটি সান্টিয়াগো নামের এক মেষপালককে নিয়ে লেখা, যে কিনা তার মেষপালকে নিয়ে আশ্রয় নেয় এক ভাঙ্গা গীর্জায়। সেখান থেকেই গল্পের শুরু।


সান্টিয়াগো এক সাধারণ পরিবারের সন্তান, যার মা-বাবার শখ ছিলো ছেলে বড় হয়ে যাজক হবে। পাঠশালায় সে ইতিমধ্যে ল্যাটিন আর স্প্যানিশের পাশাপাশি ধর্মতত্ত্বও পড়ে ফেলেছে। ১৬ বছর বয়সী সান্টিয়াগো বাবাকে জানায় সে চায় বিশ্ব পরিভ্রমণ করতে। ছেলের ইচ্ছাপূরণে বাবা বাধ সাধেন না বরং ছেলেকে এগিয়ে দেন তিনটি সোনার মোহর আর বলেন মেষপাল কিনে সে যেন দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। বাবার হাত থেকে মোহর নেয়ার সময় সান্টিয়াগো বাবার চোখেও দেখতে পায় বিশ্বভ্রমণের এক অদম্য ইচ্ছার ছটা, যা তিনি গোপনে বয়ে বেড়াচ্ছেন আর যুগের পর যুগ ধরে সংসারের ঘানি টেনে যাচ্ছেন সেই স্বপ্নকে বুকের মাঝে আড়াল করে।


সান্টিয়াগো আবার ফিরে আসে বর্তমানে সেই ভাঙ্গা গীর্জার মাঝে , তার চিন্তাচেতনার মাঝে খেলা করে তার মেষপাল, যাদের শুধু ভাবনা খাবার আর পানি নিয়ে। অথচ এই জগৎ সংসারের কত বিচিত্র রহস্য আছে তার কিছুই তারা জানে না । তার মেষগুলো যেমন জানে না কেন সান্টিয়াগো এক বছর পর আবার সেই আন্দিয়ালুসাতে এসেছে , সে কি শুধু ভেড়ার উল বিক্রী করার জন্য? আসলে সান্টিয়াগো এসেছে সেই এক বছর আগে দেখা উলের দোকানের মালিকের মেয়ের সাথে দেখা করার জন্য।


এরই মাঝে সান্টিয়াগো, পিরামিডের দেশে গুপ্তধনের সংক্রান্ত একটা স্বপ্নে দেখে, যার অর্থ সে খুঁজে পায় তায়িফের এক জিপসী মহিলার কাছে এবং জানতে পারে সেই মিশরের পিরামিডে তার জন্য সত্যিকারের গুপ্তধন অপেক্ষা করছে। আন্দিয়ালুসা থেকে মিশরে যেতে হলে সান্টিয়াগোকে পাড়ি দিতে হবে বিশাল সাহারা মরুভূমি। এটা জেনেও সে হাল ছাড়ে না ।


এরপর শুরু হয় একে একে সান্টিয়াগোর জীবনে অদ্ভুত সব চরিত্রের আনাগোনা। দেখা মেলে বুড়ো রহস্যময় রাজা যে কিনা তাকে একপাল ভেড়ার বদলে দেয় দুটি অদ্ভুতদর্শন ছোট পাথর, যা কিনা তাকে যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হ্যাঁ অথবা না বলে দিতে পারবে। সেই পাথর নিয়ে এগিয়ে চলে সান্টিয়াগো এবং একে একে ঘটতে থাকে সব অদ্ভুত ঘটনা । জীবন আর স্বপ্ন পূরণের অদম্য ইচ্ছাশক্তি সান্টয়াগোকে মুখোমুখি করে জীবনে আধ্যাত্মিকতার সাথে। লেখক অসাধারণ লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন আধ্যাত্মিকতার সাথে বাস্তব জীবনের সেতুবন্ধন। প্রতিটি ঘটনার সাথে মিল রেখে প্রতিটি সংলাপে ফুটে উঠেছে জীবনের অসাধারণ সব সত্য। পাঠককে প্রতিটি ঘটনার সাথে লেখক এমনভাবে দাঁড় করিয়েছেন যেন একসময় পাঠকের মনে হবে গল্পের সান্টিয়াগো যেন পাঠক নিজেই ।


নিজের জীবনের এরকম অনেক স্বপ্ন, যা পূর জন্য আমাদের আজও সাধ জাগে কিন্তু একই সাথে ভয় করে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে যদি ব্যর্থ হই। সেই স্বপ্নের কথা বইতে ফুটে উঠেছে ঠিক এভাবে;


"If a person is living out his destiny, he
knows everything he needs to know.
There is only one thing that makes a
dream impossible to achieve: the fear
of failure."


অথবা


Tell your heart that the fear of
suffering is worse than the suffering
itself. And that no heart has ever
suffered when it goes in search of its
dreams, because every second of the
search is a second's encounter with God
and with eternity."


অসাধারণ সব উক্তি যেন জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । ঘটনাপ্রবাহে সান্টিয়াগোর সাথে দেখা হয় চোর, ক্রিস্টাল দোকানের এক বৃদ্ধ দোকানদার, এক ইংরেজ ব‌্যক্তির সাথে। এবং গুপ্তধনের আশায় যখন সান্টিয়াগো এসে পৌঁছায় বিশাল এক মরুদ্যানে, সেখানে দেখা মেলে মরুর বেদুইন কন্যা ফাতিমার । এরপর ক্ষণিকের মোহে কিছুটা দিকভ্রান্ত হলেও ফাতিমা কথা দেয় অন্যান্য আরব কন্যার মত সেও প্রতীক্ষায় থাকবে সান্টিয়াগোর জন্য। যে স্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে ফাতিমা চায়না তাদের ভালোবাসা সান্টিয়াগোর সে স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সান্টিয়াগো যখন বলে ;


"I'll be back," the boy said.


"Before this, I always looked to the
desert with longing," said Fatima.
"Now it will be with hope. My father
went away one day, but he returned to
my mother and he has always come
back since then."


এরপর বিদায় নেয়ার সময় সান্টিয়াগো দেখে ফাতিমা কাঁদছে, জবাবে ফাতিমা বলে
"I'm a woman of the desert," she said,
averting her face. "But above all, I'm a
woman."



এভাবেই একসময় দেখা মেলে সান্টিয়াগোর সাথে এই গল্পের এক অসাধারণ রহস্যময় চরিত্র এক আলকেমিস্ট বা রসায়নবিদের সাথে। ঘোড়ায় চড়ে হাতে একটা বাজপাখি নিয়ে হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে সেই রহস্যময় আলকেমিস্টের। যদিও গল্পের নাম আলকেমিস্ট রাখার ব্যাপারে হয়ত তার চরিত্রের প্রভাব সান্টিয়াগোর উপর বেশিমাত্রায় ছিল বলে হতে পারে। তবে আলকেমিস্টের সাথে সান্টিয়াগোর কথোপকথনে যেসব আধ্যাত্মিকতাবাদ ফুটে উঠেছে তা এক কথায় অসাধারণ।


"when each day is the
same as the next, it's because people
fail to recognize the good things that
happen in their lives every day that the
sun rises."


"The sea has lived on in this shell,
because that's its destiny. And it will
never cease doing so until the desert is
once again covered by water."


"When someone makes a decision, he is really diving into a strong current that will carry him to places he has never dreamed of when he first made the decision."


"If a person is living out his destiny, he
knows everything he needs to know.
There is only one thing that makes a
dream impossible to achieve: the fear
of failure."


একসময় গল্পের শেষপ্রান্তে আলকেমিস্ট বিদায় নেয়। এরপর শুরু হয় সান্টিয়াগোর স্বপ্ন পূরণের জন্য শেষ তিন ঘণ্টার যাত্রা , সে প্রতিমূহূর্তে আশা করে সামনের বালিয়াড়ি পেরুলেই সে তার স্বপ্নের পিরামিডের দেখা পাবে তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত গুপ্তধন।


প্রিয় পাঠক, বাকিটা আপনাদের পড়ার পালা। তবে গল্পের শেষ চমক লেখক সেই শেষ তিন ঘণ্টার মধ্যই রেখেছেন, যা কিনা পাঠককে বাধ্য করবে গল্পের শেষ না দেখা পর্যন্ত ।


আলকেমিস্ট বইটা আপনাকে শুধু একটি গল্প হিসেবে নয় বরং জীবনের আধ্যাত্মিকতাবাদ যে বাস্তবজীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি তা অনুধাবন করতে সাহায্য করবে। নিজের স্বপ্ন যা এখনও বাস্তবে রুপ দিতে পারেননি সেই স্বপ্ন পূ্রণে আপনাকে করবে উজ্জীবিত। এই মোটিভেশনাল বিষয়টি দারুণভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। সবকিছু মিলিয়ে শুধু একটি কথাই আবার বলব "অসাধারণ"।


নোট : গুগলে দ্যা আলকেমিস্ট পিডিএফ লিখে সার্চ করলেই বাংলা এবং ইংরেজি দুটোর অনুবাদই পাবেন।


বিবার্তা/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com