ঈদের অনু গল্প
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৮, ১৭:১২
ঈদের অনু গল্প
বাকী বিল্লাহ বিকুল
প্রিন্ট অ-অ+

বাপের সঙ্গতি না থাকায় তফিলের লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি। ভাইবোন অনেক। অনটনের সংসার। প্রাইমারি পর্ব শেষ করেই তফিল রাজশাহী শহরে চলে যায় প্রতিবেশী এক চাচার হাত ধরে। ওখানে স্থানীয় এক লজেন্স ফ্যাক্টরিতে কাজ জুটিয়ে দেয় চাচা।


কাজ হলো কাঁচা লজেন্সের গায়ে নানা রঙের মোড়ক মুড়িয়ে দেয়া। গ্রামের ছেলেপেলের বাড়তি বুদ্ধি থাকে, বেড়ে ওঠে আত্মনির্ভরশীলতায়। পোড়খাওয়া জীবন, পায়ের তলায় জন্মের শুরুতেই সে কারণে শুকনো এটেল মাটি নিয়ে জন্মায়। ফ্যাক্টরিতে নানা শ্রেণিবয়সের মানুষের সঙ্গে বসবাস। নানা অভিজ্ঞতা। তফিলের দাঁড়িগোফ সেভ করার বয়স শুরু হয়েছে। তার শরীরের গঠন রাবনের মতো। সময় গড়িয়ে সে এখন পুরোদস্তুর আয়-রোজগার করে একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।


প্রবাহিত সময়ের ভেতরে বড় ভাইরা যার যার সংসারে ব্যস্ত, আদরের বোনেরা চলে গেছে বহুদূর দূরান্তের সংসারে। হুহু করে কেঁদে ওঠে প্রাণ। বাবার অকাল মৃত্যু হয়েছে। নিজে ভীষণ কষ্টে থাকলেও বাবার সংসারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়নি জীবন। মা সুরতী এখনো বেঁচে আছে। মায়ের সংসারে বড় বোনের এক বিধবা কন্যা এসে থাকে। অন্যসব ভাইয়েরা যতটুকু খোঁজখবর নেবার ততটুকুই নেয়, কার্যত মা এখন অসহায়।


তফিল বছরের প্রতিটি অনুষ্ঠানাদিতে বাড়িতে নিয়মিত আসে। বয়সতো কম হলো নারে তফিল! তয় কি? বিয়েশাদী করবিনে বাপ, কবে মরে যাবো। বুকের মধ্যি ধপ করে ওঠে। কমশিক্ষিত হলেও তফিল বেশ সমাজ সচেতন। তাছাড়া রাজশাহীতে কামরুজ্জামান সাহেব নামের এক মহান রাজনীতিকের সঙ্গে তার নাকি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সময় পেলেই নাকি তফিল তাঁর পার্টি অফিসে যায়, বক্তব্য শোনে। তফিলকে তিনি পদ্মার পাড়ে একটু জায়গা করে দিয়েছেন থাকার ও ছোট লজেন্স কারখানা গড়ার জন্যে। জীবনে স্বস্তি এসেছে, পরাধীনতার শেকল গেছে খসে। ভালোভাবেই কেটে যায় দিন।


পদ্মা আবাসিক এলাকায় তারেক নামে তফিলের এক বন্ধু আছে, দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের মতো স্বশিক্ষিত। তার জ্ঞানে মুগ্ধ তফিল। প্রতিদিন বিকেল হলেই তাদের আড্ডা শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে, বিশেষত বরেন্দ্র মিউজিয়ামের সামনে। সময় গড়িয়ে যায়, একসময় বন্ধু তারেকের অনুরোধেই তার সুন্দরী বোন বেনুর সঙ্গে তফিলের বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু বন্ধুর কাছে একটা আবদার থাকে, তার বোনকে থাকতে হবে গ্রামের বাড়ি মায়ের কাছে। আর তাছাড়া রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া শহর বেশি দূর তো নয়। এ নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি।


পরমানন্দে দিন অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে তফিল সংসারের। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। এদিকে জাতীয় নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে, তফিল এখন বেশ একটা ছোটখাট সমাজসচেতন ব্যক্তি, পরোপকারী ব্যক্তি হিসেবেও তার নামযশ ছড়িয়ে পড়েছে। তার চিন্তার শেষ নেই কী হবে এবারের নির্বাচনে? নানাবিধ চিন্তা। এসব বিষয়ে বেনুর বিরক্তি না থাকলেও, এতিদিন পর বাড়িতে এসে তফিল প্রতিদিনই এসব নিয়ে নানা গল্প শোনায়। প্রতিটি রাতই এভাবে কেটে যাচ্ছে, তারপর যায় ঘুমিয়ে। পুরোদস্তুর রোমান্টিক পুরুষ ডুবে গেছে দেশচিন্তায়।


আজ আর বেনু এসব গল্প শুনতে চায় না, তার মন নেই। তফিল কয়েকবার মনোনিবেশ করবার চেষ্টা করলেও সে তার মন পায় না। প্রচুর ঘুম পাচ্ছে আমার, আজ আর তোমার গল্প শুনব না। শুনসান নীরবতা। দুজনেই চোখ বন্ধ করে ঘুমুতে চেষ্টা করে। ঘুম তৈরির চেষ্টা চলছে। দুজনই ব্যর্থ হচ্ছে, অথচ কেউ কাউকে বুঝতে দেয় না। পাশ ফিরতেই দুজনের খোলা চোখে চোখ পড়ে। হাসিতে ফেটে পড়ে বেনু। তার হাসিতে যেনো সমস্ত ঘরে নক্ষত্রের আলো ছড়ায়, গড়াইয়ের বুকে নেমে আসে পদ্মার স্রোতধারা, আর সুবাসিত হয় আলো মাটি দিয়ে লেপা ঘরখানি কাঁঠালচাপার গন্ধে।


বিবার্তা/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com