‘রেভ্যুলুশন’: জ্যঁ মারি গুস্তাভ লে ক্লেজিওর এক কীর্তি উপন্যাস
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৮, ১৭:৩৯
‘রেভ্যুলুশন’: জ্যঁ মারি গুস্তাভ লে ক্লেজিওর এক কীর্তি উপন্যাস
সাব্বির খান
প্রিন্ট অ-অ+

“একই সাথে একরাশ সুখোপোলব্ধি ও নিদারুন যন্ত্রনা, কিছু অশোধিত বিষয়, যা নিজের মতো করেই বেঁচে থাকে, শাসনহীনভাবে বিস্তৃত- অথবা সংকুচিত হয়”


সময় ও স্মৃতির জ্বালে আবিষ্ট একজন মানুষ, যার নাম এবং পরিচয় স্মরন করিয়ে দেন লেখক নিজেই, যিনি খুঁজে ফেরেন নিজের শিকড়ের ঠিকানা, সবকিছুর অর্থ আর একরাশ শূণ্যতা থেকে বাঁচার উপায়। যিনি উৎসাহী হন এক অন্ধ ফুপুর দ্বারা, যিনি গল্পের ছলে বর্ননা করেন পুরুষানুক্রমে সেই রূপকথার মত মাউরিতিউস দ্বীপের প্রবাহমান আদিকথার। সন্দেহাতীতভাবে নোবেল বিজয়ী জ্যঁ মারি গুস্তাভ লে ক্লেজিওর লেখা উপন্যাস “রেভ্যুলুশন” লেখকের সবচেয়ে সফল এবং মনে রাখার মতো সফল এক কীর্তি।


৬৭ বছর বয়স্ক ফরাসী লেখক জ্যঁ মারি গুস্তাভ লে ক্লেজিও তাঁর শেষের দিকের লেখা উপন্যাসগুলোতে সবচেয়ে বেশিভাবে সমাগম ঘটিয়েছেন বা সহযোগীতা নিয়েছেন তার নিজের জীবন এবং ইতিহাসের বিভিন্ন কর্তিতাংশ থেকে। সেই সাথে লেখকের স্মৃতির জমিন থেকে উঠে আসা কোন একক বা বহুধা চরিত্রগুলো- যারা জায়গা করে নিয়েছে উপন্যাসের প্রধান চরিত্ররূপে। প্রশ্ন স্বভাবতই জাগে, ‘স্মৃতি আসলে মনুষ্যজীবনে কি অর্থ বয়ে আনে?” লে ক্লেজিও এই প্রশ্নের উত্তর তার উপন্যাস “রেভ্যুলুশঁ”-এ (২০০৩) এই ভাবে দিয়েছেন, “একই সাথে একরাশ সুখোপোলব্ধি ও নিদারুন যন্ত্রনা, কিছু অশোধিত বিষয়-যা নিজের মতো করেই বেঁচে থাকে, যা শাসনহীনভাবে বিস্তীর্ণ অথবা সংকুচিত হয়”।


উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জ্যঁ ম্যারো (Jean Marro), একজন অল্প বয়স্ক যুবক, যে স্মৃতির বিশাল পর্দায় একরাশ আনন্দ আর বেদনা মাখানো চোখে বিরামহীনভাবে খুঁজে ফেরে তার নিজ জীবনের ইতিহাস আর আদি পুরুষের শেকড়। এই অবিরাম অন্বেষণ মনে করিয়ে দেয় উপন্যাসের লেখক লে ক্লেজিও নিজেকেই। ১৯৬০ এর দশকে জ্যঁ মারো তার নিজের শহর নিস-এ বার বার ফিরে এসেছেন তার ফুপু ক্যাথরিনের সান্নিধ্য পাওয়ার লোভে। বারবার শুনতে চেয়েছেন ফুপুর মনোমুগ্ধকর আর বাঁধহীন কল্পনায় উদ্দীপিত রূপকথার দ্বীপ মাউরিতিউসে (Mauritius) তার ছেলেবেলা থেকে বেড়ে ওঠার সেই দিনগুলোর উপাখ্যানের কথা। মাউরিতিউস দ্বীপটি যেন একটা প্রতীকের মতো, যা জ্যঁ মারি গুস্তাভ লে ক্লেজিওর পূর্বেকার লেখা বিভিন্ন উপন্যাসেও বার বার ঘুরেফিরে এসেছে। মাউরিতিউস দ্বীপটা লেখকের লেখনিতে বার বার ফিরে এসেছে যেন এক হারিয়ে যাওয়া স্বর্গরূপে।


একদা এই স্বর্গীয় দ্বীপটি থেকে ফুপু ক্যাথরিন ও তার পরিবারের সবাইকে প্রচণ্ড নৃশংসভাবে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। সেই সময়ের সেই বর্বরোচিত বিতাড়নের কথা আজো ক্যাথরিনের মনে জাগরুক এক দগদগে ঘাঁ-য়ের মতো, যা আজো শুকায়নি। যে লোমহর্ষক স্মৃতি তিনি আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন একাকী। কিন্তু ফুপুর বর্ণিত ঘটনাগুলো জ্যঁ মারোর মনে দাগ কেটেছিল অন্যভাবে। জীবনের অস্তিত্বের উপস্থিতিতেও যেন বেদনাদায়ক এক শূন্যতায় নিমজ্জিত এক স্বত্ত্বা তার। মন যেন বার বার ছুটে যায় সেই রহস্যাবৃত দ্বীপটিতে, যেখানে লুকিয়ে আছে তার আদি পুরুষের অজানা কত কথা! এই প্রবনতা ক্রমশ রূপ নিয়েছে অনারোগ্য এক ব্যাধিতে।


জ্যঁ মারোর জীবনের বিরাট একটা অংশ জুড়ে ছিল অপূরনীয় এক শূণ্যতায়। ক্যাথরিনের বর্নিত আদি পুরুষেরই অজানা কাহিনী স্বভাবতই ক্রমে শেকড় গেড়ে বসতে লাগলো তার স্মৃতির সেই শূন্য জায়গাগুলো জুড়ে। স্মৃতির শূণ্য পাত্রগুলো যেন একে একে ভরে উঠতে লাগলো অজানা কতো ঘটনায়। পূর্ণতা পেতে লাগলো ছিন্ন ভিন্ন স্মৃতির সেই জালটি। “অন্ধ ক্যাথরিন তার অন্তহীন স্মৃতির খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে একের পর এক ঘটনার কথা যখন বর্ননা করে যান, যেন সেই সাথে তিনি নিজেও তার বর্তমানটাকে ভরিয়ে তোলেন হারিয়ে যাওয়া সেই স্বর্গীয় দ্বীপের শব্দে, গন্ধে আর রঙে। ক্যাথরিন চোখ বন্ধ করে অনুভব করেন তার নিজের ছোটবেলা। তিনি নিজের সাথে নিজেই বলার মতো করে খুব ধীরে আস্তে আত্নবিশ্বাসের সাথে কথা বলছিলেন, যা জ্যঁকে খুব অবাক করেছিলো। যেন অধঃপতিত একটা ঘর, সবকিছু থেকে যোজন যোজন দূরে, যেন সেই পাপাচ্ছন্ন, নিস্পৃহ সেই শহরের মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে। ক্যাথরিনের জীর্ণ-ক্লান্ত, কুঁচকানো দেহের খোলোসটি যেন এক তরতাজা মেঘের দল, তার উত্তেজনায়পূর্ন বয়ঃবৃদ্ধ রমণী দেহটি যেন অদৃশ্য এক তেজস্বিনীর অবয়ব”।


স্মৃতির ব্যাপ্তিতা ছিল সময়ের মাপে অনেক পেছনে ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে যখন ব্রেটাঞ্জের (Bre¬tagne) পূর্বপূরুষ জ্যঁ এউদেস (Jean Eudes) অংশ নিয়েছিলেন ফ্রান্স রেভ্যুল্যুশনে এবং তারপর যখন তিনি তার প্রেয়সীকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন “পৃথিবীর শেষপ্রন্তে”। এউদেসের বিমুগ্ধকর গল্প সমান্তরালভাবে প্রসারিত হয় জ্যঁ মারোসের গল্পের সাথে। পাশাপাশি জায়গা করে নেয় অন্যান্য ঘটনাগুলোও, যেমন দাসব্যাবসা এবং মাউরিতিউসে ১৮২২ সালের ক্রীতদাসদের বিদ্রোহের কথা ইত্যাদি।


যুদ্ধ ও সংঘাত একটা নৈমত্তিক ধারায় স্থান পেয়েছে এই অতীতকালীন উপাদেয় বর্ণনায়, কিন্তু সেগুলোর প্রবেশ ঘটেছে এমনকি জ্যঁ-র বাস্তব জগতেও। জ্যঁ-র সময়কালটা ছিল নিস শহরে, ঠিক দক্ষিন ফ্রান্সের অন্যান্য এলাকাগুলোর মত এখানেও ‘বর্নবাদীতা’র ভারে পরিবেশ হয়েছিল ভারী এবং আলজেরিয়-যুদ্ধের ভয়ংকরতা স্পষ্টতই ছাপ ফেলে যাচ্ছিল জ্যঁ-র প্রজন্মের উপরে। আলজেরিয়া যুদ্ধের ইতিহাস লেখনীর মাধ্যমে জ্যঁ মারি গুস্তাভ লে ক্লেজিও ফ্রান্সের আধুনীক ইতিহাসের পীড়াদায়ক এক অধ্যায়ের প্রতি স্পষ্টতঃই আঙ্গুলী তুলেছেন, যা বিস্ময়করভাবে ফ্রান্স সাহিত্যে একেবারেই অনুপস্থিত।


জীবনের একটা সঠিক অর্থ খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে জ্যঁ প্রথমতঃ চলে যান লন্ডনে। সেখানে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা নেন। সেখানে তিনি খুঁজে পান এবং সংস্পর্শে আসেন “পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা অনেক শিকড়ে”র সাথে। এরপর তিনি যান কিছুদিনের জন্য মেক্সিকোতে। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো সিটির ‘টেলাটেলোলকো স্কয়ারে’ বিশ্ব অলিম্পিকের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে অযাচিত এক সাক্ষী হয়ে যান ছাত্র-বিক্ষোভের ঘটনার।


বাস্তবতা যখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন, বিচ্ছিন্ন শব্দগুলো যখন সেখানে অযাচিত যায়গা করে নিতে ব্যাস্ত; ঠিক তখনি পারমেনিডেস, হেরাকলেইটোস এবং সক্রেটিসের পূর্ববর্তী অন্যান্য দার্শনীকদের প্রাজ্ঞতা ভরিয়ে তোলে জ্যঁ-ও তাঁর লেখনীকে। সজ্ঞ্যানে জ্যঁ উচ্চারনে দ্বিধা করেন না প্যারমেনিডেসের কবিতার একটি লাইন-“একই সাথে সবকিছু আলো এবং নিকশ কালোতে ভরা”। এবং জ্যঁ তার আভ্যন্তরীন তথা মানসিক শুণ্যতা থেকে পরিত্রাণ পান একমাত্র এক আলোকিত নিস্কন্টক প্রেমের মধ্য দিয়ে!


লে ক্লেজিওর অন্যান্য বইয়ের সাথে “রেভ্যুলুশঁ”-এর পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় তার দার্শনিক ভাবনার স্পষ্টতার মধ্য দিয়ে। এই বইয়ে ফুটে উঠেছে সক্রেটিসপূর্ব দার্শনিকদের “অতীত এবং বর্তমানে মনুষ্য অস্তিত্ব”-বিষয়ক দর্শনের প্রাঞ্জল উপস্থিতি। বিষন্নতা এবং অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে তিনি লিখেছেন, সময়ের সাথে মানুষের সংশ্রবের কথা এবং পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকার জন্য নাজুক পারিপার্শ্বিকতার কথা।


“রেভ্যুলুশন” সন্দেহাতীতভাবে লে ক্লেজিও-র লেখকজীবনের সবচেয়ে সার্থক লেখা, যাকে এক কথায় বলা যায়, তাঁর সবচেয়ে “মহৎ রচনা”!


লেখক : সাংবাদিক


বিবার্তা/মৌসুমী


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com