বিপ্লব সাইফুলের পাঁচটি কবিতা
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:৩১
বিপ্লব সাইফুলের পাঁচটি কবিতা
বিপ্লব সাইফুল
প্রিন্ট অ-অ+

আত্মকেন্দ্রিকতা



তোমার আত্মকেন্দ্রিকতার কথা কাউকে বলিনি
ফুলের কাছে বলেছি এইসব নিজস্বতা নিয়ে
যেন ভুলে যাও হরপ্পার মতো ছিলো যে অতীত


তোমাকে বলিনি
পাখিকে বলেছি খুব সুখী হও
তুমি খুব সুখী হবে এই ভেবে রোদ আর বৃষ্টির কাছে
বলেছি তোমার কাঁঠালচাঁপা দিনে তারা আছড়ে পরুক


তোমার আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ে আক্ষেপ করিনি
ঘুঘুর ডাকের মতো উদাস হলে দুপুর
কামনা করেছি তুমি তখনো ব্যস্ত থাকো
শিকারী চিলের থাবা থেকে আগলে রাখো
তোমার কালো মুরগির ছোট ছোট শিশুগুলিকে


মানুষ আত্মকেন্দ্রিক না হলে
পৃথিবী তাকে দুঃখী করে দেয়
তুমি সুখী হবে বলে আমি ফড়িং ও দোয়েলের কাছে
পৃথিবীর কাছে বলেছি
তুমি যেন আত্মকেন্দ্রিকতার বাইরে না যাও


তুমি সুখী হবে বলে আমিও আজ
নিজস্ব বেদনা নিয়ে এতোটাই আত্মকেন্দ্রিক যে
রাতের বালিশও জানে না--
আমার বেদনাহত শুকিয়ে যাওয়া নদীর গল্প!




মূলত কবিতা লিখতে আসিনি



মূলত কবিতা লিখতে আসিনি
বলতে এসেছি রুটির কথা, ভাতের কথা
বলেছি লাবণ্যহীন যত পাতা ঝরা দিনের কথা


বলেছি এবং বলছি কাস্তে ও ঘামের কথা
গত বসন্তে যে মেয়েটা ফাঁসি দিল
কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার অপারগতায়
আমি তারও কথা বলেছি, বলতে এসেছি-
সেই পিতার নির্বাক দিনলিপির কথা


মূলত কবিতা লিখতে আসিনি
বলতে এসেছি শাসকের ধারালো বল্লমে-
বিপ্লবীরা কিভাবে মরে যায়, বলতে এসেছি
কাদের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র কারাগার বানায়


বলেছি, বলতে এসেছি কাদের শ্রমে
কাদের গড়ে ওঠে প্রাসাদ
কাদের অন্ধ রেখে কারা জ্বালায় ঝাড়বাতি আলো
বলছি, বলে রাখা ভালো
সময় এসেছে কাদের বিপক্ষে মশাল জ্বালাবার


মূলত কবিতা লিখতে আসিনি
বলতে এসেছি ক্ষমতা কোন ছাড়
ভুখা পাকস্থলী জানে আমূল রাষ্ট্রকেই গিলে ফেলবার!



নুরবালা



নুরজাহানের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিলটানবাজারে
টানবাজারের পতিতাপল্লিটা এখন আর নেই
তবুও একদিন নুরজাহানের টানে টানবাজারে যাই
সেও বহুবছর আগের কথা
ওর সাথে যেদিন আমার শেষ দেখা হয়
সেদিন সে আর কাউকে তার খুপরিতে ঢুকতে দেয় নি
দুই বছরের শিশুর মুখ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলো ফর্সা মাই
শিশুটাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলো খালা নামের জোকের কাছে
যে রোজ রোজ নুরজাহানের রক্ত চুষে খেতো


সেদিন আমি বাংলা মদের সাথে নুরজাহানের দেয়া পান চিবাতে চিবাতে-
আমাদের স্কুল জীবনের কথা বলছিলাম ওকে
অংক স্যারের কাছে আমার মার খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে-
নুরজাহান হাসতে হাসতে কেমন স্তব্ধ হয়ে যায় হঠাৎ
আমি তখন নিজের অজান্তেই ওকে স্কুল জীবনের মতো
নুরবালা বলে ডেকে উঠলে
আমার নুরবালা তখন তীর বিদ্ধ হরিণী!
আমার নেশায় লাল হওয়া চোখের ভেতর তখন
খয়েরী ইউনিফর্ম, দুইবেণি-- স্বপ্নচোখ--
বেনোজলের মতো ভেসে আসে
আমি তখন বলি, চল নুরী, নুরবালা পালাই
নুরজাহান তখন পুনরায় হাসে
ওর হাসিতে ভেঙে পড়ে যেনো গোটা পৃথিবী
আমি বোকা বালকের মতো ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে
নুরী বলে, জীবন আমাকে বেঁধে ফেলেছে
এই আট ফিট্ বাই দশ ফিটে্


আমার নুরবালা কিভাবে টানবাজারের বাসিন্দা হলো
তা ওকে জিজ্ঞেস করে বিব্রত করতে চাইনি
বাংলাদেশের হাজার নুরজাহানের মতো--
আমার নুরবালার গল্পটাও অজানাই থাকলো না হয়


নুরজাহানের সাথে শেষ দেখা হওয়ার পর
এই এতোগুলি বছর কেবল অনুশোচনার--
চিতা জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে চলছি মনোঘর


আহা নুরবালা কেনসেদিন বুঝিনি সেই স্বপ্নচোখ!



মুখোশের প্রয়োজনীয়তা



প্রতিটা মানুষেরই একটা মুখোশ আছে
একটা মুখোশ থাকা খুব জরুরি
মুখোশ না থাকলে আমরা মানুষেরা
খুব বেশিক্ষণ মানুষ থাকতে পারতাম না


মুখোশ না থাকলে মানুষের পৃথিবীতে
কোনোদিন সুখের রোদ উঠত না
মমতার গাঢ় সর জমতো না
আমরা মাকে মা বলে চিহ্নিত করতে পারতাম না
বাবাকে ডাকতে পারতাম না আদর নামে


মানুষের একটা মুখোশ থাকা অতি দরকারী
তা না হলে পৃথিবীতে
রচিত হতো না কোনো ভালোবাসার কবিতা
কেবল তাল তাল মাংসের কুৎসিত ঢেউয়ে--
ভেসে যেতে রাতের নদী


এইযে হলুদ বিকেল শেষে খুলে বসি সন্ধ্যার অপেরা
একে অপরকে বন্ধু নামে ডাকি
মুখোশ না থাকলে কেবল শানিত হতো বল্লম
বন্ধুকে কাপ থেকে পিরিচে ঢেলে দিতাম না--
অর্ধেক চা


মূলত মুখোশ না থাকলে
মানুষের পৃথিবীতে কোনো ঈশ্বরই থাকত না!



শপথ



আসুন আমরা একটা শপথের মধ্যে দিয়ে যাই
পৃথিবীর সমস্ত মারণাস্ত্রগুলি অকেজো করে
সমুদ্রের নীল তুলে দেবো শিশুর চোখে
মেকাও পাখির পালকের মতো, প্রজাপতির মতো
এক একটি দিনের জন্য
তুলে রাখবো যাবতীয় চুম্বন, রক্তের উষ্ণ হোলি


প্রেম সেই পূর্ণ আর একমাত্র বিপ্লব
যা দিয়ে ভেঙে ফেলা যায় অলৌকিক বাণিজ্য


আসুন আমরা একটা শপথের মধ্যে দিয়ে যাই
পৃথিবীর সমস্ত কাঁটাতারের বিপক্ষে
সংগঠিত আমাদের ভালোবাসা, আমাদের--
প্রতিটি মুহূর্ত এমনকি মুগ্ধতাও মশাল


আমরা একটা শপথের মধ্যে দিয়ে যাই এবং বলি
হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মারণাস্ত্র নেই
আর আমরা এই অস্ত্র তাক করি--
প্রতিটি শোষকের কপালে


পৃথিবীতে বিপ্লবের প্রয়োজন শেষ হলে
আমরা খুলে ফেলব পোশাক
পাড় হয়ে যাবো আমলকী বন, চাঁদের পাহাড়
আমরা উদযাপন করবো
আমাদের জমে থাকা যতো বকেয়া উৎসব।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com