তারেক মাসুদের ১১তম প্রয়াণ দিবস ও চলচ্চিত্রযাত্রা
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২২, ০৮:২৫
তারেক মাসুদের ১১তম প্রয়াণ দিবস ও চলচ্চিত্রযাত্রা
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

তারেক মাসুদ বাংলাদেশি স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার। মাটির ময়না (২০০২) তার প্রথম ফিচার চলচ্চিত্র যার জন্য তিনি ২০০২-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং এটি প্রথম বাংলাদেশি বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশী নিবেদন করা হয়েছিল।


তারেক মাসুদ ১৯৫৬ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ ও বাবার নাম মশিউর রহমান মাসুদ। ভাঙ্গা ঈদগা মাদ্রাসায় প্রথম পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পর তিনি ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এরপর আইএ পাশ করেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে। গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রথমে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হলেও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের প্রথম প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে গিয়ে তার আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা হয়ে ওঠেনি।


১৯৮২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করে তিনি তার প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এটি নির্মাণ করতে লেগেছিল সাত বছর। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আদম সুরত প্রামাণ্যচিত্রটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশী শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের উপর। এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি, অ্যানিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি ভ্রাম্যমাণ গানের দলকে নিয়ে মুক্তির গান। ১৯৭১ সালে মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ক্যামেরাবন্দী ফুটেজের সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংরক্ষণাগার থেকে নেয়া ফুটেজ জুড়ে দিয়ে এই ছবিটি নির্মাণ করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটির জন্য তিনি ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার লাভ করেন।


২০০২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাটির ময়না মুক্তি পায়। ছবিটি তার শৈশবে মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত। ছবিটি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং মাসুদ দেশে-বিদেশে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং "একটি দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের হৃদয়স্পর্শী ও স্বচ্ছ উপস্থাপনা"র জন্য মাসুদ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট লাভ করেন। এই ছবির জন্য তিনি ২৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার লাভ করেন।


এছাড়া মারাকেচ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ক্যাথরিন মাসুদের সাথে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করেন ও গোল্ডেন স্টারের মনোনয়ন লাভ করেন এবং কেরালা চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন ক্রো ফিজেন্ট পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। এছাড়া ছবিটি বাংলাদেশ থেকে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশী নিবেদন করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় নিবেদন করা দ্বিতীয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র (প্রথমটি জাগো হুয়া সাভেরা) এবং প্রথম বাংলাদেশী বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র।


তার পরবর্তী চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রা (২০০৬) দুটি প্রজন্মকে তুলে ধরেছে, যারা বাংলাদেশ থেকে লন্ডন চলে যায় এবং পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসে। ২০১০ সালে তিনি দেশে ছড়িয়ে পরা জঙ্গিবাদ ও এর প্রভাব নিয়ে নির্মাণ করেন রানওয়ে। এতে দেখানো হয় এক যুবককে ইসলামী শিক্ষার আড়ালে জঙ্গিবাদে উদ্ধুদ্ধ করার গল্প। ছবিটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কার লাভ করেন। মাসুদের শেষ অসম্পূর্ণ কাজ কাগজের ফুল। ছবিটি ভারত বিভাগের গল্প নিয়ে। এটি মাটির ময়নার পূর্ববর্তী পর্ব।


বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতেন।


তারেক মাসুদের পরিচালিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সোনার বেড়ি (১৯৮৫)এবং সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে (২০১০)। চলচ্চিত্রে তার অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে।


চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের ১১তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর কাটাবনের পাঠক সমাবেশে গতকাল তারেক মাসুদ স্মরণ ও ‘চলচ্চিত্রযাত্রা’ গ্রন্থের পাঠ-পর্যালোচনা হয়।


সিনেমা নির্মাণে তারেক মাসুদ বেছে নিয়েছিলেন নিজস্ব দুনিয়া। বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বর্তমানময়তা তাঁর চলচ্চিত্রে হাজির ছিল সব সময়। চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি প্রতিটি বস্তুকে পাখির মতো ওপর থেকে না দেখে অনেকটা ব্যাঙের মতো নিচ থেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন। তাঁর মতো সৎ নির্মাতা বিরল।


চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের ১১তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত ‘তারেক মাসুদ স্মরণ ও চলচ্চিত্রযাত্রা গ্রন্থের পাঠ পর্যালোচনা’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন বক্তারা।


গতকাল শুক্রবার পাঠক সমাবেশের কাটাবন কেন্দ্রে মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি বেলায়াত হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, চলচ্চিত্রকার ক্যাথরিন মাসুদ, নির্মাতা প্রসূন রহমান ও মুনিরা শরমিন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘নিজের সময়কে নিজের মতো নির্মাণ করতে চেয়েছেন তারেক মাসুদ। এমন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেশ কঠিন। বাংলাদেশের শিল্পী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের দুর্দান্ত উপস্থাপকও তারেক মাসুদ। তারেককে স্মরণ করা দরকার আদতে আমাদের নিজেদের জন্যই। ’


তারেক মাসুদের লেখা ‘চলচ্চিত্রযাত্রা’ গ্রন্থের পাঠ পর্যালোচনা করতে গিয়ে মোহাম্মদ আজম আরো বলেন, তারেক মাসুদ আসলে পুরো বইয়ে নিজের আত্মজীবনী লিখেছেন। মন্ময় বা তন্ময়ভঙ্গিতে বইটি লেখেননি বটে, তবে একটা মাঝামাঝি ভঙ্গিতে লিখেছেন। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস এবং তারেক মাসুদ যে সিনেমাগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, তার একটা পরিষ্কার উল্লেখ আছে বইয়ে।


চলচ্চিত্রকার ক্যাথরিন মাসুদ বলেন, “তারেক মাসুদ চলে যাওয়ার পর আমরা মনে করেছি, বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকার চলে গেছে। তারেক নিজেকে বুদ্ধিজীবী বলত না কখনো, বলত ‘চলচ্চিত্র চিন্তাবিদ’। আসলে সে বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি নিয়ে চিন্তার চেয়ে দুশ্চিন্তা বেশি করত। সেই অর্থে তারেক ‘দুশ্চিন্তাবিদ’। নিজের লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো বই আকারে দেখতে চেয়েছিল। তারেকের চিন্তাগুলো কাউকে প্রভাবিত করবে, সে আশা করেই আমরা মৃত্যুর পর ২২টি নিবন্ধ নিয়ে প্রথমবার বইটা করি। গত বছর বর্ধিত সংস্করণে ৩৮টি নিবন্ধ নিয়ে বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।”


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com