তারুণ্যের চেতনায় একুশ
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:২৯
তারুণ্যের চেতনায় একুশ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই আমি আমার আমিকে চিরদিন-এই বাংলায় খুঁজে পাই। আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর, আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে, হেটেছি এতটা দূর, বাংলা আমার জীবনানন্দ, বাংলা প্রাণের সুখ, আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ ....


বাঙ্গালীদের ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধ জাতিকে এনে দিয়েছিল পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করে, মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আর একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতির স্বীকৃতি। পৃথিবীতে এমন ইতিহাস বিরল যে জাতিকে ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছে। প্রতিটি জাতি চায় নিজস্ব ভাষার স্বাধীনতা, প্রাণ খুলে কথা বলার অধিকার আর স্বাধীন ভূমিতে বসবাস করার স্বীকৃতি। প্রাণের ভাষা বাংলায় আজ তারা প্রকাশ করছে নিজেদের অনুভূতি। একুশের এই চেতনা বুকে ধারন করে এগিয়ে যাক নতুন প্রজন্ম।


২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও বটে। মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে পড়েছে ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে পৃথিবীর সব জাতি-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।


একুশের এই দৃঢ় চেতনা আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর একুশের চেতনা আজ একীভূত হতে চলেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে নতুন মুক্তিযুদ্ধে নেমেছে তারুণ্য। তারুণ্য আজ তার অসীম শুভশক্তি নিয়ে একীভূত হয়েছে। তারুণ্যের শুভশক্তি সেই প্রভাব পড়েছে দেশব্যাপী।


তরুণ তমাল জানালেন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা আজ আমাদের মাঝে কাজ করছে। বার বার উচ্চারিত হচ্ছে কাঁদতে আসিনি। ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। সব ভাষা শহীদের সেই অর্জন আজ প্রজন্ম চত্বরে সবার প্রেরণা।


মৌসুমী জানালেন, সালাম, তোমাদের রক্তিম লাল সালাম … বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে বাংলার বীর ভাষা শহীদদের এবং একুশের চেতনায় জাগ্রত আজ।


রুহি জানালেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার তারুণ্যের প্রেরণা। ভাষার মাসে তরুণ প্রজন্ম আজ সেই প্রেরণাই যেন পাচ্ছে। রূপম জানালেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তরুণদের উজ্জ্বীবিত করবে।


একুশে ফেব্রুয়ারি সেই দিন, যেদিনে সালাম, বরকতরা বুকের রক্ত দিয়ে ভাষাকে রক্ষা করেছিলেন, কোটি কোটি বাঙালির মনে আশা জাগিয়েছিলেন, স্বপ্নকে রাঙিয়েছিলেন রক্তের অক্ষরে। তাদের জ্বালানো দীপশিখাই একাত্তরে আরো উজ্জ্বল হয়ে রূপ নিয়েছিল স্বাধীনতায়। আর বিশ্বের বুকে নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটল বাংলাদেশ। আজ ২০১৯ সালে এসে সেই বাংলাদেশকে কলুষতামুক্ত করার সময় এসেছে।


সুতপা জানালেন, যথাযোগ্য শ্রদ্ধায় দেশবাসী স্মরণ করবে ভাষা শহীদদের এটাই কামনা। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। রাজধানীর মতো সারাদেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভাষা শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে যেন এটাও প্রতিধ্বনিত হয় যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়।


বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে চলছে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন চলবে।


কুয়াশা জানালেন, ভাষা শহীদদের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, প্রভাত ফেরি, আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন, স্বেচ্ছায় রক্তদান আর গানের মধ্য দিয়ে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবে এটা আমরা জানি। এই আয়োজনে যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি থাকে।


তরুণ প্রজন্ম বলতে চান বাংলাদেশের মানুষের নারীর কথা। তারা গেয়ে চলেছেন ভাষার গান, মুক্তিযুদ্ধের গান। তারা আবৃত্তি করছেন, অভিনয় করছেন বাঙালির সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে লালন করেই। এই তরুণ প্রজন্ম নবজাগরণ ঘটাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


চাঁদপুর থেকে এসেছেন কনক। কনক জানালেন, যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। তাদের মাঝে যেন প্রজন্ম চত্বরের এই তরুণদের দাবি প্রোথিত থাকে।


ইডেনের ছাত্রী হাসিনা জানালেন, বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিচ্যুতি ও বিভ্রাট আছে। এ কারণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বিজ্ঞানসম্মত একটি বানান ও উচ্চারণরীতি তৈরি করা দরকার। এই বিষয়ে মেধাবী তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য কাজ করছে। এ দাবি পূরণ যেন হয় সেজন্য তরুণদের কাজ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের হাজারো মানুষের মায়ের ভাষা আজ হুমকির সম্মুখীন। এরই মধ্যে বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে পৃথিবীর সব মাতৃভাষাকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।


সুমন জানালেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার রাজপথে বাঙালি ছেলেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার অধিকারকে সর্বজনীন মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ রচনা করেছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো দিন। এই দিনকে আমরা ভুলতে পারি না। আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি ভাষা শহীদদের; আন্তরিক কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি ভাষাসৈনিকদের।


মাতৃভাষার দাবিতে বাঙালি তরুণদের সেদিনের আত্মবলিদান শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ক্রমেই একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন ও অঙ্গীকার দানা বেঁধেছিল। সে স্বপ্নই ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পথ দেখিয়েছে বাঙালি জাতিকে। তাই ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতা, মুক্তি, সাম্য, গণতন্ত্র, আধুনিক বাঙালির সব শুভ চেতনার মাস। এই মাসেই শুরু হলো বাংলার তরুণদের অংশগ্রহণে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ।


২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও বটে। মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে পড়েছে ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে পৃথিবীর সব জাতি-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের বিষয়টি তাদের রাজনৈতিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের এই দেশেও সংখ্যার দিক থেকে ছোট অনেক জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন মাতৃভাষা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির স্বকীয় পরিপুষ্টির সুযোগ অবারিত রাখতে হবে।


আজ এ কথা ভেবে দেখার দিন, যে বাংলা ভাষার জন্য বাঙালি তরুণরা প্রাণ দিয়েছেন, সেই প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষার আজ কী অবস্থা। কাগজ-কলমে বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু সমাজের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রচলন ঘটেনি; এখনো ইংরেজির প্রাধান্য বেশি। আইন প্রণয়ন হয় বাংলায়, কিন্তু উচ্চআদালতে এখনো বাংলা চালু হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলা ভাষার জায়গা নেই বললেই চলে। এনজিও খাতও চলছে মূলত ইংরেজি ভাষায়। তাদের সেমিনার, সিম্পোজিয়ামগুলোর ভাষা প্রধানত ইংরেজি; তাদের প্রতিবেদন ও অন্যান্য লেখালেখির ভাষাও তা-ই।


শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি রপ্ত করতেই বেশি আগ্রহী। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। বাংলায় লিখতে না পারা অগৌরব বলে বিবেচিত নয়। শিশুদের শিক্ষা ক্ষেত্রে শুধু ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ের প্রসার নয় বাংলার প্রতি অবহেলা সাধারণ বিদ্যালয়েও কম নয়। আমাদের এগুলো নিয়ে আজ সোচ্চার হতে হবে।


একুশের চেতনা জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির মাধ্যমে বিশ্বের অপরাপর ভাষাভাষীর নিজ ভাষার প্রতি অহংকার এনে দিয়েছে। অনন্য উচ্চতায় বাংলা ভাষার উত্তরণ ঘটিয়েছে। একুশের চেতনা বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে এক স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ নির্মাণ করেছে। মানবতার মুক্তি ঘটিয়েছে। একুশের চেতনা নব নব রূপে নব নব আলোকে উদ্ভাসিত হোক- অপরাজিত, চিরভাস্মর এ বাংলায়


বিবার্তা/শারমিন/শাহনাজ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com