‘দাঙ্গা’ই ছিলো মিজু আহমেদের টার্নিং পয়েন্ট
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৭, ২৩:০৬
‘দাঙ্গা’ই ছিলো মিজু আহমেদের টার্নিং পয়েন্ট
অভি মঈনুদ্দীন
প্রিন্ট অ-অ+

গেলো সোমবার রাত সোয়া ৮টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে দিনাজপুরে আহমেদ ইলিয়াস ভূঁইয়া পরিচালিত ‘মানুষ কেন অমানুষ’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে ট্রেনে যাবার পথে তিনি হার্টঅ্যাটাকে মারা যান।


তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চলচ্চিত্রের মানুষেরা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এবং পরবর্তীতে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভিড় জমায়। মিশা সওদাগর, আমিন খান, ওমরসানী, অমিত হাসান, রিয়াজ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।


সোমবার সকালে তিনি শাহাদাৎ হোসেন লিটন পরিচালিত ‘অহংকার’ চলচ্চিত্রের শেষদিনের শুটিংয়ে অংশ নেন। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ছিলো মিজু আহমেদ’র নেশা। সেই নেশা সময়ের গন্ডি পেরিয়ে পেশায় পরিণত হয়েছিলো। কাজে-কর্মে ধ্যানে-জ্ঞানে এখন অভিনয়ই যেন তার সব কাজের মূল প্রেরণা ছিলো।


১৯৭৮ সাল থেকে এই সময় পর্যন্ত প্রায় পাঁচশো’রও বেশি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন। দর্শকের কাছে তার পরিচিতি খলঅভিনেতা হিসেবে হলেও বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন ঠিক তার উল্টো। শিল্পী সমিতির সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।


প্রয়াত মিজু আহমেদের সাথে বিবার্তা২৪ডটনেটের শেষ কথা হয় ২০ মার্চ বিএফডিসিতে দিতির স্মরণসভা অনুষ্ঠানে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন অভি মঈনুদ্দীন। শেষ সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশে দেয়া হলো।


বিবার্তা : কেমন আছেন মিজু ভাই?


মিজু আহমেদ : এইতো আপনাদের সবার দোয়ায় আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।


বিবার্তা : শরীরটা একটু দুর্বল মনে হচ্ছে..


মিজু আহমেদ : বয়স হয়েছে তো, কিছটুা দুর্বল তো লাগবেই। তাছাড়া আজ দিতির জন্যও মনটা খুব খারাপ। খুব ভালো মানুষ ছিলো। সবার জন্য ও ছিলো নিবেদিতপ্রাণ। এক সময় আমাকেও চলে যেতে হবে। কিন্তু ওর চলে যাওয়টা মেনে নেয়ার মতো নয়। অকালেই চলে গেলো দিতি।


বিবার্তা : এখন কী কী চলচ্চিত্রে কাজ করছেন?


মিজু আহমেদ : এখনতো আসলে আমাদের মতো সিনিয়র শিল্পীদের জন্য খুব বেশি চরিত্র সৃষ্টি হয় না। যে কারণে কাজও খুব কম। এরইমধ্যে কাজ করছি লিটনের ‘অহংকার’ চলচ্চিত্রে। এতে শাকিব, বাচ্চু ভাই, জলি, বুবলীসহ আরো অনেকেই আছে। খুব ভালো একটি চলচ্চিত্র। আমি খুব আশাবাদী এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে।


বিবার্তা : আপনার শৈশব সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম...


মিজু আহমেদ : আমার জন্ম কুষ্টিয়ার কোর্টপাড়ায় ১৯৫৩ সালের ১৭ নভেম্বর। আমার বাবা আবুল মোহাম্মদ, মা লুৎফুন্নেসা। আমরা পাঁচ ভাই বোন। আমি সবার ছোট। কোর্টপাড়াতেই কেটেছে আমার ছেলেবেলা। ছোটবেলা থেকেই আমি মঞ্চ নাটকের সাথে জড়িত ছিলাম। কুষ্টিয়ার নুপুর নাট্যগোষ্ঠী, রাজু আহমেদ স্মৃতি সংসদ ও পরিমল নাট্য সংসদের হয়ে আমি অনেক মঞ্চ নাটকে কাজ করেছি। ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এই তিনটির হয়ে অভিনয় করেছি।


বিবার্তা : আপনার স্কুল জীবন, কলেজ জীবন আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন...


মিজু আহমেদ : আমার স্কুল জীবন কেটেছে কুষ্টিয়ার মুসলিম হাইস্কুলে। তারপর কলেজ জীবন কুষ্টিয়া সরকারি মহাবিদ্যালয়ে। ওই কলেজ থেকেই আমি গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করি। তারপর মাস্টার্স ভর্তি হই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, ভূগোল বিষয়ে। কিন্তু যখন মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার সময় ঘনিয়ে আসলো তখনই আমি ফিল্মে অভিনয় শুরু করি। সালটা ছিল ১৯৭৮।


বিবার্তা : প্রথম কোন চলচ্চিত্রে কাজ করেন?


মিজু আহমেদ : আমি প্রথম নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘তৃষ্ণা’ চলচ্চিত্রে কাজ করি। এ চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকা ছিলেন আলমগীর-কবরী। আমি এতে মেইন ভিলেনের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলাম। চলচ্চিত্রটিতে আমার নাম ছিল বাবর মিয়া।


বিবার্তা : এরপর উল্লেখযোগ্য আর কোন কোন চলচ্চিত্রে তখন কাজ করেছিলেন?


মিজু আহমেদ : এরপরতো অনেক চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। যেমন নদের চাঁদ, মাসুম, নাগিন, ঈদ মোবারক, মহানগর, জনতা এক্সপ্রেসসহ আরো বেশ কিছু চলচ্চিত্র।


বিবার্তা : ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আপনি কোন চলচ্চিত্রটির কথা বিশেষভাবে বলতে চান ?


মিজু আহমেদ : কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’ চলচ্চিত্রটিকে আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আমি বিবেচনা করি। কারণ এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর থেকেই পরিচালকরা আমাকে চলচ্চিত্রে নেয়ার সময় চরিত্র নিয়ে ভেবেছেন। আমিও এরপর অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তবে ‘চাঁদাবাজ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আমি সবচেয়ে বেশি তৃপ্ত। এতেও আমার অভিনয় দর্শক উপভোগ করেছেন।


বিবার্তা : আপনি আর প্রয়াত অভিনেতা রাজীব যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন..


মিজু আহমেদ : হ্যাঁ, আমরা একসঙ্গে প্রথম প্রযোজনা করি ‘মহৎ’ নামের একটি চলচ্চিত্র। এতে ইলিয়াস কাঞ্চন, ওমর সানী ও শাহনাজ অভিনয় করেছিলেন। এটি ব্যবসায়িক সফলতা পাওয়ায় পরবর্তীতে আমাদের প্রযোজনা সংস্থা ফ্রেন্ডস মুভি আর বি এইচ ফিল্মসের ব্যনারে আরো সাতটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করি। এগুলো হচ্ছে আসামি গ্রেফতার, চালবাজ, অন্ধ ভালোবাসা, নাটের গুরু, জ্বলন্ত বিস্ফোরণ ইত্যাদি। রাজীবের মৃত্যুর পর আর নতুন কোনো ছবি এই প্রযোজনার ব্যানারে নির্মিত হয়নি।


বিবার্তা : প্রয়াত নায়ক মান্নার সঙ্গে তো অনেক চলচ্চিত্রে আপনি অভিনয় করেছেন...


মিজু আহমেদ : মান্নার সাথে অনেক চলচ্চিত্রে আমি অভিনয় করেছি। এমনকি তার মৃত্যুর আগে প্রায় সব চলচ্চিত্রে আমি তার সাথে কাজ করেছি। মান্নার মৃত্যুতে গোটা চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই আজও পূরণ হয়নি। যেমনটি পূরণ হয়নি সালমানের মৃত্যুর পরও।


বিবার্তা : চলচ্চিত্র তো প্রযোজনা করলেন, চলচ্চিত্র নির্দেশনা দেয়ার কোনো ইচ্ছে আছে কী?


মিজু আহমেদ : না-না নির্দেশনা দেয়ার ইচ্ছে আমার কখনো হয়নি। কারণ এই নির্দেশনা বিষয়টি আমার নিজের কাছে ভালো লাগেনা। অন্যের নির্দেশনায় অভিনয় করতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি আমি। তাছাড়া নির্দেশনা অনেক টেনশনের বিষয়, এটা সত্যিই আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়।


বিবার্তা : আপনিতো শিল্পী সমিতির সভাপতি ছিলেন, সমিতির সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার অভিমত...


মিজু আহমেদ : শিল্পী সমিতি অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক ভালো চলছে, সবকিছ্ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই চলছে। বেশকিছু বিষয় এলোমেলা ছিল, সেসব বিষয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সমিতির বাহ্যিক সৌন্দর্য্যও বেশ বর্ধন করা হয়েছে। এটা পুরো কৃতিত্ব বর্তমান কমিটির। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। ওমরসানী, মিশা সভাপতি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তাদের জন্য আমার শুভ কামনা। যেই নির্বাচিত হোক না কেন সমিতির জন্য যেন কাজ করেন, প্লিজ। শিল্পীদের পাশে থাকবেন।


বিবার্তা : মিজু আহমেদ কি আপনার সার্টিফিকেট নাম?


মিজু আহমেদ : না না সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার নাম হচ্ছে মিজানুর আহমেদ। আমি যখন নাট্যদলের সাথে যুক্ত হলাম তখন সবার মতে নামটি ছোট করে মিজু আহমেদ রাখা হয়।


বিবার্তা : জীবনের কাছে আপনার চাওয়া...


মিজু আহমেদ : জীবনের কাছে আর তেমন কিছুই চাওয়ার নেই। কারণ অভিনেতা হবার স্বপ্ন ছিল সেই ছোটবেলায়, সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পেয়েছি দেশের অগণিত দর্শকের অকৃত্রিম ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসার মাঝেই একজন মিজু আহমেদ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। তবে একটি চাওয়া আছে, কোনো চলচ্চিত্রে খুব সহজ সরল, বোকা প্রকৃতির একটি চরিত্রে অভিনয় করতে চাই। যাতে অভিনয় দেখে আমার প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মায়, মায়া জন্মায়। এই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য গত দুই দশক যাবত আমি অপেক্ষা করছি। কিন্তু সেই সুযোগ আাসেনি।
বিবার্তা/অভি/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com