জীবনের পথ আমি নিজের সিদ্ধান্তেই পেরিয়েছি : রোজিনা
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৭:০১
জীবনের পথ আমি নিজের সিদ্ধান্তেই পেরিয়েছি : রোজিনা
অভি মঈনুদ্দীন
প্রিন্ট অ-অ+

অনেক কষ্টের অতীত পেরিয়ে আজ তিনি দর্শকনন্দিত রোজিনা। দেশীয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে তার অবদান অপরিসীম। তবে সেই অবদানের পেছনের কষ্টের প্রলেপমাখা অতীত রোজিনা খুব কমই শুনিয়েছেন তার ভক্ত-দর্শককে।


ছোটবেলা, সিনেমায় আসার গল্প, সেখানকার পথচলা, অর্জন আর এই বেলার গল্প নিয়ে রোজিনা মুখোমুখি হয়েছিলেন বিবার্তা২৪ডটনেটের।


ফজরের আজানের মোহনীয় সুরে কোনো এক আলোকিত ভোরে রাজবাড়ির গোয়ালন্দে নানাবাড়িতে রোজিনার জন্ম। পরে শুনেছেন, পহেলা বৈশাখে তার জন্ম হয়েছিল। তখনকার দিনে গ্রামবাংলায় একটা রেওয়াজ ছিল, মেয়েদের প্রথম সন্তানের জন্ম যেন হয় তার নিজ বাড়িতে। সেই রেওয়াজ অনুযায়ী নানাবাড়িতেই জন্ম হয় রোজিনার। রোজিনার বাবা মো. জালাল উদ্দিন ছিলেন পেশায় ব্যবসায়ী আর মা খোদেজা বেগম ছিলেন গৃহিনী। তাই এমন পরিবারের মেয়ে চলচ্চিত্রে আসবে, তা কারোরই ধারণায়ও ছিলো না। তবুও চলচ্চিত্রে এসেছেন, অভিনয় করেছেন এবং কোটি দর্শকের মন করেছেন জয়। ২৫০টির বেশি ছবির সেই নায়িকা রোজিনার একান্ত সাক্ষাতকার নিয়েছেন বিবার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক অভি মঈনুদ্দীন।



বিবার্তা : ছোটবেলায় তো আপনি পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতেন?


রোজিনা : সে কথা মনে হলে আজো হাসি পায়। কতোটাই না পাগল ছিলাম আমি সিনেমা দেখার জন্য! আমাদের পরিবারে চার বোন আর দুই ভাইয়ের মধ্যে আমিই ছিলাম সবার বড়। ছোট ভাই লিবু ছাড়া আর অন্য দুই বোন ফরিদা, বেবী, মায়া ও ভাই পলাশ - সবাই এ দেশেই যার যার কাজে ব্যস্ত।


জন্মের পর আমার নানা-নানীকে দেখার সৌভাগ্য হলেও দাদা-দাদীকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। পরিবারে আমিই ছিলাম প্রথম নাতনি, তাই সবার অপরিসীম আদর আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলাম আমি। ঠিক যেটুকু বয়সে আমি সিনেমা, গান বুঝতে শিখেছি সে সময় থেকে এসবের প্রতি এক ধরনের নেশা ছিলো আমার। সিনেমা দেখতে হবে, গান শুনতেই হবে তা না হলে যেন রাতের ঘুমটাই হারাম হয়ে যেতো আমার। জীবনে প্রথম আমি সিনেমা দেখি রাজবাড়ীর চিত্রা সিনেমা হলে। ছবিটি ছিল ‘সাত ভাই চম্পা’। ছবিটি দেখার পর স্কুলে এসে বান্ধবীদেরকে ছবির কাহিনী গল্পের মত মুখস্থ বলে যেতাম। আর সেটাই ছিল যেন ছাত্রীজীবনের সেরা ঘটনাগুলোর একটা।


বিবার্তা : ছোটবেলায় তো আপনি কবরীরও ভীষণ ভক্ত ছিলেন...


রোজিনা : কবরী আপা আর শাবানা আপার ভীষণ ভক্ত ছিলাম আমি। মনের অজান্তে সে সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কবরী আপার মতো হাসার চেষ্টা করতাম। আর শাবানা আপার হেয়ার স্টাইল নকল করতে গিয়ে কপালের সামনে চুলকে চাঁদের মতো বাঁকা করে রাখতাম। আর সিনেমার পোস্টার যদি কোথাও হাতের নাগালে পেতাম, সেই পোস্টার বাসার দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখতাম আর ভাবতাম, ইস, যদি কবরী-শাবানা হতে পারতাম! বলা যায়, সিনেমা দেখা আর সিনেমার নায়িকা হবার ভাবনা ছাড়া আর কোনো ভাবনাই স্থান পেত না আমার মাথায়। স্কুল থেকে ফেরার পর মা যদি কখনো জিজ্ঞেস করতেন, আজ টিচার কি পড়া দিয়েছেন? আমি কিছুই বলতে পারতাম না।



বিবার্তা : চলচ্চিত্রে কিভাবে এলেন?


রোজিনা : ঢাকার আলীজান আর সোলেমানের বাবা-মায়ের সাথে আমার বাবা-মায়ের সম্পর্ক ছিল বেশ মধুর। তাদের বাসাতে যাতায়াত ছিল। একদিন কালীদাস বাবুর পরিচালনায় ‘জানোয়ার’ ছবির শুটিং দেখতে যাই আমরা কয়েকজন। সংসদ ভবন চত্বরের খেজুরবাগানে তখন শুটিং চলছিল। সেটা আমার দেখা জীবনের প্রথম কোনো ছবির শুটিং। দৃশ্যটা এমন - শর্বরী নাচবেন, দারাশিকো মদপান করবেন আর নাচ উপভোগ করবেন। তো পরিচালক উপস্থিত দর্শকের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে যেতে বললেন। তার কাজ হবে ট্রেতে করে মদের বোতলটা দারাশিকোকে দিয়ে আসা। আমি নিজে থেকেই বললাম, আমি যাব। আমাকে একটি প্যান্ট আর শার্ট দেয়া হল্। তা পরিধান করলাম, তারপর দেয়া হলো মেকাপ। ঘটনাটা ১৯৭৬ সালের একবোরে শুরুর দিকে। মুভি ক্যামেরার সামনে ওটাই ছিল আমার প্রথম কাজ।


শুটিং শেষ হবার পর ফটোগ্রাফার আমার বেশ কিছু ছবি তুললেন। সেই ছবি এ হাত ওহাত ঘুরে গিয়ে পড়লো ‘সাগরভাসা’ ছবির প্রযোজক আফজাল সাহেব ও ফখরুল সাহেবের হাতে। তারা আমার ছবি দেখে খবর পাঠালেন আমাকে সরাসরি দেখার জন্য। অবশেষে আমাকে ‘সাগরভাসা’ ছবিতে নবাগত নায়ক চঞ্চল মাহমুদের বিপরীতে অভিনয় করার জন্য চূড়ান্ত করা হলো।



বিবার্তা : কিন্তু শুনেছি, পরে চিত্রনায়িকা কবরীর জন্যই এই ছবি থেকে আপনি বাদ পড়েন?


রোজিনা : ‘সাগরভাসা’ ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন রফিকুল বারী চৌধুরী। তিনি মেকাপম্যানকে বললেন চুইংগাম দিয়ে আমার গালের গর্তটা ভরাট করে তারপর মেকাপ দিতে। মেকাপ শেষে যখন আমি শুটিং স্পটে হাজির হলাম তখন আমাকে দেখামাত্রই কবরী আপা শুটিং রেখে চলে গেলেন। সম্ভবত আমার চিকেন পক্স হয়েছিল বিধায় কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমার কষ্টটা সেখানে নয়, আমি কষ্ট পেয়েছি এই ভেবে যে, যেখানে আমাকে নায়িকা হিসেবে চূড়ান্ত করা হলো সেখানে কবরী আপা কেন? আমি মনে মনে খুবই কষ্ট পেলাম। আমি ওইদিন শুটিং করেছি ঠিকই, কিন্তু পরে আর এ ছবির শুটিং করিনি আমি। সেই যে আমি আঘাত পেলাম তখন থেকেই জীবনের বাকিটা পথ আমি নিজের সিদ্ধান্তেই পেরিয়েছি। নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছি।


বিবার্তা : আপনার পারিবারিক নাম তো রেনু ছিলো। এটা রোজিনা হলো কিভাবে?


রোজিনা : ‘সাগরভাসা’ ছবিতে যখন আমি কাজ করছি তখন আমার পারিবারিক নাম রেনু নামেই সবাই আমাকে চিনতেন। পরিচালক মোহসীন তার ‘আয়না’ ছবিতে কাস্ট করার পর আমার নাম দেন শায়লা। শায়লা নামেই তখন আমি মোহসীন, মতিউর রহমান পানুসহ সে সময়ের প্রথিতযশা পরিচালকদের ছবিতে কাজ করি। কিন্তু পরবর্তীতে যখন মহিউদ্দীনের ‘মিন্টু আমার নাম’ ছবিতে কাজ করার জন্য নায়িকা হিসেবে আমাকে চূড়ান্ত করা হয় তখন ছবির গল্পের নায়িকার নাম রোজিনা থাকায় শায়লা নাম পরিবর্তন করে রোজিনা নামেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সাংবাদিকদের কাছে। আর তখন থেকেই পারিবারিক নাম রেনু আর পরিচালক মোহসীনের দেয়া নাম শায়লা নামটি আড়াল হয়ে যায় রোজিনা নামের পেছনে। কিন্তু যে ছবিতে অভিনয় করার চুক্তিতে নাম হয় তার রোজিনা, সে ছবিতেও কাজ করা হয়নি শেষ পর্যন্ত। সেখানে আমার জায়গায় আসেন ববিতা।


এরপর ১৯৭৭ সালে এফ. কবীর চৌধুরীর ‘রাজমহল’ ছবিতে চিত্রনায়ক ওয়াসিমের বিপরীতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হই। শুটিং শেষ হবার পর ১৯৭৮ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিটি সুপার ডুপার হিট হওয়ায় আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর আমার রাতদিন কিভাবে কেটেছে আমি নিজেও জানি না।



বিবার্তা : পরিচালক কামাল আহমেদকে ঘিরে নাকি আপনার কিছু কষ্ট আছে...


রোজিনা : থাকে না মানুষের কিছু কষ্টের অতীত! সেরকমই একটা অতীত আছে কামাল আহমেদের সাথে। তার একটি ছবিতে কাজ করার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল স্টিল ফটোগ্রাফার ফিরোজ মামার (ফিরোজ হাসান) মাধ্যমে। সে ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন রাজ্জাক-শাবানা। সে সময় আবার আমি মায়াবড়ি’র একটি বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছিলাম। সে কারণে মডেল হিসেবেও আমার একটা পরিচিতি ছিল। যাই হোক, যেদিন শুটিং হবে সেদিন সকালে সবাইকে নাস্তা দেয়া হলো। আমার সামনেই বসেছিলেন প্রযোজক, পরিচালকসহ অনেকেই। আমাকে দেখামাত্রই পরিচালক কামাল আহমেদ বলে উঠলেন, আরে এই মেয়েটা মায়াবড়ির বিজ্ঞাপনে যে কাজ করেছে সেই মেয়েটা না? না, না এ মেয়েকে নিয়ে কাজ করবো না।


এ কথা শোনার পর আমি নাস্তা না খেয়েই ফিরোজ মামাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। ছবির প্রযোজক শুধু আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। তার বলার কোনো ভাষা ছিল না। পরে অবশ্য কামাল ভাই আমাকে তার ছবিতে কাস্ট করার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু আমি তাকে শুধু এইটুকুই বলেছিলাম, যদি আপনার ছবিতে আমাকে কাজ করতেই হয় তবে একক নায়িকা হিসেবেই কাজ করবো, নতুবা নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাও আর হয়ে উঠলো না।


বিবার্তা : বেশ কয়েকবার আপনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কেমন লাগে?


রোজিনা : যে কোনো সম্মাননা শিল্পীর জন্য অনেক আনন্দের। আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কসাই’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য আমি সর্বপ্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করি। এরপর মতিন রহমান পরিচালিত ‘জীবনধারা’ ও কবীর আনোয়ার পরিচালিত ‘দিনকাল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই। কো-প্রোডাকশনের ছবি (পাকিস্তানের সাথে) ‘হাম সে হায় জামানা’তে অভিনয়ের জন্য ১৯৮৬ সালে আমি পাকিস্তান থেকে নিগার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করি। এ ছবিতে আমার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক নাদিম। এছাড়া আমি নেপাল, শ্রীলঙ্কার সাথেও কো-প্রোডাকশনের ছবিতে অভিনয় করেছি। ১৯৮৪ সালে আমি কো-প্রোডাকশনের ছবি ‘অবিচার’ -এ অভিনয় করি বোম্বের সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তীর বিপরীতে।


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com