দুই কোরীয় নেতার বৈঠকের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৮, ০২:৩০
দুই কোরীয় নেতার বৈঠকের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের বিরল বৈঠক বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। কোরীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে তাই দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চল পানমুনজামের দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব।


কোরীয় যুদ্ধ অবসানের ৬৫ বছর পর এবারই প্রথম কোনও উত্তর কোরীয় রাষ্ট্রনায়ক আলোচনার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় যাচ্ছেন। দশককালেরও বেশি সময় পর দুই কোরিয়ার প্রথম শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে আসা উত্তরের নেতা কিম জং উনকে সীমান্তের সামরিক সীমারেখায় স্বাগত জানাবেন দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন।


এরপর অনার গার্ডের সদস্যরা দুই নেতাকে নিয়ে যাবেন সীমান্ত গ্রাম পানমুনজমে, সেখানেই শুক্রবার দুই কোরিয়ার শীর্ষ দুই নেতা বৈঠকে মিলিত হবেন।


পানমুনজমের পিস হাউজে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে দশটায় কিম-মুনের আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হবে। এর ঘণ্টাখানেক আগে সাড়ে নয়টার দিকে কিম উত্তরের সীমারেখা পার হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।



বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল চিফ অব স্টাফ ইম জং সিউক জানান, “এই সম্মেলনে অন্য কিছুর চেয়েও অ-পারমাণবিকীকরণ ও স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নিয়ে বেশি আলোচনা হবে। অ-পারমাণবিকীকরণ ও শান্তির গুরুত্ব বুঝতে পেরে উত্তর কোরিয়া তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তাদেরই পাঠাবে বলে ধারণা করছি আমরা,।”


কিমের সঙ্গে এ সফরে তার বোন কিম ইয়ো জং ও উত্তর কোরিয়ার আলঙ্কারিক রাষ্ট্রপ্রধান কিম ইয়ং ন্যামসহ নয় শীর্ষ কর্মকর্তা থাকবেন। সাত সদস্যের প্রতিনিধি দলে থাকবেন দেশটির প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও পুনরেকত্রীকরণ মন্ত্রীগণ।


উত্তরের এবারের দলে আরও থাকবেন সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান কিম ইয়ং চোল এবং দেশটির স্পোর্টস প্যানেলের চেয়ারম্যান চোয়ে এইচউই। আরও থাকছেন ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য রি সু ইয়ং, (উত্তর) কোরিয়ান পিপলস আর্মির চিফ অব জেনারেল স্টাফ রি মিয়ং সু।


মন্ত্রীদের মধ্যে থাকবেন উত্তরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাক ইয়ং সিক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হো এবং দুই কোরিয়ার শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রি সন গিয়ন।


প্রথম দফা আলোচনার পর কিম জং উন ও মুন জায়ে ইন আলাদাভাবে দুপুরের খাবার খাবেন। বিকালে তারা বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। আলোচনার পর দুই নেতা একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন এবং চুক্তির বিষয়ে ঘোষণা দিবেন।


সবশেষে কিম ও মুন দক্ষিণের অংশে গিয়ে রাতের খাবার খাবেন এবং ‘স্প্রিং অব ওয়ান’ নামে একটি ভিডিও ক্লিপ উপভোগ করবেন।



উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন হলেন দেশটির প্রতিষ্ঠাতার দৌহিত্র। আর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন উত্তর কোরীয় শরণার্থীর সন্তান। উত্তর কোরিয়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন তার বাবা। শুক্রবার এ দুই ব্যক্তি (মুন ও কিম) পরস্পরের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছেন। কেবল তাই নয়, ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধে বিরতির পর এটি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে তৃতীয় বৈঠক।


কিমের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি দলে থাকবেন আরও ৯ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে রয়েছেন: কিমের বোন কিম ইয়ো-জং, দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলাকারী সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিম ইয়ং চোল এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা শীর্ষ কর্মকর্তা চোয়ে হোয়ি। এদের তিনজনই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছিলেন।


ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৫০-১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসানে পানমুনজামে যুদ্ধবিরতিতে স্বাক্ষর করেছিল দুই পক্ষ। একে তাই নিরপেক্ষ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৫৩ এর যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের পর থেকে আন্তঃকোরীয় আলোচনার জন্য এ স্থানটিকে বেছে নেয়া হয়ে থাকে। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদের বৈঠককে সামনে রেখে নানা শান্তিপূর্ণ পদক্ষেপ দেখা গেছে। ডিমিলিটারাইজড জোনে লাউডস্পিকারে প্রপাগান্ডা ছড়ানো বন্ধ রাখা হয়েছে। ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক মহড়া আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। যে ট্রাম্প গত বছর কিমকে ‘ছোটখাটো রকেট মানব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন; সে তিনিই সম্প্রতি কিমকে ‘খুব খোলামেলা ও সম্মানিত ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে কিম কোনও প্রশংসার বাণী না ছুড়লেও হোয়াইট হাউসকে উত্যক্ত করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন।


উত্তর কোরিয়া থেকে আসা ইতিবাচক সংকেতগুলোর বেশিরভাগই কিম সরকারের কাছ থেকে সরাসরি আসেনি, বরং এগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পাওয়া গেছে। বৈঠককে সামনে রেখে বুধবার (২৫ এপ্রিল) উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এ দুই দেশের নেতারাই রুদ্ধ-দ্বার কক্ষের ভেতরে দুই ঘণ্টা ধরে অনুশীলন করেছেন।



শুক্রবার পানমুনজামের ডিমিলিটারাইজড জোনের প্রাণকেন্দ্রে পিস হাউসে মিলিত হবেন কিম ও মুন। কিন্তু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মতো জটিল ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য হাতে গোনা কয়েক ঘণ্টা সময় পাবেন তারা। দিনের আলোচনাকে একটি আনুষ্ঠানিক যৌথ ঘোষণায় পরিণত করাটা ‘কঠিন’ হবে বলে মনে করেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রধান সচিব ইম জং সিওক। কিম ও মুনের মধ্যে আলোচনায় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ কিংবা পুনরেকত্রীকরণ প্রশ্নে বড় ধরনের কোনও সাফল্য আসবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরাও।


মার্কিন সাময়িকী টাইমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কোরিয়ান পেনিনসুলা ফিউচার ফোরামের জ্যেষ্ঠ গবেষক দুয়েওন কিম বলেন, ‘মুনের চ্যালেঞ্জ হবে একটি যৌথ ঘোষণার ব্যাপারে সম্মত হওয়া যা ভালো বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতার অনুভূতিকে ছাপিয়ে আরও কিছু মনে হবে।’


ইয়োনসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জন ডেলুরি টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে আলোচ্যসূচিতে প্রাধান্য দেওয়া হলেও এ বৈঠক একটি ‘কার্যনির্বাহী সম্মেলন’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এখানে উত্তেজনা কমাতে সম্ভাব্য পদক্ষেপ কী হতে পারে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ শেষ করা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।


মুন নিজেও এ বৈঠকে শান্তি ঘোষণার সম্ভাবনার ওপর তেমন একটা জোর দিচ্ছেন না। সম্প্রতি তিনি স্বীকার করেছেন আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তি চুক্তি করতে হলে কোরীয় যুদ্ধে অংশ নেয়া অন্য পক্ষগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অনুমোদন লাগবে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যুদ্ধ শেষ করতে’ মুন ও কিম অপেক্ষাকৃত কম উচ্চাভিলাষী একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন। এটি চুক্তিতে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি একটি পদক্ষেপ।


২০০০ ও ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী আন্তঃকোরীয় সম্মেলনে একই রকমের পদক্ষেপ দেখা গিয়েছিল। কোরিয়ান পেনিনসুলা ফিউচার ফোরামের জ্যেষ্ঠ গবেষক দুয়েওন কিম মনে করেন ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে মূল খেলাটা হবে ট্রাম্প ও কিমের বৈঠকে।’


বিবার্তা/হাসান/কামরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com