নাম উঠবে তো? আসামে শঙ্কায় বাঙালিরা
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৮, ১১:২৩
নাম উঠবে তো? আসামে শঙ্কায় বাঙালিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৫১ সালে যখন প্রথম জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ হয় ভারতের আসাম রাজ্যে, সেই পর্বে সরকারি কর্মী হিসেবে তালিকা তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন বজলুলের দাদা। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর নতুন পঞ্জিকরণের প্রথম যে খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তাতে নাম ওঠেনি বজলুলের।


তালিকায় নেই বরপেটা জেলায় বসবাসকারী তার বৃহত্তর পরিবারের ৪৫ জন সদস্যের কারো নাম। অথচ ‘আসাম অ্যাকর্ড ১৯৮৫’ অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর আসামে ঢোকা বিদেশিরাই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।


আপাতত সোমবারের দিকে তাকিয়ে দিন কাটাচ্ছেন কর্মসূত্রে দিল্লির বাসিন্দা বজলুল বাসিদ চৌধুরী। সোমবার প্রকাশিত হবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত খসড়া। বজলুল একা নন, দুশ্চিন্তার প্রহর কাটছে আসামে বসবাসকারী কয়েক লাখ মানুষের। যার বেশিরভাগই বাঙালি।


বজলুলের বাড়ি যে জেলায়, সেই বরপেটা মুসলিম অধ্যুষ্যিত। এখানকার বহু লোকেরই নাম ওঠেনি প্রথম খসড়ায়। তার কথায়, আমাদের পরিবার ১৯১১ সাল থেকে আসামে রয়েছে। দাদা সরকারি কর্মী ছিলেন। পাঁচ চাচা সরকারি চাকরি করতেন। অথচ আসামের বাসিন্দার তালিকায় আমাদের নাম ওঠেনি। আসলে অফিসাররা নিরপেক্ষ নন। একই ডকুমেন্ট কারো ক্ষেত্রে গৃহীত হচ্ছে, কারো হচ্ছে না।


তিনি বলেন, মাসকয়েক আগে পরিবারের তিন সদস্যকে শুনানিতে ডেকেছিল এনআরসি অফিস। আশা সোমবার অন্তত নাম উঠবে।


অপেক্ষায় রয়েছেন বরপেটার যুবক সফিকুল ইসলাম, শাকিল আহমেদরাও। সফিকুলের পরিবারে ১১ জন সদস্য। কারো নাম উঠেছে, কারো ওঠেনি। শাকিলের পরিবারের পরীক্ষা তুলনায় কম। শুধু মায়ের নাম ওঠেনি।


কর্মসূত্রে গুয়াহাটির বাসিন্দা শাকিল অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের তথ্যপ্রযুক্তি সেলের সচিব। সংগঠনের হয়ে কাজ করতে গোটা রাজ্য ঘুরেছেন। ফোন বললেন, বহু মানুষের নাম ওঠেনি। এখনো তারা ভরসা রাখছেন।


সকলে কি ভরসা রাখতে পারছেন? বাংলার পড়শি রাজ্যে অনেকটাই কোণঠাসা বাঙালিরা। তার অন্যতম শিকার আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ সংক্রান্ত সম্পাদকীয় লিখে স্থানীয় আক্রমণের মুখে পড়েছেন তিনি। শিলচরের বাসিন্দা তপোধীরের জন্ম ১৯৪৯ সালে। তারা বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ১৯৬২ সালে আসাম বিধানসভায় বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন। অথচ তপোধীরের বৃহত্তর পরিবারের কারো নাম ওঠেনি প্রথম খসড়ায়।


তিনি বলেন, আমরা ৩০ জুলাইয়ের জন্য দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি। শুধু আমরা অসমীয়া বাঙালীরা নই, অন্য অনেক গোষ্ঠীর মানুষই অপেক্ষা করে আছে ওই দিনটার জন্য।


তিনি আরো বলেন, দেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। এই তালিকা নাম নথিভুক্ত করার জন্য করা হচ্ছে না। একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষের নাম বাদ দেয়াই লক্ষ্য।


একই সুর শিলচরের আদি বাসিন্দা সঞ্জীব দেবলস্করের। তিনি বলেন, শিলচরে তিনশো বছরের ইতিহাস আমাদের। বিধায়কের পরিবার। স্বাধীনতা সংগ্রাসীর পরিবার। অথচ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নাম ওঠেনি। উল্টে কয়েকজনের নাম ডি-ভোটার (ডাউটফুল) তালিকায় ফেলে দিয়েছিল! সরকার ইতিহাসকে অস্বীকার করছে। চাইছে বাঙালিরা নিজেদের বাংলাভাষী অসমিয়া হিসেবে পরিচয় দিক!’


৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে এক পরীক্ষার মুখে পড়েছিলেন বজলুল-শাকিল-সফিকুল-তপোধীর-সঞ্জীবরা। প্রথম খসড়া তালিকায় নাম দেখতে পাননি। সেই থেকে চলছে দুশ্চিন্তার প্রহর।


আসামের এনআরসি আহ্বায়ক প্রতীক হাজেলা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, সংশোধনীর সুযোগ দেয়া হবে, তার পরই প্রকাশিত হবে চূড়ান্ত পঞ্জিকরণ রিপোর্ট। কিন্তু দৌড়াদৌড়ি, শুনানি, মামলা, অনিশ্চয়তা জুড়ে যাবে বাদ পড়া বাসিন্দাদের দিনযাপনে। নিজভূমে পরবাসী কি একেই বলে?


আসাম রাজ্যে ১৯৫১ সালের পরে এই প্রথমবার নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করা হচ্ছে। নাগরিক পঞ্জী থেকে কারো নাম বাদ যাওয়ার অর্থ, তাদের অদূর ভবিষ্যতে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হবে। ভারতীয় নাগরিকত্ব খুইয়ে তারা অচিরেই পরিণত হবেন রাষ্ট্রবিহীন মানুষে।


ইতোমধ্যেই বিদেশি বলে বহু মানুষকে চিহ্নিত করেছে আসামের ফরেনার্স ট্রাইবুনালগুলো। প্রায় ৯০০ জন আটক রয়েছেন বন্দী শিবিরে।


বঙ্গাইগাঁও জেলার বাসিন্দা ও সারা আসাম বাঙালী ছাত্র যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট ভাওয়াল বলেছেন, এমন বহু মানুষকে বিদেশি বলে রায় দিয়েছে ট্রাইবুনালগুলো, যাদের সব নথিপত্র থাকা স্বত্ত্বেও শুধুমাত্র শুনানির দিন হাজিরা দেয়নি বলে একতরফা রায় হয়ে গেছে।


তিনি বলেন, পুলিশও আগে হাজিরার নোটিস দেয়নি, তাই তারা জানতেই পারেনি যে তাদের নামে ট্রাইবুনালে মামলা হয়েছে। অথচ সেই পুলিশই বিদেশি রায় হওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যে লোককে খুঁজে বের করে থানায় ডেকে নিয়ে যায়। ছবি আর আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। অনেক মানুষ এভাবে বিদেশি বলে চিহ্নিত হয়ে গেছেন।


আসামের জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ আসামে ঢুকে পড়েছে। এই কথিত বিদেশিদের চিহ্নিত করতেই জাতীয় নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করার দাবি ওঠে। কিন্তু খসড়া তালিকায় দেখা গেছে বহু ভারতীয় নাগরিকের নামও বাদ পড়েছে।


৩০ জুলাই দিনের বেলায় প্রকাশিত হবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত খসড়া। সেটা যেমন টাঙ্গিয়ে দেয়া হবে নাগরিকপঞ্জী সেবা কেন্দ্রগুলোতে, সেরকমই ওয়েবসাইটেও দেখা যাবে আর এসএমএস করেও জেনে নেয়া যাবে নিজের নাম তালিকায় আছে কী না। সূত্র: এই সময় ও বিবিসি বাংলা


বিবার্তা/জাকিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com