ভালোবাসা সকল মায়ের জন্য
প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ১৮:২৪
ভালোবাসা সকল মায়ের জন্য
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

আমার মায়ের হাতের রুটি আলু ভাজি ছিল অসাধারণ, আর করলা আলু দিয়ে ইলিশের ঝোলটা ছিল এক্কেবারে আহা!!! জিভে জল আসার মত। আর গরুর মাংস রান্নার পর খাওয়া শেষ হলে হাড়িতে যা তলানি অবশিষ্ট থাকতো তাতে কিছু ভাত, পেয়াজ, মরিচ দিয়ে মাখিয়ে আমাদের খাইয়ে দিত, সে স্বাদ ছিল অমৃতসম। এমনি মজা ছিল সে খাবারে, কোনো দিন খেয়াল করিনি মা খাচ্ছে কি খাচ্ছে না।


স্কুলের বন্ধু বান্ধব দের সাথে যখন টিফিন খেতাম, কখনো ভাবিনি ঠিক ঠিক সকাল ৯টার মধ্যে কিভাবে আমাদের নাস্তা খাইয়ে আবার টিফিন রেডি করে দিত।


কখনো এটাও বুঝিনি বা বুঝতে চেষ্টা করিনি কিভাবে একটা ১৪ বছরের বালিকা আস্তে আস্তে সংগ্রাম করে যৌথ পরিবার সামলে নিজে গ্রাজুয়েট হয়ে পাশের উপজেলায় হাই স্কুলের শিক্ষকতা করতে কি অমানুষিক কষ্ট সহ্য করা লাগে। শুধু দেখেই গিয়েছি, ভোরে উঠে চুলা ঠেলে ছুটতে ছুটতে স্কুলে যাওয়া, আবার ফিরে এসে চুলা ঠেলা।


এখানেই শেষ না, আমাকে নিয়ে মায়ের স্বপ্নটা ছিল আকাশ ছোঁয়া। তাই কোথায় বিশ্রাম কোথায় কি, আমাকে ধরে আবৃত্তি শেখানো, ড্রয়িং ক্লাস, গানের ক্লাস, কিছুই বাকি রাখেনি। আমার এই কর্মঠ মায়ের হাত ধরেই আমার আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় হাজার খানেক পুরস্কার পাওয়া আর সেই সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় পর্যায়ে আসা। ভাবতেই অবাক লাগে কি সেই ট্রেনিং রে বাবা।


লতি, দুধ, ডিম, ছোট মাছ এসব ছিল আমার দুচোখের বিষ। জোর করে খাওয়াতে গেলে কত বকেছি, আর চিৎকার করেছি বলার বাইরে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচিং করার জন্য যখন ঢাকায় আসলাম, হোস্টেলে উঠিয়ে দিয়ে আমার পাশের বিছানার মেয়েটাকে আচলে মুখ ঢেকে বলে গিয়েছিল আমার মেয়েটা খুব অভিমানী, ওকে একটু দেখে রেখ। সেদিন একটু একটু বুঝেছিলাম আমি মায়ের কি।


বাবার অবিরাম শাসন, গোঁড়ামি সব কিছু থেকে যে মানুষটা আমাদের দুই ভাই বোনকে আগলে রাখতো সে আমাদের মা।


বরাবরই মায়ের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ ছিল, এখনো আছে, যে মা আমার বড় ভাইকে বেশি আদর করে, আমাকে ভালোই বাসে না। আরো কত কি। কখনো এসবের জন্য সরি বলিনি। এত কাজ নিজের হাতে করতো আর কাজ চোর আমি পালিয়ে বেড়াতাম গল্পের বইয়ের রাজ্যে। কখনো বোঝার চেষ্টাই করিনি এত উচ্চবিত্ত বাবার ঘর থেকে এসে কিভাবে আমার মধ্যবিত্ত বাবার ঘর করে গেল মুখ বুজে।


প্রায় ১০ বছর হয়ে গেল, মায়ের কাছ থেকে কত দূরে আমি। ফোন করলেই ঝগড়া ঝাটি করে রেখে দেই। নিজের জীবন বেছে নিয়েছি নিজেই আর এজন্য মাকে কম কথা শুনতে হয়নি সবার কাছে, এ যেনো সব মায়েরই দোষ, আমাকে স্বাধীনতা দেবার ফল।


সজ্ঞানে দুই একবার মাকে মা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। তখন এতোটা ডিজিটাল যুগের বাচ্চা ছিলাম না আমি। আর ফেসবুকের যুগে তো বাবা মাকে ফেলা ফেলা করেও অনেকে বড় বড় স্ট্যাটাসের ঝড় উঠায়। নাহলে তো জাত থাকে না।


আজ এত এত দিন পর আমার মেয়েদের বানানো কার্ড আমাকে বড় সড় একটা ধাক্কা দিয়ে গেল। স্কুল থেকে শুনে এসেই বাসায় এসে ব্যস্ত হলো মাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য।


মা যে কি জিনিস নিজে মা না হলে বোঝা যায় না। আজ এত বছর পর নিজেকে আমার মায়ের জায়গায় এনে দাড় করানোর চেষ্টা করে দেখি আমি তো তার পায়ের কাছেও না, পাশে তো দূরের কথা। এত ত্যাগ, এত পরিশ্রম, পৃথিবীর হীরে মুক্তা দিয়েও পূরণ হবার নয়।


ভালোবাসা সকল মায়ের জন্য।
চৌধুরী নূরজাহান মনজুর সেতুর ফেসবুক থেকে


বিবার্তা/বাণী/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

বি-৮, ইউরেকা হোমস, ২/এফ/১, 

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com