সাকিব আল হাসানের ভাইরাল ভিডিও বনাম বাঙালি চরিত্র
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ১৭:২৫
সাকিব আল হাসানের ভাইরাল ভিডিও বনাম বাঙালি চরিত্র
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সকাল থেকেই দেখছি সাকিবের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেই ভিডিও শেয়ার করে অনেকেই লিখছে, সাকিবকে সড়ক আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, তাই সাকিব অশ্লীল অঙ্গভঙ্গী করেছে।


এই ভিডিও দেখে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই হঠাৎ মনে হলো। আমি এখন যে শহরে থাকি, সেখানে খুব বেশি বাংলাদেশি নেই। সব মিলিয়ে শ'দেড়েক হবে হয়ত। তো, এদের অনেকের'ই ধারণা, আমি একজন কোটিপতি আর এই টাকা আমি নানান অসদুপায় অবলম্বন করেই রোজগার করেছি!


আমি অবশ্য এদের এই ধারণা নিজ থেকে কখনো ভাঙ্গাতে যাইনি কিংবা ভাঙ্গাবার ইচ্ছেও নেই। আমি যেহেতু সমাজবিজ্ঞানে পড়াশুনা করেছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানই পড়াই, তাই আমি পুরো ব্যাপারটাকে বরং অধীত বিদ্যার আলোকে বোঝার চেষ্টা করেছি।


বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে আসে, তাদের বেশিরভাগেরই উদ্দেশ্য থাকে ভাগ্য পরিবর্তন। এ উদ্দেশ্য নিয়েই কেউ হয়ত পড়াশুনার কথা বলে বিদেশে আসে, কেউ অন্য কোনো উপায়ে। এদের মাঝে কেউ হয়ত জীবনে কখনো সেই অর্থে ঢাকা শহরেই যায়নি; কেউ আবার হয়ত শহর থেকে এসেছে, কিন্তু হয়ত আজীবন অর্থকষ্টের মাঝ দিয়েই বড় হয়েছে। আবার কেউ কেউ হয়ত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে।


এভাবে এরা একেক জন একেক ক্লাস বা শ্রেণী থেকে উঠে এসেছে। এদের বেশিরভাগই বিদেশে এসে হোটেল-রেস্টুরেন্ট কিংবা সাধারণ একটা চাকরী করে নিজেদের সংসার চালায় আবার দেশেও হয়ত পরিবারকে সাহায্য করে।


এসব ইউরোপ-আমেরিকান দেশে আপনি যদি অতি সাধারণ শ্রমিকও হন, বেশ কিছু দিন কাজ করলে আপনার গাড়ি, বাড়ি সব কিছুই থাকবে। এসব দেশের ভিক্ষুকদেরও এগুলো থাকে!


দেশের গ্রাম-ছোট শহর এবং নানা শ্রেণী-পেশার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা এই মানুষগুলো যখন বিদেশে কোথাও থাকে, তখন তাদের একটা কমন পরিচয় হয়; সেটা হচ্ছে তারা বাংলাদেশি। এই বাংলাদেশিরা যখন বিদেশে খানিক সেটেল হয় বা হচ্ছে, তখন যখন দেখে তাদেরই মতো দেখতে, তাদেরই ভাষায় কথা বলে কেউ একজন খুব ভালো কিছু করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে কিংবা গবেষণা করছে; দেশ-বিদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াচ্ছে, তখন এরা ব্যাপারটাকে খানিকটা অন্যভাবেই নেয়। এরা তখন ভাবতে থাকে, এই মানুষটা কেন আমাদের মতো না, কেন আমাদের মতো করে কথা বলে না, কেন আমাদের সঙ্গে উঠে-বসে না; নিশ্চয় সে ভাব দেখাচ্ছে! আর এসব ভাবতে ভাবতে একটা সময় এরা নিজেরা নানারকম গল্প ও গুজব তৈরি করতে থাকে।


এই যেমন আমার বেলায় এরা তৈরি করেছে, আমি নানান সব উপায়ে অনেক টাকার মালিক হয়েছি। এরা যেহেতু নিজেরা বিদেশে এসছে মূলত অর্থ উপার্জনের জন্যই, সুতরাং এদের কাছে অর্থ বিষয়ক রিউমারটাই হয়ত চমৎকার মনে হয়েছে! অথচ এদের কেউই আমার পারিবারিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক পরিচয়ই জানে না।


আমার অবশ্য এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ, আমি কখনোই এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না, বরং পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করার চেষ্টা করি। আমি যখন এদের সঙ্গে কথা বলি, বুঝার চেষ্টা করি এদের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডটা কেমন হতে পারে কিংবা কোন শ্রেণী থেকে উঠে আসা, অথবা এদের সামাজিকীকরণটাই বা কিভাবে হয়েছে।


দেশে থাকলে হয়ত এমন নানান শ্রেণী-পেশার মানুষের এক সঙ্গে উঠবস করা হতো না; কিন্তু বিদেশে বাংলাদেশি পরিচয়টার জন্য দেখা যায় এসব ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা মানুগুলো একসঙ্গে চলাফেরা করছে। আমার বরং এটা দেখতে ভালোই লাগে।


এতসব কথা বলার কারণ একটাই - সাকিবের ভিডিও। তবে কোনো শ্রেণী কিংবা পেশার মানুষকে ছোট করা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য না। জগতের সকল কাজই কাজ। সকল কাজ ও পেশাই শ্রদ্ধার দাবি রাখে। আমি স্রেফ পুরো ব্যাপারটা তুলে ধরার জন্য এভাবে লিখলাম।


সাকিব যখন ছেলেপেলেদের ঘরে ফিরে যেতে বলেছে; এই আমিই লিখেছিলাম, তার তো এটা বলার দরকার নেই।


এখন যেই ভিডিওটা ভাইরাল করে বলা হচ্ছে, সাকিবকে নাকি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সড়ক আন্দোলন নিয়ে, তাই সে বাজে অঙ্গভঙ্গী করেছে।


আমি ভিডিওটার কোথাও দেখলাম না কেউ তাকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করছে। তাছাড়া ওই জায়গায় থাকা আমার পরিচিত মানুষজন আমাকে জানিয়েছে, এক লোক তার অটোগ্রাফ চেয়েছিল, সে দিয়েছেও; এরপর সেলফি তুলতে চাইলে সে বলেছে, আমি এখন খুব টায়ার্ড, মাত্রই খেলে এসছি!


তো এই দর্শক তখন সাকিবকে বলেছে, "তোর ভাব দেখলে বাঁচি না!" একথা শুনে সাকিব অমন ভঙ্গী করেছে।


সাকিব যে অঙ্গভঙ্গী করেছে, আমি মোটেই সেটা সাপোর্ট করছি না। কেউ একজন বাজে কিছু বলে থাকলেও তার হয়ত অমন ভঙ্গী করা উচিত হয়নি।


তবে একটা খেলোয়াড় মাত্রই খেলে এসেছে, এমন অবস্থায় তার কাছে সেলফি তুলতে চাওয়া, অটোগ্রাফ চাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু না পেলে তাকে "ভাব দেখায়" বলে যা ইচ্ছে তাই বলতে হবে? আর পুরো ঘটনাকে আবার ফেইসবুকে রিউমার হিসেবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, সাকিব নাকি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞেস করাতে অমন করেছে!


আমরা কেন কখনোই কিছুতে বিশ্বমানের হতে পারি না, জানেন তো? কারণ হচ্ছে, কেউ একজন একটু ভালো করতে থাকলে, আমরা সবাই মিলে টেনে হিঁচড়ে তাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করি!


উসাইন বোল্টকে চেনে না এমন ক্রীড়াপ্রেমী বোধকরি এই পৃথিবীতে পাওয়া দুষ্কর। তার দেশ জ্যামাইকা স্রেফ তার জন্যই পুরো পৃথিবীতে পরিচিত। কিন্তু আমরা এমন একজন মানুষও আজ পর্যন্ত তৈরি করতে পারলাম না, যার কারণে বিশ্ববাসী একনামে বাংলাদেশকে চিনবে।


কেন তৈরি করতে পারলাম না জানেন তো? আমাদের মতোই দেখতে, আমাদের মতো অঙ্গভঙ্গী, আমাদের ভাষায়তেই কথা বলে; কেউ যদি একটু ভালো করতে থাকে, পৃথিবীতে একটু পরিচিতি পেতে থাকে; আমরা সবাই মিলে তাকে টেনে ধরি নিচে নামাতে।


বিশ্বমানের বলতে এখন আছেই এক সাকিব আল হাসান; তাকেও এখন আমাদের টেনেহিঁচড়ে নিচে নামাতে হচ্ছে!


আপনার যদি তার খেলা ভালো না লাগে, তার খেলার সমালোচনা করুন; তার আচার-আচরণ ভালো না লাগলে সেটাও জানাতে পারেন; কিন্তু তাই বলে সে যেটা করেনি; সেটাও বলে বেড়াতে হবে?


আমাদের কতো অভিযোগ সাকিবের বিরুদ্ধে! সে আইপিএল খেলে টাকা কামিয়ে এখন দেশ ভুলে গেছে, সে দেশকে ভালোবাসে না; সে ভালোবাসে বিদেশী লীগের খেলা, তার আচরণ ভালো না, তার বউ কেন পর্দা করে না; আরও কতো কি!


আমাদের চরিত্রটাই আসলে এমন। আমরা বিশ্বমানের মানুষজন পাবো কই থেকে? তৈরি হবার আগেই তো আমরা টেনে-হিঁচড়ে তাদের নিচে নামিয়ে ফেলি!


আমিনুল ইসলামের ফেসবুক থেকে


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com