‘মা’ আমার অহংকার
প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ১৮:১৯
‘মা’ আমার অহংকার
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

কলেজ পড়ুয়া এক ছেলের মা তার ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে খাবার জন্য টাকা না দিয়ে বলেছিল, বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় নিয়ে আয়, আমি নিজে রেঁধে খাওয়াবো।


এই দুঃখে ওই ছেলে লিখেছে, বাবা-মায়েরা যে কেন এতো ব্যাকডেটেড হয়! পুরো জন্মদিনটাই মাটি হয়ে গেল!


মা দিবস উপলক্ষে লোকজন মায়েদের সঙ্গে চমৎকার সব ছবি দিচ্ছে; মায়েদের যে ভালোবাসে, সেই কথা জানান দিচ্ছে। একটা মায়াময় পরিবেশ বিরাজ করছে ফেসবুকে।


তবে আমার পরিচিত এমন অনেক আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু বান্ধব আছে, যাদের কেউ বিসিএস ক্যাডার, কেউ হয়ত ব্যাংকের বড় কর্তা কিংবা বড় কোন অফিসের এক্সিকিউটিভ। এদের অনেক'কেই আমি দেখেছি গ্রামে অশিক্ষিত কিংবা অল্প শিক্ষিত বাবা-মায়েদের পরিচয় দিতে কিংবা তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না!


শহুরে এপার্টমেন্ট কালচার, ক্লাব কিংবা পার্টি কালচারের সঙ্গে বাবা-মায়েরা ঠিক যায় না; তাই যতটা সম্ভব বাবা-মায়ের বিষয়টা অনেকেই এড়িয়ে চলতে চায়।


স্কুলে পড়ার সময় প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস আসলে আমার মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করত। আমার জন্মদিন ডিসেম্বরের ২২ তারিখে। আমাদের সময় স্কুল গুলোর ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট কোন এক বিচিত্র কারনে ডিসেম্বর মাসের ২০, ২১ তারিখের দিকে দিত। অর্থাৎ আমার জন্মদিনের ঠিক এক-দুই দিন আগে।


আমি সব সময় আতঙ্কে থাকতাম- রেজাল্ট যদি ভালো না হয়, তাহলে তো আমার জন্মদিন'টা মাটি হয়ে যাবে! এমন না আমার বাবা- মা রেজাল্ট খারাপের জন্য আমাকে বকা দিবে বা এই ধরনের কিছু!


আমার বাবা তো উল্টো রেজাল্ট খারাপ হলে বলে বসতেন- ব্যাপার না, সবার সব কিছু জানার দরকার কি! রেজাল্ট খারাপ হওয়াও ভালো!


আমার মা অবশ্য বকা না দিলেও কোন না কোন ভাবে বুঝিয়ে দিতেন-রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, তোমাকে পড়াশুনায় আরেকটু বেশি মনোযোগী হতে হবে!


মায়ের এই "বুঝিয়ে দেয়ার" ব্যাপারটা এড়িয়ে চলার জন্য আমি সব সময় চেষ্টা করতাম রেজাল্ট'টা যেন ভালো হয়।


এখন বুঝি- এই "বুঝিয়ে দেয়ার" মূল্য কতোটা!


আমার মা লেখাপড়া না জানা একদম নিরক্ষর মানুষ। আমার রেজাল্ট ভালো হয়েছি নাকি খারাপ হয়েছে সেটা পড়ে বুঝার মতো অবস্থা তার ছিল না। কিন্তু তিনি ঠিক'ই বুঝতে পারতেন।


আমরা ছয় ভাই-বোন। আমরা সবাই ঢাকা শহরের ভালো এবং নামকরা স্কুল-কলেজে পড়াশুনা করেছি। দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েছি।


আমাদের নিরক্ষর মা'ই আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন, বাসায় মাস্টার রেখে পড়াশুনা শিখিয়েছেন; সব সময় আমাদের পড়াশুনা কিংবা অন্য যে কোনো ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন।


আমার মা এই পৃথিবীতে আমার সব চাইতে কাছের বন্ধু। ভালো লাগা, ভালোবাসা থেকে শুরু করে এমন কোন কিছু নেই যা আমি আমার মায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করি না।


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম যখন কেউ একজন'কে ভালো লেগে গেল, আমি প্রথম মা'কে গিয়েই বলেছি। আমার মা আমাকে সোজা বলেছে- তুমি তোমার ভালো লাগার কথা তাকে জানিয়ে দেও। এতে হয়ত সে অবাক হতে পারে। কিন্তু তোমার ভালোবাসা জানানো'তে তো তার কোন ক্ষতি হচ্ছে না।


আমার মা বলতেন- সব সময় খেয়াল রাখবে তোমার জন্য যেন অন্য কারো ক্ষতি না হয়ে যায়। নিজের মতামত জানাতে পারো কিন্তু অন্য কারো সঙ্গে কোন কিছু নিয়ে জোর করবে না।


বাসার কাজের ছেলেটার সঙ্গে একদিন খানিক জোর গলায় কথা বলার পর আমার বাবা-মা আমার সঙ্গে দীর্ঘ দিন কথা বন্ধ রেখেছিলেন, আমি ওই ছেলেটার কাছে ক্ষমা চাইনি বলে। আমি ক্ষমা চাইবার পর'ই আমার বাবা-মা আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন।


আমার মা'ই আমাকে শিখিয়েছেন- জগতের সবাই আমরা মানুষ। বাসার কাজের ছেলেটা যেমন মানুষ, পাশের দোকানে ডাল-চাল বিক্রি করেন যিনি, তিনিও মানুষ। কেবল আমাদের পেশা'টাই ভিন্ন। দিন শেষে আমাদের সবার'ই প্রিয়জন আছে; আছে ভালো লাগা, ভালোবাসার মানুষ।


আমার মা যখন চিকিৎসার জন্য বিদেশে এলেন; এখানকার রেসিডেন্স পারমিটের জন্য মা'কে ইন্টার্ভিউ দিতে হয়েছে। মা যেহেতু এখানকার ভাষা কিংবা ইংলিশ কোনটাই জানে না; তাই এরা ট্রান্সলেটরে সাহায্য নিয়ে আমার মা'কে ইন্টার্ভিউ নিয়েছে। তো, বিদেশী যেই ভদ্রলোক আমার মা'র ইন্টার্ভিউ নিয়েছে, তিনি মা'কে জিজ্ঞেস করেছেন, আপনি পরবর্তীতে ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে লেখাপড়া'টা শিখে নিলেন না কেন?


আমার মা এর উত্তরে তাকে বলেছেন,আমার তার দরকার হয়নি। কারন আমি আমার ছেলে-মেয়েদের চোখ দিয়েই পড়তে পারি।


ভদ্রলোক ইন্টার্ভিউ শেষ হবার পর আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন, তোমার মা'কে বলো, সে তার ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে পেরেছে। আমি তাকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, এর উত্তরে তিনি যা বলেছেন, তাতে আমি খুব অবাক হয়েছি। বলার সময় তার উজ্জ্বল চোখ দুটো আমাকে জানান দিচ্ছিল- তিনি একজন সফল মা।


শুনেছি আজ নাকি মা দিবস। আমার জন্য অবশ্য বছরের ৩৬৫ দিন'ই মা দিবস। আমার এই লেখাপড়া না জানা নিরক্ষর মা আমাকে স্কুলে পাঠিয়েছেন, পড়াশুনা শিখিয়েছেন, সেই সঙ্গে শিখিয়েছেন - কিভাবে জগতের সকল মানুষ'কে ভালোবাসতে হয়। এমন কি যেই মানুষ'টা আমাকে অপছন্দ করে কিংবা ঘৃণা করে, তাকেও কিভাবে ভালোবাসতে হয়।


যেহেতু আমি আর সবার চাইতে একটু অন্য রকম ছিলাম, আমার মা আমাকে সব সময় বলতেন- তুমি সবার সঙ্গে ভালো ব্যাবহার করবে, সবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলবে, সবাইকে ভালবাসতে শিখবে; তাহলে দেখবে, এই যে তুমি অন্য রকম, এরপরও মানুষজন তোমাকে ভালোবাসবে।


আমি আমার মায়ের কাছ থেকে যা শিখেছি, দেশ বিদেশের বড় বড় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আমি এতো কিছু শিখতে পারিনি। আর আমাকে শেখানোর জন্য আমার মা'কে লেখাপড়া শিখতে হয়নি, পিএচডি করতে হয়নি, স্কুল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়নি। তিনি তার সন্তানকে তার মতো করেই শিখিয়েছেন- যা তার ভবিষ্যতে কাজে দিবে।


যেই ছেলেটা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে জন্মদিন পালন করতে না পেরে মা'কে ব্যাকডেটেড বলছে, কিংবা অফিসের যে বড় কর্তা সন্ধ্যায় পার্টিতে গিয়ে গ্রামে থাকা অশিক্ষিত বাবা-মায়ের পরিচয় দিতে সঙ্কোচবোধ করছে; এদের হয়ত জানা নেই- এই যে আমরা এতোটা আপডেটেড হয়েছি; সেটা কিন্তু এই ব্যাকডেটেড বাবা-মায়ের জন্যই।


আমিনুল ইসলামের ফেসবুক থেকে


বিবার্তা/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com