দু’দিনের এ দুনিয়ায়...
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ১৮:২০
দু’দিনের এ দুনিয়ায়...
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

আমার এক বান্ধবী আমাকে লিখেছে, এই যে তুই যে কারো সাথে খুব সহজে মেলামেশা করিস, এটা কি ঠিক?


আমার এই বান্ধবী আমার বেশ ক্লোজ। আমি জানি, সে যা-ই বলুক, আমার ভালোর জন্যই হয়ত বলে। তো আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,এই কথা বলছিস কেন?


-ইউনিভার্সিটি লাইফে নাহয় যে কারো সঙ্গে মিলেমিশে চলতি সেটা এক কথা; কিন্তু এখন তো তোর একটা সামাজিক অবস্থান হয়েছে; এভাবে ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে যে কারো সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়া মনে হয় ঠিক না।


-তুই আগে বল, কেন তোর মনে হয় যে, কারো সঙ্গে সহজে মেশা ঠিক না?


আমার এই বান্ধবী এইবার লিখেছে, নাহ, তুই আর বদলালি না। আরে, মানুষ তো হাজার রকম হয়, কার মনে কি আছে সেটা তো আর তুই জানিস না। তোর একটা অবস্থান আছে সমাজে; তোর মোটেই উচিত না সবার সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়া।


আমার এই বান্ধবীর কাজই হচ্ছে নিয়মিত উপদেশ দিয়ে বেড়ানো। আমি জানি, ও হয়ত আমার ভালোর জন্যই বলছে। তাই উল্টো তাকে কখনই কিছু বলা হয় না।


আমি জীবনভর একটা দর্শন অনুসরণ করে আসছি। জীবন একটাই, তাই সেটাকে উপভোগ করতে হবে। তবে এই উপভোগ করতে গিয়ে যেন কারো কোনো ক্ষতি করে না ফেলি। কারো ক্ষতি আমি করে ফেলেছি কিনা জানি না, তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে আমার দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি না হয়। সেই সঙ্গে আমরা সবাই মানুষ। আমার চাইতে দশ বছরের ছোট যে, সে যেমন মানুষ, আমার চাইতে ২০ বছরের বড় যিনি, তিনিও মানুষ। দেশের প্রধানমন্ত্রী যেমন মানুষ, আবার একজন রিকশাওয়ালাও মানুষ।


আমার মা আমকে ছোটবেলা থেকে এসব বলে বলে বড় করেছেন। সত্যি বলতে কি, আমার আশপাশে অনেক বড় কোনো কর্তাব্যক্তিকে আমি যে-চোখে দেখি, ঠিক তেমনি একদম সাদামাটা সামাজিক অবস্থানের মানুষও আমার কাছে একই রকম গুরুত্ব বহন করে।


আমার মনে আছে, আমার এই ছোট শহরে একবার বাংলাদেশ থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর এবং কয়েকজন এমপি এসেছিলেন। তো ওই প্রফেসর আমাকে বললেন, আমিনুল, তুমি এই সম্মানিত এমপিদের তোমার বাসায় আমন্ত্রণ জানাবে না?


আমি সোজা বলে দিয়েছিলাম, উনারা এমপি, এজন্য আমি আমার বাসায় উনাদের আমন্ত্রণ জানাতে পারছি না। বরং আমার যদি মনে হয়, সাধারণ মানুষ হিসেবে তাদের আমার আমন্ত্রণ জানানোর ইচ্ছে হচ্ছে তো জানাবো।


অতি অবশ্যই ওই সাংসদরা তো আর আমার আমন্ত্রণের অপেক্ষায় বসে থাকেননি কিংবা আমার আমন্ত্রণের দরকারও তাদের নেই। তবে এরা সবাই আমার কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন এবং কোনো এক বিচিত্র কারণে তারা বোধকরি আমার কথা পছন্দও করেছিলেন। শেষমেশ তাঁরা আমার বাসায় গিয়ে হাজিরও হয়েছিলেন।


আমি এদেশে একটা ডিপার্টমেন্টের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছি। সামনের ফ্রন্ট ডেস্কে দু’টো মেয়ে কাজ করে। ওদের অনেক দায়িত্বের মাঝে একটা দায়িত্ব হচ্ছে খাওয়ার পানির কন্টেইনারটা খালি হয়ে গেলে পানিভর্তি নতুন কন্টেইনার জায়গামতো সেট করে দেয়া। এই কন্টেইনারটা বেশ ভারি। আমার সব সময়ই মনে হয়, এই মেয়েগুলোর জন্য কাজটা হয়ত কষ্টের হয়ে যাবে। আমি প্রতিদিন সকালে গিয়ে প্রথম যে কাজটা করি সেটা হচ্ছে কন্টেইনারটা আমি নিজেই জায়গামতো বসিয়ে দিয়ে আসি।


আমার মনে আছে, আমার এক ছাত্র, যে কিনা মাত্রই নিজ দেশ থেকে এখানে পড়তে এসেছে। অর্থাৎ এই দেশে নতুন। যেহেতু সে দক্ষিণ এশিয়া থেকে এসছে, সুতরাং তার মাঝে একটা ধারণা আছে যে, এ ধরনের পানি ওঠানো-নামানোর কাজ তো আর ডিপার্টমেন্টের হেডের করার কথা না! তো সে প্রথম দিন এসে আবিষ্কার করেছে, আমি পানির কন্টেইনার নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি। যেহেতু সে আমাকে আগে থেকে চিনতো না, তাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, আপনি কে?


আমি বুঝতে পারলাম, সে হয়ত আমাকে এখানকার শ্রমিক বা এই টাইপ কোনো কাজের লোক মনে করেছে। আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই তাকে খেয়াল করছিলাম। তো আমি তাকে বললাম, আমার নাম আমিনুল।


সে তখনো ভালোভাবে বুঝতে পারেনি। একটু সঙ্কোচের সঙ্গে বলল, আমি ডিপার্টমেন্টের প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে চাইছি।


-আমিই তোমার ডিপার্টমেন্টের প্রধান।


আমার এই ছাত্রের সেদিনকার চেহারা আমার আজও মনে আছে। সে এমন অবাক হয়েছিল, দেখে আমারই বড্ড মায়া হয়েছে।


আমি জীবনভর এমনই ছিলাম। দৌড়ে বাস ধরা, রাস্তার পাশে বসে পড়া, ঝালমুড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে হাজির হওয়া, কিংবা ছাত্র-ছাত্রীদের আর দশজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ধরে নেয়া। আমি সবসময় চেয়েছি কেউ যাতে আমাকে অন্যদের চাইতে আলাদা ভেবে না বসে। কারণ, আমি নিজেও অন্যদের আমার চাইতে আলাদা ভাবতে চাই না।


মানুষের পেশাগত পরিচয় থাকবে, থাকবে ব্যক্তিগত পরিচয়। যে যার জায়গায় সফল কিংবা অসফল হতে পারে। কিন্তু দিন শেষে আমরা সবাই মানুষ।


শুধু শুধু নিজেকে অন্যদের চাইতে আলাদা ভেবে জীবনকে জটিল করার কোনো মানে হয় না। জীবন তো একটাই। আশপাশের মানুষজনকে নিয়ে সেটা উপভোগ করাই বোধকরি ভালো।


আইনস্টাইন বোধকরি একটা কথা বলে গিয়েছিলেন - "যার জ্ঞান যত বেশি, তার ইগো কিংবা অহংকার তত কম; আর যার জ্ঞান যত কম, তার ইগো কিংবা অহংকার তত বেশি"


কী দরকার এই এক জীবনে এতো সব ইগো আর অহংকার বয়ে বেড়ানোর! পৃথিবীটা অনেক মায়াময় এবং সেই সঙ্গে আমরা এই পৃথিবীতে খুব কম সময়ের জন্য আসি। বেঁচে থাকতে তাই এই মায়াভরা পৃথিবীর মায়াবী মুহূর্তগুলো উপভোগ করাই বোধকরি ভালো।


আমিনুল ইসলামের ফেসবুক থেকে


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com