‌‘মানুষকে খাওয়ানোয় অদ্ভুত আনন্দ আছে’
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২২, ২২:১১
‌‘মানুষকে খাওয়ানোয় অদ্ভুত আনন্দ আছে’
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

মানুষকে খাওয়ানোয় অদ্ভুত আনন্দ আছে, যতক্ষণ না দেয়ালে পিঠ ঠেকে। ততক্ষণে আসলে কেউ কারো কাছ থেকে কিছু খায় না। এখানে কোন ভনিতা নেই, কোন মিথ্যা নেই। প্রয়োজনের বেশি কেউ খেতেও পারে না। কাউকে খাওয়ানোর মায়া এক অপার্থিব মায়া। যেখানে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ নেই।


বার্মিজ আচার। প্যাকেট দুই টাকা। বরই বা তেতুলের সাথে লবণ এবং ঝাল মিশানো, আহা কি স্বাদ। বড় প্যাকেট। কেউ প্যাকেট কিনলে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। অন্তত একটু হলেও চাই। কিন্তু সেই দুই টাকার আচার দুই যুগ শেষেও পেছনে টানে। পোড়ায়।


ক্লাস ফোরে পড়ি। দুই টাকা তখন অনেক টাকা। আব্বার পিছনে পিছনে ঘুরে দুই টাকা জোগাড়ে গলদঘর্ম অবস্থা। সেই টাকা দিয়ে কখনো সোনালী লজেন্স, নারিকেল লজেন্স, মনেক্কা বা বাদাম কিনতাম। হঠাৎ বার্মিজ আচারের জোয়ার। হাতে টাকা পেলেই বার্মিজ আচার কিনি। এরপর খুব আগ্রহ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে রসিয়ে রসিয়ে খাই।


প্রতিবেশী মজির হালাদার। রসিক মানুষ। বৃদ্ধ বয়সেও খেতখামারে কাজ করেন। কাজের মধ্যে নানা ব্যাঙ্গবিদ্রুপে মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে। স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। ছেলে বউ নিয়ে আলাদা। দৈনিক ৩০ টাকায় কামলা, দুইজনের সংসার ভালোই চলে যেত। খুব ভাব টোনাটুনির। ঝামেলা বাধল, মজির হালাদার যখন স্থায়ীভাবে বিছনায় পড়লেন। সংসার চলে না। নানাজনের কাছে হাত পাততে হয়।


তখন দুপুর। নদীতে ঘন্টা দুয়েকের গোসল শেষে চোখ লাল। ভেজা প্যান্ট পরে বার্মিজ আচার চুষতে চুষতে বাড়ির দিকে যাচ্ছি। মজির হালাদার ডাকলেন, কাছে গেলাম। বললেন- আমাকে দুইটা টাকা দিতে পারবি। বললাম, কি করবেন? বার্মিজ আচার খেতে ইচ্ছে করতেছে তোর বু’র (দাদীর)। কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতেছে অনেকদিন ধরে। আচ্ছা দিবনে কাল, বলেই চম্পট।


এরপর বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু দুই টাকার মায়া ত্যাগ বড় কঠিন, মনের সাথে যুদ্ধ চলছে প্রতিনিয়ত। আজ দিব, কাল দিব, এভাবে করেই চলে যাচ্ছিল দিন। বু’র বার্মিজ আচারও খাওয়া হয়নি।


তখনও মজির হালাদার অসুস্থ। কিন্তু দিন পনের পরে এক সকালে শুনি মজির হালদারের স্ত্রী মারা গেছেন। এরপরেও বছরখানেক বেঁচে ছিলেন মজির হালাদার।


আমাদের বাড়ির তিনটি বাড়ি পরেই তাদের বাড়ি। দুজনের কবরও রাস্তার পাশে। যদিও কবরের চিহ্ন নাই। কিন্তু মনটা খুব পোড়ায়। সেই দুই টাকার স্মৃতি দগদগে। মাঝেমধ্যেই নাড়া দেয়। বাড়িতে গেলে অন্ধকারে কবরের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চাই।


গত পরশু। টিপ টিপ বৃষ্টি। লেডিস ক্লাব রোড ধরে হাঁটছি, গন্তব্য শাহবাগ। একজন রিক্সাওয়ালা হুড তুলে গুটিসুটিভাবে বসা। পাশেই ত্রিপল মাথায় দিয়ে দাঁড়ানো ৬/৭ বছরের একটি বাচ্চা। পলিথিনে মোড়ানো প্যাকেটে ভাত-তরকারি। দুজনে খুব আগ্রহ ভরে খাচ্ছেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, ভাবছি বাবা-ছেলের কি অদ্ভুত রসায়ন।


কিন্তু না, তাদের মধ্যে কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। উভয়ই পথের মানুষ। অথচ দেখলে মনে হবে গভীর এক মায়ার বন্ধন। ভালোবাসা থাকুক বা না থাকুক, মায়া জিনিসটা খুব দরকার। ভালোবাসলে ভুল হয়, কিন্তু মায়ায় জড়ালে ভুল হয় না। ভালোবাসায় নানা ফন্দি-ফিকির থাকে কিন্তু মায়া জিনিসটা পরিচ্ছন্ন। সব বাঁধন ছিন্ন হয় কিন্তু মায়ার বাঁধন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে জীবনভর।


সানাউল হক সানি, সাংবাদিক


বিবার্তা/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com