এক কিশোরীর জীবন গড়ে ওঠার গল্প
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২০, ১৫:০৪
এক কিশোরীর জীবন গড়ে ওঠার গল্প
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সিদ্ধান্তটিকে অনেকেই সন্তানের জীবন নিয়ে জুয়াখেলা বলেছিলো। আমি প্রতিবাদ করিনি। কারণ তাদের এই মন্তব্য যৌক্তিক ছিলো। তবে সঠিক ছিলো কিনা তা কেবল সময় বলতে পারতো। আজ সেই সময় এসেছে। কি ছিলো সেই সিদ্ধান্ত? কেনই বা আমি তা নিয়েছিলাম?


মেয়ে আমার কানাডা থেকে দেশে এসে কোনভাবেই দেশীয় শিক্ষার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছিলো না। প্রতি সেমিস্টারে ৭/৮-টি বিষয়ে ফেল করছিলো। তখন আমাকে গতানুগতিক ধারার বাইরে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। সিদ্ধান্ত সঠিক না বেঠিক সেটা নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাইনি। আমি আমার বিবেকের কথা শুনেছি, মেয়ের মধ্যে একটি স্বনির্ভরতার বীজ বুনতে চেষ্টা করেছি।


ফলাফলটা না হয় পরেই বলি। আগে এ বছরের ৮ জুনে দেয়া আমার সেই পোস্টটাকে আরো একবার দেখে আসি। সেই পোস্ট ছিলো এমন-


এক কিশোরীর জীবন গড়ে ওঠার গল্প


২০১৮ সালে কানাডা থেকে প্রাথমিক শেষ করে আমার মেয়ে অরোরা ঢাকায় মাধ্যমিকে ভর্তি হলো। নাম করা ইংলিশ মিডিয়াম। তার পর থেকে প্রতি সেমিস্টারেই সে ৭/৮-টি বিষয়ে ফেল করছে। গতবার করেছে, এ বারেও করবে। অবশ্য এ নিয়ে আমাদের কোন সমস্যা নেই। না আমার, না মেয়ের।


মেয়ে তার নিজের ইচ্ছে মত পড়াশোনা করে। ইচ্ছে হলে পড়ে, ইচ্ছে না হলে পড়ে না। এ নিয়ে আমার কোন আদেশ-উপদেশ নেই। সবটাই তার বিবেচনার উপর। দেখেছি, সে তার হিসেব মতো পড়ে, ঘুমায়, গল্পের বই পড়ে, ট্যাব চালায়। সর্বোপরি, সে তার নিজের মতো করে নিজের জীপনপ্রণালি, নিজের জগৎ গড়ে তুলেছে।


আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। যেমন, গতকাল "কর্ম ও কর্মফল", "প্লাজমা দান", আজকে "ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার" নিয়ে অনেকক্ষণ কথা হলো। বর্ণবাদ নিয়ে আমার লেখাটাও সে বেশ কষ্ট করে পড়েছে। তবে একাডেমিক বিষয় নিয়ে আমাদের কোন আলোচনা হয় না। গতবার তার গৃহ শিক্ষক ছিল, এবার তাও নেই। কারণ, গৃহ শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও সে যথারীতি একগাদা বিষয়ে ফেল করলো। তার পর আমরা দুজনে ঠিক ক করলাম, শিক্ষক লাগবে না। সে একা একা পড়বে।


গ্রেড সেভেনে সে একাই পড়েছে। স্কুলের শিক্ষকের ক্লাস ও বাসায় সেগুলোর অনুশীলন করা ছিল তার প্রধান কাজ। কোন কিছু না বুঝলে অনলাইন সার্চ করে সে সেটা বুঝে নিতো। তার ধারণা, আমার কাছ থেকে বুঝে নেয়াটা তার স্বনির্ভরতা না। তাই সে আমার কাছ থেকে বোঝার চেয়ে অনলাইন সার্চ করে বুঝতে বেশি পছন্দ করে। এভাবে একটি বছর ধরে আমি তার স্বনির্ভরতা গড়ে উঠতে দেখেছি। চেয়েছিলাম পরীক্ষার ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। এখন মনে হচ্ছে, সেটার প্রয়োজন নেই।


করোনার জন্য দু'মাস ঠিকমতো ক্লাস হয়নি। শেষ দিকে অনলাইনে ক্লাস হয়েছে। এখন অনলাইনে পরীক্ষা চলছে। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অ্যাপ ডাউনলোড করে অনলাইনে ক্লাস, পরীক্ষার সব কাজ সে একাই করেছে। সব সমস্যা নিজেই সমাধান করেছে।


আমরা দুই জনেই মনে করি, এবারও সে কয়েকটা বিষয়ে ফেল করবে। সে ঘরে বসে অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছে। পাশে বই আছে, ঘরে আমি আছি। অনেক উত্তর পারছে না। তবুও সে বই দেখে লিখছে না, আমাকে জিজ্ঞেসও করছে না।


ও জানে, ওর ক্লাসমেটরা এসব করে। ওরা এসব নিয়ে আলোচনাও করে। তবুও তার এটা করার কোন ইচ্ছে হয় না। যে কোন উপায়ে পাস করতে হবে- তার মধ্যে এ রকম কোন ভাবনা নেই, আমার কাছ থেকে এ রকম কোন চাপও নেই।


আজও দেখি সে কয়েকটা প্রশ্ন পারছে না বলে বসে আসে।বললাম, সাহায্য করি। উত্তর দিলো, প্রয়োজন নেই। পারলে পারবো, না পারলে নেই। চুরি করে পাস করার কোন মূল্য নেই।


বুঝলাম, আমার গত এক বছরের চেষ্টা সফল। সাফল্য এটা নয় যে, সে এবার সব বিষয়ে পাস করবে, ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হবে। সাফল্য হলো, সে আজ স্বনির্ভর। তার মধ্যে পাস করার জন্য কোন অন্যায় করার ইচ্ছে নেই। সকল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে তার নিজের নীতিবোধ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ন্যায় আর পাসের মধ্যে সে ন্যায়ের পথ বেছে নিয়েছে। পাসের নয়।


আমি খুশি। সে সব বিষয়ে ফেল করলেও আমি খুশি। পরীক্ষার ফলের চেয়ে তার এ শিক্ষার মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি।


(তার সততাকে আরো উৎসাহিত করার জন্য এ লেখাটি তাকে উৎসর্গ করা হলো। সে এটা পড়ার জন্য আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে।)


গতকাল তার ফলাফল দিয়েছে। গত দুই বছরের মধ্যে এটাই তার সবচে ভালো ফলাফল। সব বিষয় মিলিয়ে সে ৭৬.৪৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। আগে যেখানে ১৪-টি বিষয়ের মধ্যে সে ৭/৮-টি বিষয়ে ফেল করতো, এবার মাত্র একটিতে ফেল করেছে, বাংলা সাহিত্যে। আমার কাছে এটা অনেকটাই অবিশ্বাস্য যে, সে চারটি বিষয়ে A, পাঁচটি বিষয়ে B পেয়েছে। একটিতে তো ৯৯ নম্বরও পেয়েছে। সেটা হলো বাংলাদেশ বিষয়াবলী।


আমি কিছুই করিনি। এবার তাকে গৃহ শিক্ষকও দেইনি। নিজেও পড়াইনি। কেবল বলেছি, স্কুলে যা পড়াবে সেটা বাসায় এসে পড়তে, প্রতিদিনের স্কুল ও হোমওয়ার্ক প্রতিদিনই শেষ করতে। ওটা শুধু সেটাই করেছে। সবই সে নিজে করেছে, না পারলে অনলাইন থেকে শিখেছে, সেটাও না পারলে স্কুলের শিক্ষকের কাছ থেকে শিখেছে।


কাল রেজাল্ট তার হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগছে? সে সব দেখে শুনে শুধু বললো, আমি এখন সেল্ফ-কনফিডেন্ট (আত্মবিশ্বাসী)।


আমিও এর থেকে বেশি কিছু চাইনি। চেয়েছিলাম সে শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুক। নিজের পড়াশুনার প্রয়োজন নিজে অনুভব করুক। নিজের উপর নিজের আত্মবিশ্বাস অর্জন করুক।


সে ক্লাসে প্রথম হয়নি। দশের মধ্যেও হয়তো নেই। তবুও আমার একটি আত্মতৃপ্তি এসেছে। তার চোখে মুখেও আমি সে এক অনাবিল তৃপ্তির ছোঁয়া দেখতে পেয়েছি। আমি মনে করি, গত এক বছরে সে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে পরিচালনা করতে শিখেছে। পিতা হিসেবে আমার এখন দায়িত্ব তার চলার পথকে পরিচালনা করা নয়, শুধু চলার পথের উপর নজর রাখা। ট্রাফিক পুলিশের মতোন।


একটি কথা দিয়ে শেষ করি, সততা ও পরিশ্রমের পুরষ্কার মানুষ নয়, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নির্ধারণ করেন। এ নিয়ে অহেতুক বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই।


(এ লেখাটিও আমার ”আত্মবিশ্বাসী” মেয়ের জন্য উৎসর্গীকৃত। আমি জানি, ওর বাংলা পড়তে কষ্ট হবে। তবে সে যেহেতু আমার পোস্ট পড়ে তাই আমি সবসময় বাংলাতে পোস্ট দেই, যাতে ও কষ্ট করে সেটা পড়ে।)


আলাউদ্দিন ভুঁইয়ার ফেসবুক থেকে


বিবার্তা/এনকে

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com