কী মূর্খ! কী মূঢ়! কী নির্বোধ যে আমরা!
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২০, ১৮:২১
কী মূর্খ! কী মূঢ়! কী নির্বোধ যে আমরা!
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

রাষ্ট্রের ইতরামি-ফাতরামির কথা বলে মুখে ফেনা তুলি। সরকারের অক্ষমতা-উদাসীনতায় মাথায় জ্বলে ক্রোধের আগুন। জনপ্রতিনিধিদের অযোগ্যতা-নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও আমাদের হাজার অভিযোগ। এবং এগুলোর বেশিরভাগই যৌক্তিক। সত্যি সত্যিই এক বর্বর রাষ্ট্রের অথর্ব রাজনীতিবিদদের খপ্পরে আমরা।


কিন্তু আমরা কী?


আমি এ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পেয়ে গেছি বেশ আগেই। যখন ছেলেধরা সন্দেহে হাজার হাজার মানুষ মিলে একজন মা'কে গণপিটুনিতে মেরে ফেলে। তার রক্তমাখা মুখের সেই অসহায় চাহনিতেই লেখা ছিল এদেশের গণমানুষের মনস্তত্ত্ব। আমরা কতোটা হিংস্র! কতোটা পাশবিক! কতোটা জান্তব!


করোনার ক্রান্তিকালে আবার সেটির প্রমাণ হলো। রাষ্ট্রের যেমন, তেমনি আমাদেরও।


রাষ্ট্রের অপরাধের ফিরিস্তি বিস্তর। করোনাকে শুরুতে কোনো পাত্তাই দেয়নি, অন্তত তিন মাস সময় থাকা সত্ত্বেও নেয়নি প্রস্তুতি, ঝুঁকিতে থাকা বেশুমার লোকদের বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করতে দিয়েছে, আটকাতে পারেনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জনসমগম, আয়োজন করেছে ভোটের, ঢাকার ১০-২০ লাখ লোককে টাইম বোমা হয়ে ছড়িয়ে পড়তে দিয়েছে সারা দেশে, এরপর ছুটির সময়ে রাস্তাঘাটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি। পরীক্ষাগার নেই, পরীক্ষার যন্ত্র নেই, চিকিৎসকদের যথার্থ প্রতিরোধ পোশাক নেই-- আরো কত কী! প্রতিদিনের সংবাদ সম্মেলনে আক্রান্তদের যে সংখ্যা বলা হয়, তা বিশ্বাস করার লোকও কম।


রাষ্ট্র যেন অন্ধ হলেই করোনার প্রলয় বন্ধ থাকবে!


কিন্তু এ সময়ে আমরাও কী কম করেছি! করোনায় ১০ দিন বন্ধ ঘরে থাকার নির্দেশনা উপেক্ষা করে কী এটিকে ছুটি ধরে বেড়াতে যাইনি? ছেলে-মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করে শয়ে শয়ে লোক ডেকে খাওয়াইনি? আইসোলেশন থেকে পরিবার নিয়ে পালাইনি? বিদেশ থেকে ফিরে স্বেচ্ছাবন্দী থাকার সময়ে হাটে-মাঠে, ভার্সিটির হলে পর্যন্ত আড্ডাবাজি করিনি? কোয়ারেন্টিনের নির্দেশের বিপক্ষে এলাকাবাসী হাতে হাত রেখে প্রতিবাদ করিনি? রাতভর খুঁজিনি থানকুনি পাতা? নবজাতকের গুজবে গভীর রাতে মাইকের আজানে কাঁপিয়ে তুলিনি দশ দিক? হাসপাতালে সম্ভাব্য করোনা রোগী ভর্তির বিপক্ষে মিছিল করিনি? করোনায় মৃত কাউকে দাফন করা যাবে না--কবরস্থানে সে নোটিশ টাঙাইনি?


সেই আমরা যে আজ করোনা হাসপাতাল নির্মাণের কাজ থামিয়ে দিলাম--এতে আর আশ্চর্য কী!


চীন করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ৫/৭ দিনের মধ্যে হাসপাতাল বানিয়েছে। সে খবর তো কতো আহলাদ আর আফসোসে আমরা ফেসবুকে শেয়ার করেছি! আহারে, বাংলাদেশে যদি এমন হত! সেটি আমাদের সরকার বাহাদুর পারেনি; হয়তো গরজটাই করেনি। তবে বেসরকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপ তো ঢাকার তেজগাঁয়ের মতো প্রাইম লোকেশনে নিজেদের দুই বিঘা জমির উপর ৩০১ শয্যাবিশিষ্ট তেমন হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নেয়। সেখানে মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যে রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছিল। আর তা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।


অথচ আমরা কী করলাম! আজ দলে দলে লোক গিয়ে সে হাসপাতালের কাজ বন্ধ করে দিলাম। স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতৃত্বেই অমনটা হয়েছে বলে অভিযোগ। কেন তারা অমন করলেন? কারণ এখানে করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতাল হলে এলাকার সব লোক নাকি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হবে! কী মূর্খ! কী মূঢ়! কী নির্বোধ যে আমরা!


তাই আর শুধু শুধু রাষ্ট্রকে গালি না দিই! সরকারের বিপক্ষে অভিযোগ না করি! জনপ্রতিনিধিদের কাঠগড়ায় দাঁড় না করাই! কারণ আমরা যেমন, আমাদের রাষ্ট্র-সরকার-রাজনীতিবিদরা তেমনই হবে। কিচ্ছু করতে হবে না ভাইলোক, কেবল আয়নার সামনে দাঁড়ান। পচা-গলা-বিকৃত এক জীবন্ত লাশের ছবিটাই কি দেখতে পাচ্ছেন না?


নোমান মোহাম্মদ’র ফেসবুক থেকে পাওয়া


বিবার্তা/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com