রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচর নিরাপদ জায়গা-ঢাবি ও CFISS'র গবেষণা
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২১, ২১:২০
রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচর নিরাপদ জায়গা-ঢাবি ও CFISS'র গবেষণা
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

রােহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজার অনিরাপদ ও সুযােগসুবিধাসমূহ অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিরাপদ ও যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের একটি গবেষণা দল Central Foundation for International and Strategic Studies (CFISS) এর সহায়তায় এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।


শনিবার ( ৬ মার্চ) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত সেমিনারে এ গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েউপ-উপাচার্য (শিক্ষা)অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের চেয়ারম্যান কমোডর এম. এন আবসার।


সেমিনারে মূল গবেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসাইন, ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান।এছাড়া সেমিনারে নিবন্ধন পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম।



সেমিনারে গবেষণার বিষয়ে বলা হয়, দশকের পর দশক ধরে মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শরণার্থী বা বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে তারা বসবাস করতেছে।২০১৭ সালের সামরিক বাহিনীর গণহত্যার প্রেক্ষিতে প্রায় ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় গ্রহণ করে। বাংলাদেশ পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার জেলার ৩৪ টি ক্যাম্পে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে। সামগ্রিক পরিবেশকে করে তুলেছে ভঙ্গুর।


এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিত রোহিঙ্গা সুন্দর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নোয়াখালী জেলার ভাসানচর দ্বীপে আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প সম্পন্ন করেছে এবং পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ লক্ষ রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু, ইতোমধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে যে,ভাসানচরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাসের জন্য সহনীয়, উপযোগী ও টেকসই নয়।



এই প্রশ্নকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের একটি গবেষণা দল Central Foundation for International and Strategic Studies (CFISS) এর সহায়তায় একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল,


১. রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিদ্যমান সুযোগ - সুবিধা, জীবিকা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্পর্ক এবং তারা কি ধরণের নিরাপত্তা জনিত সমসা নিয়ে বসবাস করে, তা খতিয়ে দেখা,


২.ভাসানচরে নির্মাণকৃত আশ্রায়ণ প্রকল্পের সহনীয়তা,জীবিকা, নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের বিভিন্ন দিকগুলো পর্যালোচনা,


৩. দুটি স্থানের মধ্যে বিদ্যমান সুযোগ সুবিধার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা


৪. গবেষণার ভিত্তিতে একটি যথাযথ সুপারিশমালা প্রনয়ণ করা


সেমিনারে আরো বলা হয়, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার অত্যন্ত প্রচলিত গুনগত (qualitative) পদ্ধতি অবলম্বন করে গবেষণা কার্যটি পরিচালনা করা হয়। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিগুলাে ছিল সম্মিলিত আলােচনা (focus group discussion), বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার (expert interview) এবং মূল তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার (key informant interview)। গবেষণার বৈধতা, নির্ভরযােগ্যতা, ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের জন্য বহু-পদ্ধতি (multi-methods) ব্যবহার করা হয়।


এছাড়া, ভাসানচরের সহনীয়তা ও রােহিঙ্গাদের মতামত প্রতিফলনের জন্য দুইবার মাঠ-পর্যায়ে কাজ (fieldwork) করা হয়। অসহায় এবং দরিদ্র রােহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী, তাই তাদের গবেষণায় আগ্রহ এবং সহযােগীতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গবেষণার জন্য তথ্য নেয়ার ক্ষেত্রে যাতে করে রােহিঙ্গাদেরকে কোনাে ধরনের দুশ্চিন্তা বা অসুবিধায় না পড়তে হয় বা বিব্রত না হতে হয়, সে ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।


এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভাসানচরের সামাজিক ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করা। গবেষণার তথ্য-উপাত্ত, ভূতত্ববিদ, পরিবেশবিদ, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত বিশ্লেষণপূর্বক এই গবেষণা করে যে, ভাসানচর একটি নতুন দ্বীপ হিসেবে পুরােপুরি বসবাসযােগ্য। এদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলাে—আধুনিক বাসস্থান, রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাঁধ (৯ ফিট বাঁধ যেটি ১৯ ফিট উঁচু করার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে) দ্বীপটিকে টেকসই করেছে। বন্যা এবং ঘূর্ণিঝরের মাধ্যমে এই দ্বীপটি ডুবে যাবার কোন আশঙ্কা নেই। বিশেষত, তিন স্তরের দূর্যোগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বীপটিকে ঘূর্ণিঝর এবং বন্যার কবল থেকে রক্ষা করবে। এছাড়া, প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ঠদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে, কৃষিকাজ, সবজিচাষ, মাছ শিকারসহ এখানে আরাে জীবন-জীবিকার সুযােগসুবিধা রয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মকর্ম পালন, ও বিনােদনের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা। বিশেষ পরিস্থিতিতে দূর্যোগ হলে রােহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র।



অন্যদিকে, রােহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের সুযােগসুবিধাসমূহ অপর্যাপ্ত, এবং এর জন্য দায়ী হিসেবে দেখা গেছে অপ্রতুল বাসস্থান এবং চিকিৎসা সুবিধা, অপ্রতুল আয়-রােজগারের ব্যবস্থা এবং রান্নাবান্নার ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঘাটতি, ইত্যাদি কারণসমূহ। এখানে রােহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা বেশ অপর্যাপ্ত হিসেবে দেখা গেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পুরাে ক্যাম্পের এলাকাজুড়ে সমানভাবে নেই। এই বিপুলসংখ্যক রােহিঙ্গা জনগােষ্ঠীর মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া দিন দিন আরাে দুরূহ হয়ে উঠছে, সে কারণে ক্যাম্প এলাকাটি তাদের জন্য ক্রমে ক্রমে বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, স্থানীয় জনগােষ্ঠী রােহিঙ্গাদের তুলনায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অবহেলিত মনে করছে। তাদের সাথে রােহিঙ্গাদের ছােটখাট দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের চিত্র পাওয়া গেছে। উপরন্তু, ইয়াবা, অবৈধ অস্ত্র, পতিতাবৃত্তি, মানবপাচার, এবং মাদকের বিস্তার ও কেনাবেচার দিকটি এই গবেষণায় উঠে এসেছে।


তুলনামূলকভাবে, ভাসানচর বাস্তুচ্যুত রােহিঙ্গাদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ একটি জায়গা। দ্বীপটিতে আধুনিক সকল প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে, আয়-রােজগারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, মূল ভূখন্ড থেকে দ্বীপটিতে যাতায়াতের ভাল ব্যবস্থা করা হয়েছে, এবং মানবাধিকারের নিশ্চয়তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। ভাসানচরে অবস্থার উন্নতির জন্য আরাে অনেক ব্যবস্থা চলমান আছে।


দ্বীপটিকে আরাে টেকসই করে তােলার লক্ষ্যে এ গবেষণা রিপাের্টে কিছু বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। ভূতত্তবিদ এবং দৃূর্যোগ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা সুপেয় পানির যথাযথ ব্যবহারের প্রতি নজর দেয়ার কথা বলেছেন। যেহেতু দ্বীপগুলােতে পানির সঙ্কট দেখা দেয়, তাই ভবিষ্যতে কোনাে ধরনের পানির সঙ্কট এড়ানাের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও দৈনন্দিন কাজে এ পানি বেশি করে ব্যবহারের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। রােহিঙ্গা ছেলেমেয়েদেরকে তাদের নিজ ভাষায় পাঠদান এবং রােহিঙ্গাদেরকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ পালন করার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সুপারিশে কিছু ক্ষুদ্র কুটীরশিল্প স্থাপন করার কথাও তুলে ধরা হয়, যাতে করে দরিদ্র রােহিঙ্গারা তাদের আয়ের ক্ষেত্রে আরাে বৈচিত্র্য আনতে পারে। এ জায়গাটির সম্ভাবনাসমূহের আরাে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্য অধিকতর বিষয়ভিত্তিক গবেষণার সুযােগ রয়েছে।


বিবার্তা/রাসেল/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com