কুবির পরিবহন খাতকে ঢেলে সাজালেন উপাচার্য ড. এমরান
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৯:৩৯
কুবির পরিবহন খাতকে ঢেলে সাজালেন উপাচার্য ড. এমরান
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

দীর্ঘদিনের সঙ্কট আর নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) পরিবহন খাত। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ-দুর্দশার শেষ ছিল না। শিক্ষার্থীরা দাবি জানালেও এই সঙ্কটের কোনো সমাধান হচ্ছিল না। শিক্ষার্থীদের আক্ষেপ ছিল কবে হবে পরিবহন খাতের এসব সঙ্কটের সমাধান। অবশেষে তাদের সেই আক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন খাতকে ঢেলে সাজিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী।


জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। যোগদানের পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিবহন সেক্টরকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় দেখতে পান। পরিবহন সঙ্কট, বাসের ট্রিপ সঙ্কট, অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কট, দক্ষ ড্রাইভারের অভাব,পরিবহন খাতে দক্ষ লোকবলের অভাব, শৃঙ্খলার অভাবসহ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত ছিল এ খাতটি।



বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরের এসব সঙ্কট ভাবিয়ে তুলেছিল কুবি উপাচার্যকে। নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে সঙ্কটের সমাধানে উদ্যোগ নেন তিনি।


২০১৮ সালে পরিবহন সঙ্কট সমাধানে উপাচার্য অন্যান্য খাতের বরাদ্দ থেকে বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ৫২ আসন বিশিষ্ট Hinu bus বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করেন। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য ৬টি ট্রিপ বেড়ে যায়। যার ফলে শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছে।


শুধু তাই নয়, উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে ২০১৮ সালে সন্ধ্যাকালীন বাস সার্ভিস চালু করেন। যা সন্ধ্যা ৭ টায় ক্যাম্পাস থেকে কান্দিপাড় এবং রাত ৮ টা ৩০ মিনিটে কান্দিপাড় থেকে ক্যাম্পাসে ফিরে আসে।২০১৯ সালে উপাচার্য পরিবহন খাতকে আরো বেশি সচল করার জন্য পরিবহন পুলে একজন দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদান করেন।


এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীল বাস অচল এবং ড্রাইভার সঙ্কট থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের নিমিত্তে অচল বাসগুলোকে সচল করার উদ্যোগ নেন উপাচার্য। ড্রাইভার সঙ্কট দ্রুত সমাধানের জন্য যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে দৈনিক ভিত্তিতে নতুন ড্রাইভার নিয়োগ প্রদান করেন।



আরো জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ২০১৯ সালের ১৩ই মার্চ উপাচার্যের নির্দেশক্রমে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন কমিটির পরামর্শক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ৫ সদস্য বিশিষ্ট "শিক্ষার্থী পরিবহন কমিটি ২০১৯" আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা হয়।


২০১৯ সালের ১২ মার্চ উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী পরিবহন কমিটিকে ফেসবুক গ্রুপ খোলার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। অনলাইন এ গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা -কর্মচারীকে বাস সিডিউল সম্পর্কে পূর্বে অবগত করা হয়। এছাড়া এতে শিক্ষার্থীদের পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রদান করা হয়।


২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পরিবহন কমিটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাসগুলোকে শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমে কাশফুল, কৃষ্ণচূড়া,নীলাচল,নীলপদ্ম ও নীলকাব্য নামে নামকরণ করা হয়। একই বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর উপাচার্যের নির্দেশক্রমে বাসে ধরে রাখা সীটের সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ মেলে।



এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো যত্রতত্র থামিয়ে ওঠা-নামা করতো। এতে করে কুমিল্লা শহরে প্রচুর জ্যাম সৃষ্টি হতো। বাস বারবার থামানোর ফলে শিক্ষার্থীদের অনেক সময় অপচয় হতো। এ সমসা সমাধানের জন্য ২০১৯ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর উপাচার্যের নির্দেশে পরিবহন কমিটি শিক্ষার্থীদের মতামত অনুসারে "বাস স্টপেজ " নির্ধারণ করে দেয়।


২০১৯ সালের ১২ই মার্চ উপাচার্যের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রশাসনের মতবিনিময় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য আরো ২টি বিআরটিসি বাস বরাদ্দ প্রদানের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যা ২০১৯ সালের এপ্রিলে কার্যকর হয়। এতে করে বাসের ট্রিপ সংখ্যা বেড়ে যায়। পূর্বে ট্রিপ সংখ্যা ৮ টি ছিল, সেটি তখন বেড়ে ৭০ টি হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে।


শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল শুক্রবার ও শনিবার বাস সার্ভিস চালু করা। ২০১৯ সালের ২১শে মার্চ উপাচার্য শুক্রবার ও শনিবার বাস সার্ভিস চালু করে শিক্ষার্থীদের এ দাবি পূরণ করেন। একই বছরের ২ মে সর্বপ্রথম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে রোজা ও গ্রীষ্মের বন্ধে অফিস চলাকালীন বাস সার্ভিস চালু করা হয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় একাডেমিক কাজ সম্পূর্ণ করতে পেরেছে।



খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সর্বপ্রথম উপাচার্য এমরান কবির চৌধুরী কুমিল্লা শহরে বাস কাউন্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দুই ঘন্টা পর পর ফ্রি বাস সার্ভিস চালু করেন। এমনকি রাত ১ টা পর্যন্ত ফ্রি এ বাস সার্ভিস চালু রাখা হয়।


২০১৮-১৯ অর্থবছরের রাজস্ব বরাদ্দ হতে দুইটি মাইক্রোবাস ক্রয় করা হয়। ২০১৯ সালের ১লা আগস্ট উপাচার্য মাইক্রোবাস দুটির উদ্বোধন করেন।


এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ১টি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু ছিল। এতে করে প্রয়োজনের সময় অনেকক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সটি পাওয়া যেত না। এ সমস্যাটি সমাধানের জন্য উপাচার্য চলতি বছরের ১২ই আগস্ট পরিবহন পুলে আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করান। উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য গত ২৪ই সেপ্টেম্বর পরিবহন পুলে নতুন ৩টি বাস যুক্ত করেন। গত ১২ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে জীপ পরিবহন যুক্ত করা হয়।


এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষ বাস সার্ভিস দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ট্যুরে জ্বালানি খরচ বহন সাপেক্ষে বাস সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা করা হয়।


পরিবহন খাতের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বিবার্তাকে বলেন, আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর এখানের অবস্থা ছিল অনেকটা এরকম " সারা অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা"। এখানে শিক্ষকদের বসার জায়গা ছিল না, ছাত্রদের বসার জায়গা ছিল না। পরিবহন সঙ্কটসহ আরো নানা সমস্যা এখানে বিদ্যমান ছিল। মোটকথা, এখানে শুধু নাই আর নাই! এসব দেখে আমি সমাধানে নানামুখী উদ্যােগ গ্রহণ করি। তবে এক্ষেত্রে আমাকে অনেক বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এসব কাজ করতে হয়েছে।



তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের সহযোগিতায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ১৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার বড় প্রজেক্ট পেয়েছে। আমি এ প্রজেক্টের কাজ যাতে সুষ্ঠুভাবে হয়, সেজন্য এটার কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিয়েছি। আশা করছি, আগামী ৫০ বছরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। তখন এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।


কুবির এ উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো পরিবহন খাত। শিক্ষক -শিক্ষার্থীরা সরাসরি জড়িত এ খাতের সাথে। কিন্তু এ খাতের সমস্যার যেন শেষ ছিল না। এসব দেখে সমাধানে নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে সফলও হলাম। শিক্ষক -শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কুবি প্রশাসন সবসময় পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।


বিবার্তা/ রাসেল/আবদাল

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com