ঈদে গ্রাম থেকে ফেরা
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৭, ১৮:০৭
ঈদে গ্রাম থেকে ফেরা
প্রিন্ট অ-অ+

সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি একটি ''জনপ্রিয়'' নিউজ আইটেম। প্রতি বছর দুই ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি যেমন নিয়মিত ঘটনা, তেমনি তা নিয়ে পত্রিকার পৃষ্ঠাজুড়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশও তেমনই স্বাভাবিক ঘটনা।


মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মিডিয়া যাত্রাপথের দুর্ভোগ নিয়ে যতোটা সরব, ফিরতি পথের দুর্ভোগ নিয়ে ততোটাই নীরব বা উদাসীন। অথচ যাত্রাপথের চাইতে ফিরতি পথের দুর্ভোগ কোনো অংশে কম নয়।


এ দুর্ভোগের জন্য কে দায়ী - জানতে চাইলে একবাক্যে কারো দিকে আঙ্গুল তোলার উপায় নেই। কারণ, এর পেছনে আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক বাস্তবতার অনেক অনুষঙ্গ এতোটাই ওতপ্রোত জড়িত যে, কাউকে বা নির্দিষ্ট কোনো কিছুকে দায়ী বা দায়মুক্ত করার কোনো পথ খোলা নেই।


যেমন ধরা যাক গ্রামে যাওয়া বা গ্রাম থেকে শহরের কর্মস্থলে ফেরার প্রসঙ্গটি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামবাসী, তা তিনি গ্রাম বা শহর যেখানেই থাকুন না কেন। ফলে যে কোনো উৎসবের ছুটিছাটায় সেই মানুষেরা এক দুর্নিবার আকর্ষণে ছুটতে শুরু করে, যেখানে তার নাড়ি পোঁতা, সেই গ্রামের দিকে। কোনো বাধাই তাকে আর নগরের ইট-কাঠ-পাথরের অঘোষিত বন্দীশালায় আটকে রাখতে পারে না। এই টান এমনই অপ্রতিরোধ্য, প্রতি বছর ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায়, লঞ্চডুবি, ট্রলারডুবিতে শত শত প্রাণহানির খবরেও মানুষের স্রোত থামে না।


আমাদে দুর্ভাগ্য, যুগের পর যুগ ধরে আমাদের নীতিনির্ধারকরা দেশের কোটি মানুষের এই প্রাণস্পন্দনটিও অনুভব করতে পারেননি। তারা ভিনদেশি, ভিনভাষী ইংরেজদের হেলাফেলায় দেয়া তিন দিন ঈদের ছুটিই বহাল রেখে গেছেন। ভাবতেও চাননি, একটি জাতির অন্যতম প্রধান জাতীয় উৎসবে তিন দিন ছুটি আসলে কতো কম।


ছুটি এতো কম বলেই মানুষ যাওয়া-আসার পথে ভয়াবহ রকমের ঝুঁকি নিয়ে থাকে। ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শীমাত্রই জানেন, বাস-ট্রেন-লঞ্চের ছাদে বসে যাত্রীরা কিভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে এসময় যাওয়া-আসা করে। হাতে আর ক'টা দিন ছুটি থাকলে অনেকেই এভাবে যাতায়াত করতেন না।


আশার কথা, শতাব্দীপ্রাচীণ তিন দিনের ঈদ ছুটি যে অবাস্তব, বর্তমান সরকার তা উপলব্ধি করেছেন এবং এ ছুটি দ্বিগুণ করার কথা ভাবছেন বলে জানা গেছে। আশা করা যায়, আগামী ঈদেই এই ভাবনা বাস্তবায়িত হবে।


তবে আবারও বলি, ঈদযাত্রায় ভোগান্তির অবসান শুধু ছুটির দিন বাড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে নেই। এর পাশাপাশি আমাদের মানসিকতারও আমূল পরিবর্তন আবশ্যক। একটা উদাহরণ দেই। নদীপথে চলাচলকারী ফেরিতে শুধু যানবাহন ওঠারই কথা। কিন্তু ঈদের সময় ফেরিগুলোতে কী বিপুল মানুষ ওঠে, তা বর্ণনাযোগ্য নয়। এসময় ফেরি ও লঞ্চ দেখলে তাকে যন্ত্রযানের চাইতে মৌচাক বা মানবচাক বলেই বেশি করে মনে হয়। ফেরি ও লঞ্চডুবির এটা প্রধানতম কারণ। আর এই কারণের জন্ম অসচতেনতা থেকে। যাত্রীদের অসচতেনতা তো আছেই, সঙ্গে আছে ফেরি ও লঞ্চমালিক, চালক ও কর্মীদের অসচতেনতা ও সচেতন লোভ। প্রায় প্রতি বছরই সেই লোভের বলি হয় অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণ।


আরো আছে। সড়ক ও নৌপথে এসব অনিয়ম ঠেকাতে মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। কিন্তু তাতে কতোটুকু ফলোদয় হয়, সেটা বলার চাইতে না-বলাই ভালো। স্বীকার করি, যাত্রী ও যানবাহনের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা অনেকটা কম, কিন্তু ওই কমসংখ্যকরাই যদি, তাদের পক্ষে যতোটা সম্ভব, দায়িত্ব পালন করতেন তাহলেও সমস্যা এতোটা তীব্র না-ও হতে পারতো। তাই তাদের এবং তাদের যারা পরিচালনা করেন, তাদের সচেতনতাও একান্ত কাম্য। তারা সচেতন হয়ে আইন প্রয়োগ করলে মানুষ নিশ্চয়ই আরো খানিকটা স্বস্তিতে ভ্রমণ করতে পারতো।


আমাদের ছোট এই দেশটি অনেক সমস্যার মধ্যেও এগিয়ে চলেছে। অতীতের অনেক সমস্যা এখন নিছক অতীতের বিষয়। একটুখানি আন্তরিকতা, একটুখানি সচেতনতাও আমাদের মুক্তি দিতে পারে উৎসবযাত্রায় ভোগান্তি থেকে। আর সেই আন্তরিকতা ও সচেতনতা হতে হবে আমাদের সকলের - সরকার, যাত্রী, পরিবহনমালিকশ্রমিক সবার। তাহলেই নির্বিঘ্ন হবে সবার যাত্রা ও প্রত্যাবর্তন।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com