ফিরিয়ে দাও হারানো দিন
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৮:৫৪
ফিরিয়ে দাও হারানো দিন
প্রিন্ট অ-অ+

অবশেষে বাবুল মুক্তি পেলেন। সুযোগ পেলেন কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ পেরিয়ে মুক্ত আকাশের নিচে আসার। কিন্তু যা হারালেন তা কি আর ফিরে পাবেন তিনি? ১৫ বছরের যে কিশোরকে একদা ডাকাতি মামলায় ঢোকানো হয়েছিল কারাগারে, যখন নিরপরাধ হিসেবে কারামুক্ত হলেন, তখন তিনি ৪০ বছরের প্রৌঢ। তার কৈশোর, তার যৌবন কেটে গেছে কারাগারের সূচিভেদ্য অন্ধকারে। জানতে ইচ্ছা হয়, পৃথিবীর সব সম্পদ ব্যয় করেও কি তাকে ফিরিয়ে দেয়া যাবে সেসব হারানো দিন!


এ কাহিনী একজন মানুষের, যে মানুষ বার বার কেঁদেও সুবিচার পায়নি। এ কাহিনী একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার, যে তার একজন নাগরিকের দিকে দীর্ঘ ২৫ বছরেও তাকানোর অবকাশ পায়নি।


এই নিদারুণ বঞ্চনার করুণগাথা ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। পত্রিকাটি লিখেছে, যে অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, সেই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড। অথচ তাঁকে কারাগারেই থাকতে হলো ২৫ বছর। অবশেষে গত বুধবার ঢাকার একটি আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।


ভাগ্যাহত এই মানুষটির নাম মোহাম্মদ বাবুল। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বাহারনগর গ্রামে। মা-বাবার থাকতেন থাকতেন ডেমরার দোলাইরপাড় এলাকায়। একটি ডাকাতির মামলায় ১৯৯২ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন।


মামলার বিবরণে জানা যায়, ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট রাত সাড়ে আটটার দিকে গুলিস্তান থেকে কুমিল্লাগামী একটি বাস ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের সানারপাড়ে পৌঁছালে তিন ডাকাত বাসের যাত্রীদের কাছ থেকে নয় হাজার টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই বাসের কর্মচারী নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত করে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাবুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন ডেমরা থানার উপপরিদর্শক (এসআই)আশরাফ আলী সিকদার। আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে বাবুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই বিচারকাজ শুরু করেন। বিচার শুরুর ২৪ বছরে মামলার ১১ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র চারজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। তবে মামলার বাদী নজরুল কিংবা তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফ কখনো আদালতে হাজির হননি।


আদালত বাবুলের খালাসের রায়ে বলেছেন, ''মামলার বাদী, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী বিচারকসহ অন্য সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানোর জন্য আদেশের কপি পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো পক্ষই মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা ও জবানবন্দি রেকর্ডকারী বিচারককে আদালতে হাজির করানোর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বাবুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি।''


বাবুল তাঁকে গ্রেপ্তারের কাহিনী তুলে ধরে ওই পত্রিকাকে বলেন, সেদিন তিনি ফতুল্লায় যাচ্ছিলেন বন্ধুর কাছে। ডেমরা সেতুর ওপর ট্যাক্সির ভেতরে ছিলেন। হঠাৎ পুলিশ তাঁকে ধরে। পরে রিমান্ডেও নেয়। গ্রেপ্তারের পর প্রথম প্রথম মা-বাবা তাকে দেখতে কারাগারে আসতেন। পরে তারা আসা বন্ধ করে দেন। বাবুলের বাবা বিমানবাহিনীতে চাকরি করতেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। ১৯৯৫ সালে মারা যান মা। এরপর থেকে আর কোনো দিন ভাই কিংবা বোনকে দেখেননি বাবুল।


কী ট্র্যাজিক! হতভাগ্য এক বাবুলের কাহিনী আমাদের চোখে শুধু পানিই আনে না, আমাদের মনে কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দেয়।


প্রশ্ন হলো, মামলার বাদী, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী বিচারক এবং অন্য সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানোর জন্য আদেশের কপি পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হলেও কেন কোনো পক্ষই তাদের আদালতে হাজির করানোর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি?


প্রশ্ন হলো, এত বছর ধরে একজন আসামি জেলে আছেন, এটা কেন কারো নজরে পড়ল না? তার ২৫ বছর বিনাবিচারে জেলে থাকার পেছনে যাদের কর্তব্যে অবহেলা দায়ী, তার জবাবদিহি করবে কে বা কারা? বাবুলের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কি আইনের আওতায় আনা হবে?


বাবুলকে তার কৈশোর-তারুণ্য-যৌবন ফিরিয়ে দেয়া যাবে না, কিন্তু যে বিশাল অন্যায় তার প্রতি করা হয়েছে, প্রতীকী হিসেবে হলেও তাকে একটা ক্ষতিপূরণ দেয়া দরকার। রাষ্ট্র কি তা দেবে?


এসব প্রশ্নের কোনোটিরই উত্তর আমাদের জানা নেই। তবু আমরা জাতির বিবেকের কাছে আমাদের প্রশ্নগুলো রেখে গেলাম।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com