কমলা রঙের টেলিফোন
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৮, ২০:০১
কমলা রঙের টেলিফোন
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় বাসায় যেদিন কমলা রঙের টিঅ্যান্ডটি ফোনটি এলো, কী যে ভালো লাগছিল! কিন্তু ফোন করবো কাকে, কেউ যে নেই! অবশ্য মাঝে মাঝে রং নাম্বারে ফোন দিয়ে দুষ্টুমি করতে ভালোই লাগতো।


Telefon und Notizblock (Fotolia/Africa Studio)
একদিন আন্দাজে ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে ভেসে এলো আমারই বয়সি এক কিশোরীর সুকণ্ঠ (স্বীকার করছি, সেদিন সত্যিই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম)।


- হ্যালো, স্লামালাইকুম৷


- ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছো? (যতটা সম্ভব গলা ভারী করার চেষ্টা করলাম)


- জ্বি, ভালো। কে বলছেন?


- ভালো থেকো সবসময়। রাখি?


- জ্বি?


খটাস করে ফোন রেখে দিলাম। ওইটুকু দুষ্টুমিই তখন কী যে মজা লাগতো! পরে স্কুলে যখন খুব বন্ধুবান্ধব জুটে গেল, তখন তাদের সঙ্গে কথা হতো ঐ ফোনেই। কারো কারো বাসায় কথা বলার ব্যাপারে কড়াকড়ি থাকলে টিঅ্যান্ডটি ফোনেই মিসকল দিতাম। একবার রিং করে কেটে দেয়ার ঘটনা তিনবার ঘটলে ওপাশ থেকে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া যেত যে কে কল দিয়েছে!


স্কুলজীবনের শেষ দিকে বা কলেজের শুরুর দিকে মোবাইল ফোন এলো। আমার তখনো মোবাইল ফোন নেই, বন্ধুদের দু-একজনের ছিল। আমরা দোকান থেকে ১০ টাকা মিনিটে কল করতাম। অল্প কথায় কাজ শেষ হয়ে গেলে বাকি কথার জন্য আফসোস হতো। আবার কোনো কারণে এক মিনিট পার হয়ে গেলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আরো দশ টাকা গুনতে হতো!


একবার ফোন অপারেটররা কী করল, প্রথম তিন সেকেন্ড ফ্রি করে দিলো। আর যায় কোথায়! কথা হতো ঐ তিন সেকেন্ডে। একবার এই বন্ধু ফোন করছে ঐ বন্ধুর কাছে, ‘‘কোথায়?'' বলেই ফোন কেটে দিলো। এরপর অন্য বন্ধুর কল, ‘‘মেইন গেটে।'' এভাবেই চলতো।


এর পরের কয়েক বছরে মোবাইল ফোনের ব্যবহার অনেকটাই বদলে গেল। কলরেট কমে গেল, মেসেজের দাম কমলো, এমনকি মোবাইল ফোনের দামও কমে গেল।


এক সময় ফিলিপসের সেই ডিগা সেট, যা দিয়ে ক্রিকেট পর্যন্ত খেলা যেত বলে প্রচলন ছিল, সেই সেট ছোট হতে লাগলো। নোকিয়া সি২৫, এ৩৫ আর ৩৩১০ আজ কেবল নস্টালজিকই করে দেয়। আরো ছিল, মোটোরোলা, সাজেম - কত কী!


পরের এক দশকে সব যেন হুট করে বদলে গেল। সবার হাতে মাল্টিমিডিয়া হ্যান্ডসেট। তখন ফোনে কথা বলার চেয়ে ছবি তোলা, ভিডিও করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকলো।


মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও গতি সব দ্রুতগতিতেই বদলে দিতে লাগল। এখন খুব বেশি কেউ বাসার টিঅ্যান্ডটি সংযোগ নিয়ে ভাবে না।


মোবাইল এখন শুধু কথা বলার যন্ত্র নয়, হরেক রকম যোগাযোগের একটি ডিভাইস, যার মূল চালিকাশক্তি হয়ে গেছে ইন্টারনেট।


যেমন সেদিনও ডয়চে ভেলের বার্লিন অফিস থেকে আসা এক সহকর্মী ফিলিপ বলছিল, তোমার নম্বর দাও।


আমি নম্বর দিলাম। সে বলল, হোয়াটসঅ্যাপে খুঁজে পাচ্ছি না।


- হোয়াটসঅ্যাপে তো এই নম্বর ব্যবহার করি না। হোয়াটসঅ্যাপের নম্বর হলো...


সে হেসে বলল, হোয়াটসঅ্যাপের নম্বরটাই বেশি দরকার।


এখন মানুষ কথা বলতে বা টেক্সট পাঠাতে মোবাইলের ক্রেডিট খরচ না করে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, লাইন, ইমো – এ সব ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, মোবাইল ব্যাংকিং বা লেনদেন এখন সমধিক জনপ্রিয়। বিশেষ করে নগদ অর্থ লেনদেনে বাংলাদেশে ‘বিকাশ' যা করেছে, তা সারাবিশ্বে এখন রোল মডেল।


এর বাইরে মোবাইল ওয়ালেট অ্যাপগুলো বাংলাদেশে ততটা জনপ্রিয় না হলেও বিশ্বের অনেক জায়গাতেই এই সেবাগুলো জনপ্রিয় ও নিরাপদ বলেই মানা হয়।


তাই মোবাইল অপারেটররাও এখন বেশি গুরুত্ব দেয় ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ফোর জি। ফোর জি-র লাইসেন্স বিক্রি করে বাংলাদেশ কামিয়েছে প্রায় ৫,৩০০ কোটি টাকা।


অপারেটররা জানে যে, ইন্টারনেটের গতি বাড়লে এর ওপর নির্ভরশীলতা আরো বাড়বে, আরো নতুন নতুন প্লাটফর্ম তৈরি হবে। তাই তারা এখানে বিনিয়োগ করছে।


হিসেব বলছে, অপারেটররা এখন পর্যন্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে।


এর আগে, ২০১২ সালে বাংলাদেশের মানুষ থ্রি জি প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। থ্রি জি প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসার মাত্র তিন বছরের মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি পেরিয়ে যায়।


২০০৯ সাল থেকে বাড়তে থাকে এ খাতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগও। তুলনামূলকভাবে অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। অপারেটররা এখন লাভ বেশি করলেও বিনিয়োগের হার কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ অনেক জায়গাতেই সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দেখা দরকার।


বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি'র সর্বশেষ হিসেব দেখাচ্ছে, গত বছর ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে মোবাইল সংযোগ ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি। এর মধ্যে গ্রামীণফোন প্রায় সাড়ে ছয় কোটি এবং রবি প্রায় চার কোটি ত্রিশ লাখ সংযোগ বিক্রি করেছে।


ইন্টারনেটের প্রায় আট কোটি সংযোগ আছে, যার সাড়ে সাত কোটিই মোবাইলের মাধ্যমে ব্যবহার করছে মানুষ। বাকি ৫০ লাখ মূলত আইএসপি ও পিএসটিএন। এর বাইরে কিছু ওয়াইম্যাক্স সংযোগ আছে। এর অর্থ দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো ইন্টারনেট সংযোগের আওতার বাইরে আছে। তার মানে, এখনো ইন্টারনেটের বিরাট বাজার পড়ে আছে। আর যেহেতু ইন্টারনেট মূলত মোবাইলেই ব্যবহৃত হয়, তাই মোবাইল অপারেটররা এ খাতে বিনিয়োগ করবে, এটাই স্বাভাবিক।


মূল কথা হলো, টেলিযোগাযোগ খাতে বাংলাদেশের অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। এই অগ্রগতির হার জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ফোর জি আসায় সেই গতি আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়।


কিন্তু যোগাযোগ বা লেনদেন, কিংবা গবেষণা - যে সুবিধার কথাই বলা হোক না কেন, অবকাঠামো ও সেবার মান যত ভালো হবে, সার্বিকভাবে উন্নয়নের মানও ভালো হবে।তাই সেদিকেই বেশি জোর দিতে হবে।


যুবায়ের আহমেদের ব্লগ থেকে


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com