স্তিমিত স্ট্যাটাস আর স্তোকবাক্য
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৭, ০৯:৪৭
স্তিমিত স্ট্যাটাস আর স্তোকবাক্য
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

মূলগত দিক থেকে সংস্কৃত শব্দ স্তিমিত মানে আর্দ্র। তবে স্থির ও অচঞ্চল অর্থেও এটার ব্যবহার আছে। কিন্তু শব্দটি এখন আর আর্দ্র অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং অর্থের সম্প্রসারণ ঘটার পর শব্দটি এখন ক্ষীণ আর অনুজ্জ্বল অর্থে ব্যবহৃত হয় (সে স্বাদ যেন স্তিমিত হয়ে আসছে তার শরীরে- অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত)।


বঙ্গীয় শব্দকোষে স্তিমিত শব্দের অর্থে বলা হয়েছে, আর্দ্রীভূত, আর্দ্র, নিশ্চল, স্থির, নিষ্পন্দ, নির্নিমেষ, মন্দ, জড়ীকৃত। কিন্তু ভাষা যে সব সময় ব্যাকরণের খাঁচায় বন্দি থাকতে চায় না বা পারে না। তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, স্তিমিত শব্দটি এখন ক্ষীণ, অনুজ্জ্বল আর স্থির অর্থে ব্যবহৃত হয়।


প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ‘নায়িকা সংবাদ’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘বিরাট ড্রইংরুমের স্তিমিত আলোয় সে সন্দেহ আর ঘন হয়ে এল’। আর আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁর ‘পথের শেষ কোথায়’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যখন আমরা একান্ত স্তিমিত চিত্তে সুন্দরের ধ্যানে নিমগ্ন’। এখানে লেখক স্তিমিত শব্দটি অচঞ্চল অর্থে ব্যবহার করেছেন। তবে অভিধানকার রাজশেখর বসু বলেছেন, ক্ষীণ অর্থে স্তিমিত শব্দের প্রয়োগ অশুদ্ধ।


অন্যদিকে ইংরেজি শব্দ ‘স্ট্যাটাস’ অর্থ পদমর্যাদা, অবস্থা প্রভৃতি। অথচ ফেসবুকে স্ট্যাটাস বলতে কারও আপডেট কোনো খবরাখবর কিংবা অনুভূতিকে বোঝানো হয়। অথবা ফেসবুক ব্যবহারকারীর সাম্প্রতিক চিন্তাভাবনা বা কর্মকাণ্ডের বিবরণকে বলা হচ্ছে স্ট্যাটাস। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষকেই স্ট্যাটাসসমৃদ্ধ বলে গুরুত্ব দিয়েছে ফেসবুক। এই অর্থে স্ট্যাটাস শব্দটিও এখন বাংলা হয়ে গেছে। তুচ্ছ বা মামুলি কথাও স্ট্যাটাস হতে পারে ‘উহ, আজ খুব গরম পড়ছে’, কিংবা ‘আমি এখন ব্লুমার্সে খাচ্ছি’।


ফেসবুকে শুরুতে স্ট্যাটাস আপডেট করার স্থানে লেখা থাকত, ‘কী করছেন এখন।’ ২০০৯ সালে সেটি বদলে লেখা হয়েছে, ‘মনের খবর কী?’ মানে, মন যা বলে তা-ই লিখুন এখানে।


মজার ব্যাপার হচ্ছে ভ্রান্ত উচ্চারণের কারণেই সংস্কৃত স্তোতবাক্য হয়ে গেছে স্তোকবাক্য। ব্যাকরণের দিক থেকে শব্দটি অর্থহীন। কিন্তু তা বেশ চলছে। অথচ শব্দটি কেন পবিত্র বাক্য অর্থে চালু হয়ে গেল, তার কোন সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাননি ভাষাবিজ্ঞানীরা। তবে ধারণা করা হয়, শব্দটি ভুল বা অজ্ঞতাবশত পবিত্র বাক্য অর্থে চালু হয়ে গেছে।


স্তোক শব্দের অর্থ অল্প, ছোট, মিথ্যা প্রবোধ (সে ভদ্রতা করে মিসেস স্মিথ দুঃখ করেছিল বলে তাকে স্তোক দেবার জন্যে- প্রমথ চৌধুরী; গুরদাস পুনরায় ইয়ারদের স্তোক দিয়ে মেয়ে মানুষের সন্ধানে বেরুলেন- হুতোম প্যাঁচার নক্শা, কালীপ্রসন্ন সিংহ; বিদায়বাণী নয়, ফিরিয়া আসিবার স্তোকবাক্য নয়, কারণ প্রদর্শন নয়, প্রয়োজনের, কর্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ নয়,শুধু, আমি যে ছিলাম এবং আমি যে নাই, এই সত্য ঘটনাটা আবিষ্কারের ভার যাহাদের রহিল তাহাদের ’পরে নিঃশব্দে অর্পণ করা- শ্রীকান্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com