‘সম্ভ্রান্ত’ শব্দের সম্ভ্রম অফুরান
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৭, ১০:৪৬
‘সম্ভ্রান্ত’ শব্দের সম্ভ্রম অফুরান
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলা ভাষায় খুবই মজার শব্দ হচ্ছে সম্ভ্রান্ত। শব্দটির অর্থের এতোটাই উন্নতি হয়েছে যে, তা এখন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে চলে গেছে। কারণ মূল বা ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে সম্ভ্রান্ত মানে ‘সম্যক রূপে ভ্রান্ত’। কিন্তু এখন শব্দটির প্রচলিত অর্থ মর্যাদাসম্পন্ন (সেই ফরাসীবিপ্লবে, রাজা গেল, রাজকুল গেল, রাজপদ গেল, রাজনাম লুপ্ত হইল; সম্ভ্রান্ত লোকের সম্প্রদায় লুপ্ত হইল; পুরাতন খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম গেল, ধর্ম্মযাজকসম্প্রদায় গেল; মাস, বার প্রভৃতির নাম পর্যন্ত্য লুপ্ত হইল, অনন্ত প্রবাহিত শোণিতস্রোতে সকল ধুইয়া গেল, কালে আবার সকলই হইল, কিন্তু যাহা ছিল, তাহা আর হইল না- সাম্য, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; আমীর ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ কেহ মৃগনাভি, কেহ মুক্তা, কেহ সুবর্ণমুদ্রা প্রভৃতি উপহার দান করিলেন- রায়নন্দিনী, সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী; সহসা এতবড় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির আগমনে অত্যন্ত সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলেন, কোথায় বসিতে দিবেন তাহা খুঁজিয়া পাইলেন না- কাশীনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; এই সেদিন একজন সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণকে কোনো ইংরেজ পাদুকা বহন করাইয়াছিল, দেশের উচ্চতম আদালতে পর্যন্ত স্থির হইয়া গেছে, ব্যাপারটা অত্যন্ত ‘তুচ্ছ’- সমূহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সম্ভ্রান্ত আসল তুর্কী মহিলারা হাজার শিক্ষিতা হলেও এখনও রীতিমত বোরকা দিয়ে পথে বের হন- নজরুল রচনাবলী; ছেলের কথা শুনিয়া মা অন্তরে ব্যথা পাইলেন, বলিলেন, সে আমার দোষ হয়েছে, কিন্তু তোকে ত মায়ের সম্ভ্রম বজায় রাখতে হবে- আঁধারে আলো, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; সকল স্থানেই যশের অনুগামিনী নিন্দা, ইন্দ্রিয়সুখের অনুগামী রোগ, ধনের সঙ্গে ক্ষতি ও মনস্তাপ; কান্ত বপু জরাগ্রস্ত বা ব্যাধিদুষ্ট হয়; সুনামেও মিথ্যা কলঙ্ক রটে; ধন পত্নীজারেও ভোগ করে; মানসম্ভ্রম মেঘমালার ন্যায় শরতের পর আর থাকে না- কমলাকান্তের দপ্তর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; পরস্পরের মধ্যে একটা সুদূর ব্যবধান, অধীন জাতির মনে একটা অনির্দিষ্ট সম্ভ্রম এবং অকারণ ভয় শতসহস্র সৈন্যের কাজ করে- অপমানে প্রতিকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


আসলে ভাষায় সব শব্দেরই চিরকাল একই অর্থ বজায় থাকে না। সময়ের ব্যবধানে কোন কোন শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়। সাধারণত পাঁচ প্রকারে শব্দার্থের পরিবর্তন হতে পারে। যেমন শব্দার্থে উন্নতি বা উৎকর্ষ (যেমন ‘মন্দির’), শব্দার্থের অপকর্ষ বা অবনতি (যেমন ‘ফলাহার’), শব্দার্থের সংকোচ (যেমন ‘অন্ন’) ও শব্দের নতুন অর্থের আগমন (যেমন ‘সহজ’)।


যাই হোক, সম্ভ্রান্ত শব্দটির সঙ্গে এখন সমীহ ভাব লেপ্টে আছে। শব্দটি উচ্চারিত হলেই মনে ভক্তি ভক্তি ভাব আসে। বিষয়টা সাইকোলজিক্যাল বা মনস্তাত্ত্বিক। অথচ শব্দটির মূল অর্থ জানলে আমাদের পিলে চমকে যেতে পারে।


তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান বললে আমরা এটাই বুঝি যে তার পরিবার শুধু অবস্থাপন্নই নয়, ভদ্র এবং দাপটওয়ালা। আসলে একদিন বাঙালি সমাজে মানুষ কোন বিশেষ পরিবার বা গোষ্ঠীর দাপটের কারণে সব সময় ভয়ে যেভাবে তটস্থ বা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতো, সেই প্রসঙ্গটিই সম্ভ্রান্ত অর্থে ব্যবহৃত হতো। দাপটে অসহায় হয়ে যাবার প্রসঙ্গটিই সম্ভান্তের মূল কথা।


কিন্তু কালের বিবর্তনে আর ভাষার সম্মোহনী গুণে সম্ভ্রান্ত শব্দটির মূল অর্থ লোমহর্ষকভাবে পাল্টে গেছে। আমরা এখন শব্দটির মূল নিয়ে মোটেও ভাবি না এবং মূল অর্থে শব্দটিকে ব্যবহারও করি না। অথচ একদিন সম্ভ্রান্ত শব্দটির মাঝে ধন আর ক্ষমতার দাপটই ছিল মুখ্য।


সম্ভ্রান্ত সংস্কৃত শব্দ। আর এটার সংস্কৃত অর্থ হচ্ছে আবর্তিত, ভীত, উৎকণ্ঠিত, হতবুদ্ধি ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে বাংলায় শব্দটি দিয়ে আমরা অভিজাত, কুলীন, আশরাফ, মর্যাদাবান ইত্যাদি বুঝি। মজার ব্যবহার হল জ্ঞানী-গুণী, শিল্পী, সাহিত্যিক আর শিক্ষাবিদদের আমরা শ্রদ্ধা করলেও তাদেরকে সম্ভ্রান্ত বলি না। শব্দটির গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সম্ + ভ্রম্ + ত।


ভাষাবিদরা মনে করেন, সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত বাংলায় ঢোকার পর সম্ভ্রম শব্দটি ভয় অর্থে প্রচলিত ছিল। সম্ভ্রম শব্দটি এখন ভদ্রতা, আবরু বা সম্মান অর্থে প্রচলিত। তবে ভয় বা ভক্তিজনিত ব্যস্ততা বা উদ্বেগ অর্থে এখনও শব্দটি চালু রয়েছে (সম্ভ্রমে উঠিয়া জগন্নাথ দেখিবারে, ক্রমে ক্রমে গিয়া উত্তরিল সিংহদ্বারে- চৈতন্যমঙ্গল, লোচনদাস)।


বিশেষণে সম্ভ্রম মানে সম্ভ্রান্ত।


অমরকোষের টীকায় সম্ভ্রম শব্দের অর্থে বলা হয়েছে ‘ভয়াদিজনিতত্বরা, কর্মবেগ’। এই অর্থে সম্ভ্রম মানে আবেগ, ত্বরা। আরেক তথ্যে জানা যায়, মূলানুগ অর্থে সম্ভ্রম মানে ত্বরা। সংস্কৃতে শব্দটির নানা অর্থ রয়েছে। যেমন ঘূর্ণন, অতিশয় ভ্রম (পূর্বাপর আছে ইহা না কর সম্ভ্রম- কাশীদাসী মহাভারত)। কাশীদাসী মহাভারতে ভয়, শঙ্কা অর্থেও শব্দটি প্রয়োগ রয়েছে (শিশুর সম্ভ্রম কিছু নহিল তাহায়)।


আবেগ, আদর, সম্মান (কহিল আমারে শিশু করিয়া সম্ভ্রম- কাশীদাসী মহাভারত), প্রলয় অর্থেও সংস্কৃতে সম্ভ্রম শব্দের ব্যবহার রয়েছে। বিদ্যাপতি হর্ষভয়জনিত আবেগ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছেন (না করয়ে সম্ভ্রম না করয়ে লাজ)। আর শব্দকল্পদ্রুমে সম্ভ্রম শব্দের একটি অর্থে ‘সূত্র’ বলা হয়েছে। আবার সংস্কৃতে বিশেষণ পদ হিসেবে সম্ভ্রান্ত শব্দের অর্থে বলা হয়েছে অতিভ্রান্ত, অতিভীত, শঙ্কিত, ত্বরিত, ক্ষিপ্র।


কিন্তু বিশেষণ হিসেবে বাংলায় সম্ভ্রান্ত অর্থ সমাদৃত, সম্মানিত, মর্যাদাসম্পন্ন। আবার বংশ বোঝাতে সম্ভ্রান্ত শব্দটি দিয়ে কুলমর্যাদাসম্পন্ন, গৌরবাম্বিত বোঝায়।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com