সমূহ সম্মুখ আর সম্রাজ্ঞী
প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৭, ০৯:৪২
সমূহ সম্মুখ আর সম্রাজ্ঞী
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সংস্কৃতে সমূহ মানে রাশি, গণ, সমুদয়। এসব অর্থ বিশেষ্য। কিন্তু বাংলায় সমূহ বিশেষণ। বাংলায় সমূহ মানে বহু, অনেক, বেজায় (মোসাহেবেরা বাবুর সমূহ বিপদ মনে করে বিষণ্ন বদনে বাবুর পেচোনে পেচোনে যেতে লাগলো- হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ), ভীষণ, চরম (সমূহ বিপদে আছি ভাইরে; নিষাদের মনে মায়ামৃগে মজে নেই, তুমি বিনা তার সমূহ সর্বনাশ- সুধীন্দ্রনাথ দত্ত; তুমি চাও জলের গভীর জ্যোৎস্না বিরল বসতি, সমূহ সারল্য, লাঙলের ফলপ্রসূ ফলা নিধুয়া পাথার- রফিক আজাদ)।


আবার প্রাচীন ভারতে মিউনিসিপ্যাল কার্য সম্পাদনের জন্য গঠিত কমিটির নাম ছিল ‘সমূহ’। সাধারণ গৃহ, জলাশয়, দেবমন্দির, বিশ্রামাগার, পথিকদের জন্য পানীয় জলের কূপ ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণ, উপাসনালয় নির্মাণ, দুষ্টের দমন, সাহায্য প্রার্থীকে সাহায্য প্রদানসহ নানা ধরনের জনহিতকর কাজ এ সমিতির ওপর ন্যস্ত ছিল।


অন্যদিকে সংস্কৃত ‘পরাঙ্মুখ’ শব্দের বিপরীত হচ্ছে ‘সম্মুখ’। বহুব্রীহি সমাসের নিয়মে সঙ্গত বা সম্প্রাপ্ত মুখ যাহা কর্তৃক হচ্ছে সম্মুখ।


সংস্কৃতে সম্মুখ মানে মুখোমুখি, সামনাসামনি, অভিমুখ। কিন্তু বাংলায় সম্মুখ অর্থ সদয়, প্রসন্ন (কাননে পূজিবে তোমা, হবে পতিপ্রাণসমা, তুমি তারে হইবে সম্মুখ- কবিকঙ্কণ চণ্ডী)।


আবার সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে, সম্রাজ্ঞী পদটি শুদ্ধ নয়। সংস্কৃতে শুদ্ধরূপ হবে সম্রাজী। কিন্তু বৈদিক মন্ত্র ও বাংলায় সম্রাজ্ঞী প্রচলিত। এটাকে এখন আর পাল্টানোরও দরকার নেই। কারণ বাংলায় সম্রাজী মোটেও প্রচলিত নয়। অথবা বলা যায়, ব্যাকরণের তুলাদণ্ডে মাপতে গেলে সম্রাজ্ঞী শব্দটি অশুদ্ধের কাতারে ঠাঁই পাবে। তারপরও মনে রাখা দরকার, এটা বেদে ব্যবহৃত শব্দ।


মূলানুগ অর্থে সম্রাজ্ঞী অর্থ সম্রাটপত্নী। প্রধানকত্রী বা প্রধানগৃহিণী অর্থেও সংস্কৃতে সম্রাজ্ঞী শব্দের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু বাংলায় সম্রাজ্ঞী মানে মহারানী। অথবা বলা যায়, সংস্কৃতে সম্রাজ্ঞী অর্থ শুধু সম্রাটপত্নী বা মহারাণীই নয়, সাম্রাজ্যের অধিকারীও (আর একের পর এক সেনাপতির প্রসারিত করতলকে উপেক্ষার হাসিতে আহত করে ক্লিওপেট্রার সিংহাসনে উঠে বসলে তুমি তরঙ্গিত কামনার সম্রাজ্ঞী- মনীন্দ্র রায়; ফ্রাঙ্কো-প্রুসীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে ‘বর্লিনে চলো’ বলিয়া ফ্রান্সে যে একটা রব উঠিয়াছিল, যে উন্মত্ততার ফলে এত রক্ত এবং এত অর্থব্যয় হইয়া গেল, সম্রাজ্ঞী য়ুজেনির কি তাহাতে কোনো হাত ছিল না?- ক্ষিপ্ত রমণীসম্প্রদায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; নাটকটি সম্পূর্ণ করতে না পারলেও রাজিয়াকে তিনি যেভাবে ‘ইন্ডি’র সম্রাজ্ঞী হিসেবে কল্পনা করেন তা সম্পূর্ণ কুসংস্কার ও ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত মানুষের পক্ষেই শুধু সম্ভব ছিল- রেখো মা দাসেরে মনে, শান্তনু কায়সার)।সম্রাজ্ঞী শব্দটির গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সম্ + রাজন + ঈ।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com