সন্তর্পনে সন্তানসম্ভবা সব সন্ত
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৭, ১১:৫৪
সন্তর্পনে সন্তানসম্ভবা সব সন্ত
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সাধু বা সজ্জন অর্থে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘সন্ত’ শব্দটির জন্মকাহিনী বেশ চমৎকার। সংস্কৃত সৎ শব্দের বহুবচন সন্ত। আসামি, ওড়িয়া, হিন্দি ও মারাঠি ভাষাতেও সন্ত শব্দটি সৎ শব্দের বহুবচন অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বাংলায় ঘটেছে ব্যতিক্রম। বাংলায় সন্ত বলতে সাধু, পুণ্যাত্মা বোঝায় (পৃথিবীর প্রেতচোখ বুঝি সহসা উঠিলো ভাসি তারকা-দর্পণে মোর অপহৃত আননের প্রতিবিম্ব খুঁজি; ভ্রণভ্রষ্ঠ সন্তের তরে মাটি-মা ছুটিয়া এলো বুকফাটা মিনতির ভরে- সেদিন এ ধরণীর, জীবনানন্দ দাশ; মৌলিকরা যেহেতু শ্রেয়তম তাই তারা ধর্মের ক্ষেত্রে সন্ত- জ্ঞানচৌতিশা, মলয় রায়চৌধুরী; গভীর বিস্ময়ের যে, যে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সন্ত কিংবা ঋষির ধারণাটি বেশি প্রচারিত, তিনিই এ রচনায় নিজের জন্ম-সময় সম্পর্কে সবটা বলেছেন আন্দোলন-সংগ্রামের ধারণার এককে- রবীন্দ্রনাথের একটি অনন্য বক্তৃতা নিয়ে, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়)।


অথচ সংস্কৃতে সন্ত বলতে ‘দুই হাত জোড় করে বিস্তার’ বোঝায়।


আবার সংস্কৃত সম্ + তর্পণ= সন্তর্পণ। সংস্কৃতে বিশেষ্যে সন্তর্পণ মানে তৃপ্ত করা। বিশেষণে তৃপ্তিকর, তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু বাংলায় ক্রিয়া-বিশেষণ হিসেবে ‘সন্তর্পণে’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাংলায় সন্তর্পণে মানে সতর্কভাবে, অতি সাবধানে (কেহ কেহ অতি সন্তর্পণে রওয়ানার উদ্যোগ করিল- আবুল মনসুর আহমদ; ওরে আশা, কেন তোর হেন দীনবেশ! নিরাশারই মতো যেন বিষণ্ন বদন কেন, যেন অতি সংগোপনে যেন অতি সন্তর্পণে অতি ভয়ে ভয়ে প্রাণে করিস প্রবেশ- আশার নৈরাশ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; দুপুরবেলা রান্নাঘরের দাওয়ায় বসিয়া খান-কতক রুটি খাইতেছিলেন, হঠাৎ চোরের মত সন্তর্পণে পা ফেলিয়া কেষ্ট আসিয়া উপস্থিত হইল- মেজদিদি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ল’য়ে গেনু গৃহশিরে অতি সন্তর্পণে ধরি, সর্বাঙ্গে বুলানরি কর কত-না আদর করি- শৃংখলমুক্ত, অক্ষয়কুমার বড়াল)।


পদ্যে বিশেষণ হিসেবে সন্তর্পিয়া শব্দের প্রয়োগ রয়েছে। এ সন্তর্পিয়া শব্দের অর্থ অতিশয় তুষ্ট করে, শাস্ত্রসম্মতভাবে মৃতের তর্পণ করে (সন্তর্পিয়া সিন্ধু জলে- মাইকেল মধুসূদন দত্ত)।


এটা ঠিক যে হালের সন্তানসম্ভবা শব্দটি এককালে ‘সন্তানসম্ভাবনা’ হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ‘উত্তরা’ সাময়িকী থেকে ‘সন্তানসম্ভাবনা’র রেফারেন্স দিয়েছেন (নাতবৌর সন্তানসম্ভাবনা বলে যেন ওজর করিসনি)। তিনি শব্দটির অর্থে লিখেছেন ‘সন্তান জন্মিবে এইরূপ অনুমান বা প্রত্যাশা, সন্তান হইবে এইরূপ নিশ্চয়, গর্ভ।


তিনি গর্ভবতী অর্থে সন্তানসম্ভবিতা শব্দটিও উল্লেখ করেছেন (রাধারাণী সন্তানসম্ভবিতা)।


ড. সিরাজুল ইসলাম তাঁর ‘ঐতিহাসিকের নোটবুক’ গ্রন্থে সন্তানসম্ভাবনা শব্দটি রেখেছেন (রাজকন্যা ওই জল পান করে সন্তানসম্ভাবনা হলেন)। সুকুমার সেনের ‘জামাইজবান’ গল্পে রয়েছে (বলবর্মা বৃদ্ধ হয়েছেন সুতরাং এখন আর সন্তানসম্ভাবনা নেই)।


তবে সন্তানসম্ভবা শব্দটিই এখন চলছে (সীতা সন্তানসম্ভবা হলে রাম খুব খুশি হন- চিরদিনের নরনারী, আফসার আহমদ)।


গর্ভবতী অর্থে একসময় সন্তাসম্ভবিতা শব্দটিও এক সময় চালু ছিল (সীমন্তিনী সন্তানসম্ভবিতা- খুড়োমি, সুকুমার সেন)।


· লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com