সতর্ক সটকা আর একদল সতী!
প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৭, ০৮:২৯
সতর্ক সটকা আর একদল সতী!
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

হিন্দি ‘সটক’ থেকে আগত বাংলা সটকা অর্থ নলবিশিষ্ট আলবোলা (এত বিপদেও তিনি সারারাত বাঁধানো চালাতে বসিয়া ধীরভাবে কাঠের নল বসানো সটকাতে তামাক টানিতেছেন- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়; কৃষ্ণকান্ত সটকা হাতড়াইলেন, পাইলেন না- অভ্যাসবশতঃ ডাকিলেন, ‘হরি!’- কৃষ্ণকান্তের উইল, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; সোণার আলবোলা; পোরজরেরট সটকা-সোণার মুখনলে মতির থোপ দুলিতেছে, তাহাতে মৃগনাভি-সুগন্ধি তামাকু সাজা আছে- দেবী চৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)। লক্ষ্য করুন, বঙ্কিমচন্দ্রের আমলে বর্তমানে ‘সোনা’ শব্দের গৃহীত বানান ছিল ‘সোণা’। তৎসম শব্দ স্বর্ণ থেকে বাংলায় সোনা আসায় ‘সোণা’ বানান যৌক্তিক ছিল। যারা বাংলা বর্ণমালা থেকে মূর্ধন্য (ণ) তাড়াতে চেয়েছিলেন, তারাই সোণাকে ‘সোনা’ বানিয়েছেন। তাদের চিন্তাধারাকে সঠিক ধরে নিলে ইংরেজি ভাষার ব্যাকরণবিদদের বোকা ধরে নিতে হয়। কারণ ইংরেজি বর্ণমালার c, k, q অক্ষর তিনটির উচ্চারণ সমপর্যায়ের। মানে কাজ চালানো যায়। কিন্তু ইংরেজিভাষী ব্যাকরণবিদরা সস্তা বোকামির পথে হাঁটেননি। কারণ তারা বোঝেন, ধ্বনি-সাম্যের দোহাই দিয়ে ইংরেজি বর্ণমালা থেকে কয়েকটি অক্ষর তাড়িয়ে দিলে বানান রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এখানেই শেষ নয়, ওরা গ্রিক বা লাতিন ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখনও সাইকোলজি বানানের আগে ‘p’ লিখে। যাক, এসব কথা। মনে রাখুন, বাংলায় মাছ ধরার কাঠিকলও সটকা নামে পরিচিত।


আবার হিন্দি ‘সটকা’ থেকে বাংলায় সটকা শব্দটি এসেছে। এই সটকা আবার ক্রিয়াপদ। এটার অর্থ হচ্ছে পালিয়ে যাওয়া। সটকানো হচ্ছে বিশেষ্য। এটার অর্থ পলায়ন, অগোচরে সরে পড়া (নিজে সটকান দেওয়া- অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত)।


এবার সতর্কতার সঙ্গে ‘সতর্ক’ শব্দের ময়নাতদন্ত করছি। মজার ব্যাপার হলো মূলানুগ অর্থে সতর্ক হল তর্কযুক্ত। শব্দটি এখন বিশেষণ হিসেবে হুশিয়ারি, সাবধান অর্থে ব্যবহৃত হয়। সতর্কতা বিশেষ্য আর বিশেষ্যে সতর্কতা মানে সাবধানতা, হুশিয়ার। আবার সতর্কীকরণও বিশেষ্য। এটার অর্থ সাবধান করে দেয়া।


এদিকে সংস্কৃত সতী শব্দটির অর্থ সাধ্বী, নির্মলাচরিত্রা, পতিব্রতা (সতী নারীর পতি যেন পর্বতের চূড়া- মানিকরাজার গান; নারীত্বের মূল্য কি? অর্থাৎ, কি পরিমাণে তিনি সেবাপরায়ণা, স্নেহশীলা, সতী এবং দুঃখে কষ্টে মৌনা- নারীর মূল্য, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী, শিবের খড়গে তখনই মুণ্ড হারায়েছে প্রজাপতি!- সব্যসাচী, কাজী নজরুল ইসলাম; আজকাল রাম, শ্যাম, নিধু, বিধু, যাদু, মধু, যে সকল নাটক উপন্যাস নবন্যাস প্রেতন্যাস লিখিতেছেন, তাহার নায়িকামাত্রেই স্নেহশালিনী সতী- শকুন্তলা, মিরন্দা এবং দেসদিমোনা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ইংরাজ বলে chastity, তবুও ইহার দ্বারা তাহারা নরনারী উভয়কেই নির্দেশ করে, কিন্তু এ দেশে ও কথাটার বাংলা করিলে ‘সতীত্ব’ দাঁড়ায়; সেটা নিছক নারীরই জন্য- নারীর মূল্য, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; স্ত্রীলোকের সতীত্বের অধিক আর ধর্ম নাই; যে স্ত্রীর সতীত্ব নাই, সে শূকরীর অপেক্ষাও অধম- মৃণালিনী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), দক্ষকন্যা (লুকাইল দশ মূর্তিসতী হইলা সতী- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর), ভগবতী।


কিন্তু বাংলায় সতী বলতে ভিন্ন প্রসঙ্গ বোঝায়। বাংলায় সতী মানে ‘স্বামীর সাথে যে সহমৃতা হয়।’ আবার সতীত্ব শব্দটি বাংলায় ব্যঙ্গে সতীগিরি, সতীপনা অর্থে ব্যবহৃত হয়। সতী শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সৎ + ঈ।


· লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com