আসল রূপে নেই ‘সচরাচর’
প্রকাশ : ২৯ মে ২০১৭, ০৭:৫২
আসল রূপে নেই ‘সচরাচর’
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সংস্কৃতে সচরাচর মানে ‘চরাচর সহিত’। কিন্তু বাংলায় সাধারণত, প্রায়শ। সাধারণত, প্রায়শ অর্থে বাংলায় ‘সচরাচর‘ শব্দের প্রয়োগকে রাজশেখর বসুসহ একাধিক অভিধানকার অশুদ্ধ বলেছেন। তারপরও শব্দটি চলছে।


সংস্কৃত ‘সচরাচর’ শব্দটির গঠন হচ্ছে সহ + চর + অচর। এটার মূলানুগ অর্থ ‘জঙ্গম স্থাবর সহিত জগত’। কিন্তু শব্দটির প্রয়োগে ‘জগৎ’ শব্দটি উহ্য থাকায় বাংলায় এটার ঘটেছে অর্থান্তর। এ কারণে সচরাচর শব্দের অদ্ভুত অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘প্রায়ই’ (দিনটিকে আমরা সচরাচর ‘নববর্ষ’ নামে চিহ্নিত করে থাকি, বাংলা নববর্ষ- ড. মুহাম্মদ এনামুল হক; তাহারা সচরাচর একপ্রকার রাজবিদ্রোহী, রাজার রাজস্ব লুটিয়া খাইত- আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ফল কথা, সচরাচর বড় বয়সের চেয়েও লক্ষ্মীর বয়সটা কিছু বেশী হইয়া গিয়াছিল, বোধ করি, উনিশের কম হইবে না- হরিলক্ষ্মী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


বিশেষণে সচরাচর (স + চর + আচর) মানে চরাচরের সঙ্গে বিদ্যমান, জগত। আর ক্রিয়া-বিশেষণ হিসেবে সচরাচর (স + চরাচর) অর্থ সাধারণত, প্রায়ই (এমন করিয়া সচরাচর মাও ছেলেকে ভালোবাসিতে পারে না- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


আবার সংস্কৃত সজ্জন বা স্বজন থেকে আসা বাংলা সজন বিশেষণ। এটার অর্থ আপনজন, জ্ঞাতি, স্বজন (আমিও আমার এ বিজনে সঞ্চিত প্রেম সজনে বিতরণ করিতে বাহির হইব- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; রবিদাস চামার ঝাঁট দেয় ধুলো, সজন রাজপথ বিজন তার কাছে, পথিকেরা চলে তার স্পর্শ বাঁচিয়ে- প্রেমের সোনা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; কিন্তু এই রঙ্গভূমির বিচিত্র লীলার মাঝখান দিয়া নক্ষত্ররায়ের দুরদৃষ্ট তাঁহাকে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে, সজন তাঁহার পক্ষে বিজন, লোকালয় কেবল শূন্য মরুভূমি- রাজর্ষি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; কি বিদ্যালয়ে কি গৃহকার্যে কি বিচারালয়ে কি ধর্মমন্দিরে একাকী, সজন, অমরগণ, সকল কালেই সকল অবস্থাতেই বিজ্ঞানবিদের ক্রীতদাস- বঙ্কিম রচনাবলী; হম যব না রব, সজনী, নিভৃত বসন্তনিকুঞ্জবিতানে আসবে নির্মল রজনী মিলনপিপাসিত আসবে যব, সখি, শ্যাম হমারি আশে, ফুকারবে যব ‘রাধা রাধা’ মুরলি ঊরধ শ্বাসে- হম যব না রব, সজনী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সাজি’ বাটা-ভরা ছাঁচিপান ব্যজনী-হাতে করে স্বজনে বীজন কত সজনী ছাতে!- ফাল্গুনী, কাজী নজরুল ইসলাম), ভদ্র বা সাধু (বড় সাহেব সত্যি সজন লোক)। কিন্তু পদ্যে সজন অর্থ প্রণয়ী।


আবার সজনের স্ত্রীলিঙ্গ সজনী অর্থও প্রণয়ী (সজনী গো এ আগুন চোখে দেখলাম না- বাংলা গান)।


অন্যদিকে সংস্কৃত স (সহ) + জন= সজন। এ সজন অর্থ জনপূর্ণ স্থান (সজন এ বেলাভূমি সে দিনের মত নহে- মোহিতলাল মজুমদার, জনসমাজ। কিন্তু সজন থেকে তৈরি সজনতা অর্থ ভদ্রতা, আত্মীয়তা (সজনতার সাফাইটুকু রক্ষা করিয়া- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


বিস্ময়কর হলেও সত্য, সংস্কৃতে সজীব মানে জীবিত, বিদ্যমান জীবন (সজীবে প্রাণিশকলে- মহাভারত)। কিন্তু বাংলায় সজীব মানে সমুজ্জ্বল, প্রদীপ্ত, প্রাণবন্ত (তোমার অঞ্চলখানি দিব রাঙাইয়া, সজীব বরণে- চয়নিকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; প্রেমে আমাদের অন্তঃকরণ সজীব হইয়া উঠিয়া বাহিরের সজীব শক্তিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করিতে পারে, প্রেমের অভাবে অন্তঃকরণ অসাড় থাকে, কেবল বাহিরের শক্তি তাহার উপরে বলপ্রয়োগ করিয়া যতটুকু করিয়া তোলে- সমাজ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; মাভৈঃ! মাভৈঃ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান!- হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ, কাজী নজরুল ইসলাম; তাহার আম্রপল্লব আজিও তেমনি স্নিগ্ধ, তেমনি সজীব রহিয়াছে, এখনও একবিন্দু মলিনতা কোথাও স্পর্শ করে নাই- রসচক্র, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; গৃহে উজ্জ্বল দীপ জ্বলিতেছিল, তাহার চঞ্চল রশ্মিতে সেই সকল চিত্রপুত্তলি সজীব দেখাইতেছিল- বিষবৃক্ষ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), উৎসাহজনক, উত্তেজক (জগত শেঠ বলিতে লাগিলা দর্পে সজীব বচন- নবীনচন্দ্র সেন)।


শব্দটির গঠন হচ্ছে সংস্কৃত স (সহ) + জীব।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com